ছাত্র আন্দোলন

আগামীতে শ্রমিকরাই ছাত্রদের ডাক দেবে

ছাত্র আন্দোলনের মূল মর্মবাণী মোটা দাগে অপরিবর্তিতই আছে। কারণ ছাত্রসমাজ সমাজেরই একটি অংশ। একটা সময় ছিল যখন ছাত্রসমাজের শ্রেণিগত পরিচয়টা মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্তের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল। সামাজিক নানা উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে এখন ছাত্রসমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ হয়তো বিত্তবান এলিট ক্লাসের আর একটা বড় অংশ এখনো মধ্যবিত্ত সমাজের অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি, সমসাময়িককালে একেবারে নিম্নবর্গ, গরিব জনগণের ভেতর থেকেও ছাত্র পরিচয় নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

এখানে প্রধানত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৈশিষ্ট্যটাই ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে পড়ে প্রতিফলিত হয়েছে। কালের পরিক্রমায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে। এক সময় পদদলিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভেতরে যে বিদ্রোহী মনোভাব এবং সেখান থেকে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী হিসেবে একটা অংশ সাহসী-সংগ্রামীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এখন সেই জায়গায় বাজার অর্থনীতির ব্যবস্থা এবং এনজিও কালচার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ায় নানান রকম প্রলোভন মধ্যবিত্ত সমাজকে আকৃষ্ট করে, যদিও সবাই সেই সুযোগগুলো পায় না। কিন্তু নাকের সামনে মুলা ঝোলানোর মতো অবস্থার মধ্যে পড়েছে তারা। তাদের ভেতরে একটা সংগ্রামবিমুখ, অন্য কোনো সুবিধাবাদী পথে নিজের আখের গোছানোর একটা চিন্তার প্রতিফলন তৈরি হয়েছে।

তা ছাড়া পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদী যে ব্যবস্থা বর্তমানে চলছে, যেটাকে বলে নিও লিবারালিজম সেখানে ভোগবাদ, প্রদর্শনবাদ এবং সবকিছুর পণ্যায়ন বা কমোডিটিফিকেশন, এগুলো সমাজের ওপর চেপে বসেছে। ছাত্রসমাজও সেই জায়গায় আক্রান্ত। কিন্তু তারপরও ইতিহাসের দারুণ সত্য হলো, এই ছাত্ররা যেই বয়সে ছাত্র থাকে তখন তাদের ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে কতগুলো বৃহত্তর সামাজিক ও মানবিক চিন্তাগুলো অবশ্যম্ভাবীভাবে তারা গ্রহণ করে এবং একটা সংগ্রামী ভূমিকা পালন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সেটা নানা ইস্যুতে হয়। হয়তো তাদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বা শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বা কোনো একটা অন্যায় ঘটনাবলি যেমন নারী ধর্ষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে বা আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যু কিংবা জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু, গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে শুরু করে তাদের সর্বোচ্চ স্তরে, অর্থাৎ সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ এবং শ্রেণিসংগ্রামের দিকে, চিন্তার দিকে ধাবিত করতে পারে বা করে।

এ ক্ষেত্রে আপেক্ষিকভাবে কোন চেতনাটা প্রাধান্য বিস্তার করে আছে, সেইটার ওপরে নির্ভর করে আন্দোলনের গতিধারা কী হবে বা চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। এ রকম কোনো ভুল ধারণা উচিত না যে, অতীতে যত ছাত্র আন্দোলন হয়েছে তারা একেবারে প্রথম দিন থেকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য অভিমুখে ধাবিত হয়েছে এ রকম না। যেমন আমি নিজেই যখন ছাত্র আন্দোলনে ছিলাম আমরা আইয়ুবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, ভোটাধিকারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, সামরিক শাসনের অবসানের জন্য, স্বাধিকারের জন্য, শোষণ মুক্তির জন্য আমরা সব সংগ্রাম করেছি। কিন্তু হয়তো সেই আন্দোলনটা দানা বেঁধেছে যে ইস্যুতে তার সঙ্গে এগুলোর প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক কোনো সম্পর্ক ছিল না। যেমন হোস্টেলের ডাল পাতলা কেন? ঘেরাও করো প্রভোস্টকে, এইটা নিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত। সেই আন্দোলনটাই ক্রমাগতভাবে অগ্রসর হতে হতে অন্যসব প্রশ্ন সামনে চলে আসতে থাকল। খাবারের মান বাড়াবে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের তো ফান্ড নেই, কেন ফান্ড নেই? কারণ বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ অল্প, কেন শিক্ষা বাজেটে অতি স্বল্প বরাদ্দ? কারণ বেশির ভাগ বাজেটে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ আরও স্ফিত করার জন্য তাদের নানারকম সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রশ্ন আসে এটা কেন হয়েছে? হচ্ছে জাতিগত শোষণের জন্য, জাতিগত শোষণ কেন হয়? হয় এ কারণেই যে, শ্রেণিগত শোষণ এবং তার উৎপত্তি এখানে। সুতরাং আস্তে আস্তে চিন্তাগুলো এমন একটি জায়গায় পৌঁছায় বা পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হয় যেখানে আমরা পরিষ্কারভাবে তখন বলতে পারি যে আমাদের পাতলা ডালের বিরুদ্ধে সংগ্রামটা ওতপ্রোতভাবে আজকে সমাজ বিপ্লবের প্রশ্নের সমীকরণ। কিন্তু ওই শেষ জায়গাটা হঠাৎ করে তো আসে না। এখনো যেটা হচ্ছে, আমি মনে করি মৌলিকভাবে এটা বিচ্ছিন্ন কিছু না। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হচ্ছে কিংবা এই যে কিছুদিন আগে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়ে গেল। সেই আন্দোলন চলতে চলতেই ৭-৮ দিনের মাথায় শিক্ষার্থীরা পোস্টার লাগাল যে, ‘রাষ্ট্র মেরামত প্রয়োজন সংস্কার কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত।’ নিরাপদ সড়ক বা শুধু রাস্তা মেরামতটা চলে গেল রাষ্ট্র সংস্কারের স্লোগানে। রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টা তো খুবই উঁচু পর্যায়ের বিপ্লবী এবং র‌্যাডিকেল দাবি। এই অর্থে আমি বলছি যে আন্দোলনের মৌল চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

অনেকে নেতৃত্বের সংকটের কথা বলেন। এই সংকটটা সঠিকভাবে আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। আমার নিজের বিবেচনা হলো সাধারণ ছাত্রসমাজ কিন্তু অতীতের আন্দোলনের ধারাবাহিকতার বাইরে না। কিন্তু ছাত্রসমাজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের রাষ্ট্র এবং সরকার বা সমাজ ব্যবস্থার থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু না। সুতরাং সব জায়গায় চলমান গণতন্ত্রহীনতা, লুটপাটতন্ত্র ইত্যাদির আঁচড় এসে পড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। শিক্ষাঙ্গনে কোনো নির্বাচন হয় না, ছাত্রদের মুখপাত্র হিসেবে তার দাবিদাওয়া, আশা আকাক্সক্ষা, চাহিদা এবং ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে দেশের কাজ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই আমি মনে করি ইচ্ছাকৃত এবং এমনভাবে ব্যবস্থাটা করা হয়েছে, যেন বিষয়গুলো না থাকে।

ছাত্র সংসদেও শূন্যতা পূরণের জন্য মাসেল পাওয়ার বা হেলমেট বাহিনী, হোন্ডা বাহিনী আর গু-া বাহিনী স্বঘোষিত মুখপাত্র হিসেবে ছাত্র সমাজের সামনে এসে দাঁড়ায়। এবং তখন অন্যান্য সাধারণ ছাত্রদের ফোর্স করে গেস্ট রুম কালচার জেঁকে বসে। হল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্ব কায়েম হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ তারাও এটার সঙ্গে জড়িত। গোটা শিক্ষাব্যবস্থা এটার সঙ্গে জড়িত হয়ে গেছে। এটা একটি ক্ষুদ্র অংশ, এটা প্রধান অংশ নয়, ব্যবস্থাটাই এমন তৈরি করা হয়েছে। তারা যেহেতু সাধারণ ছাত্রদের প্রতিনিধি নেই, তাই বাই ডিফল্ট তারা এই শূন্যতাটা পূরণ করে ছাত্ররাজনীতির নামে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু একটা ফুঁ দিলে এরা উড়ে যাবে। যখন দেখি সাধারণ ছাত্ররা এটার বিরুদ্ধে লেগেছে এবং সেটার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পরপরে এমন ঘটনায় ছাত্রছাত্রীরা বের হয়ে আসে। আন্দোলনটা হয়তো একটা জায়গায় গিয়ে থেমে যায় তারা চূড়ান্ত পরিণতি বা স্বাভাবিক ফলাফলের দিকে হয়তো যেতে পারে না। সেই কারণটা প্রধানত ছাত্র সমাজের না, ছাত্র আন্দোলনেরও সমস্যা না। সেটা প্রধানত আমাদের এখানে রাজনৈতিক আন্দোলনের যে চরিত্রগত জায়গাটা ছিল, সেটা বদলে গিয়েছে বলেই এই জিনিস ঘটছে বা ঘটছে না। আমরা আইয়ুব আমলে স্লোগান তুলেছি সর্বজনীন ভোটাধিকারের, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার। কিন্তু দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পার হলেও রাষ্ট্র এর ধারেকাছেও যায়নি। হামিদুর রহমান কমিশন বা শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে আইয়ুব আমলে আমরা যে বিরাট লড়াই করলাম, তার যে দর্শন সেটাই অনুসরণ করে ৩০ লাখ মানুষের রক্তে কেনা এই দেশে শিক্ষানীতির নামে শিক্ষা সংকুচিত করার নীতি চালু রাখা হচ্ছে। আমার অরিজিনাল পয়েন্টটাকে আরেকটু ট্রেস করার জন্য আমি বলতে চাই, মধ্যবিত্তের ওই শ্রেণিগত ব্যাপারটায় ফোকাস করা দরকার। আমাদের সমাজের গঠনের ভেতরে মধ্যবিত্তের ভূমিকাটা ঠিক আগের মতো নেই। এ জন্য এখন আমরা অপেক্ষা করে আছি সেই সময়ের যেদিন মেহনতি মানুষ একসময়ের ছাত্ররা যেমন অগ্রণী ছিল, সচেতন ছিল তেমন হবে। যেমন আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, আমরা চলে যেতাম আদমজীতে, আমরা চলে যেতাম ডেমরায়, আমরা চলে যেতাম শ্রমিক এলাকাগুলোতে। সেখানে গিয়ে মাইক নিয়ে বলতাম, ‘শ্রমিক ভাইয়েরা, আপনারা ভয় পাইয়েন না, আমরা ছাত্ররা আপনাদের পাশে আছি।’ তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আশ্বাস পেয়ে মিছিলে নেমে আসত। এখন পরিস্থিতি সে রকম নেই। এখন পরিস্থিতিকে নিতে হবে সেই জায়গায় যেখন সংগঠিত সচেতন শ্রমিকরা দলবেঁধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে বলবে, ‘বেআইনি অস্ত্রধারীরা ৬ ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে আসো, আর সাধারণ ছাত্ররা প্রতিবাদ করেন, গেস্টরুম কালচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াও, ভয় নাই আমরা আছি আপনাদের পাশে।’ সুতরাং তুলনামূলকভাবে শ্রমিক আন্দোলন, মেহনতি মানুষের আন্দোলন যে মাত্রায় ছিল এখন আপেক্ষিকভাবে সেটাকে নতুনমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভেতরে যে সম্ভাবনা সেই সম্ভাবনাকে আবিষ্ট করা যাবে। আর যদি সেটা না পারি, তারা হয় সুবিধাবাদী দিকে ঝুঁকে যাবে, না হয় তারা অদৃষ্টবাদের চিন্তায় সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী ধারার ভেতরে চলে যাবে। দিব্য চোখে এখন সেটিই দেখা যাচ্ছে।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হক হৃদয়