অ্যাক্টিভিজম

ন্যায্য পৃথিবীর আন্দোলন

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৩৫ এএম

মানবাধিকারের ধারণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একের পর এক সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কার্যক্রম সম্পর্কিত প্রক্রিয়া গ্রহণ করা মানবাধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি অগ্রগতি। যার মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে মানবাধিকারের ধারণার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে এবং মানবাধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রসমূহকে দায়বদ্ধ করার প্রচেষ্টা আছে। তবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ধারাবাহিক। ধীরে ধীরে অধিকারের ধারণাসমূহ যেমন বিস্তৃত হয়, তেমনি অধিকারসমূহ বাস্তবায়নের পরিবেশ ও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। আবার মানবাধিকার বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে। ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী বা শ্রেণি তাদের স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে মানবাধিকারকে ধারাবাহিক অবজ্ঞা করে আর তখনই প্রতিবাদ হয়ে ওঠে একমাত্র উপায়। আজকের বিশ্বে দাঁড়িয়ে নাগরিক সমাজ ও মুক্তিকামী মানুষেরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জবাবদিহি করার জন্য তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখছে। এই মুহূর্তে (১৫-১৯ ফেব্রুয়ারি) নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিশ্ব সামাজিক ফোরামের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের ফোরামের আলোচনার কেন্দ্রীয় ভূমিকা দখল করে আছে ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি ও জলবায়ু ন্যায্যতা। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের তাবৎ মুক্তিকামী মানুষেরা সব ধরনের বঞ্চনার প্রতিবাদ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একে অপরের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে।   

ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এর মূল বিষয় ছিল আইনের চোখে সবাই সমান। এই আন্দোলনে সব পেশার নাগরিকরা অংশগ্রহণ করে। অহিংস কর্মসূচি নাগরিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তবে মানবাধিকারের ধারণা নাগরিক অধিকার থেকে আরও বেশি বিস্তৃত। নাগরিক অধিকারের আন্দোলন কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই সব নাগরিকের অধিকার আইন দ্বারা সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দেয় তবে মানবাধিকারের কারবার সব মানুষকে নিয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ও শ্রেণি নির্বিশেষে। আমাদের দেশে নাগরিক আন্দোলনের প্রকাশ হয়েছিল অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী দ্বারা অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে।

নারী আন্দোলন নাগরিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। নারীদের অধিকার আদায়ে জাতিসংঘ নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডো) গ্রহণ করে। এর আগে নারীর ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলন নারী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল। ১৮৯৩ সালে নারীরা সর্বপ্রথম ভোটাধিকারের সুযোগ পায় নিউজিল্যান্ডে। ব্রিটিশ নারীরা ভোটের অধিকার পায় ১৯১৮ সালে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা ভোটাধিকার পায় তার দুই বছর পরে। বর্তমানের নারী অধিকার আন্দোলনের মূল বিষয় হচ্ছে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ করা, নারীর প্রতি সব সহিংসতা দূর করা, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ করা বর্তমানে যা পৃথিবীর সব দেশের ক্ষেত্রেই কমবেশি প্রাসঙ্গিক। নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার সূত্র ধরে ‘মি-টু’ আন্দোলন সারা বিশ্বে আলোড়ন তৈরি করে। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এই বিষয়গুলো সমভাবে প্রযোজ্য। তবে বাংলাদেশে পরিস্থিতির আলোকে এখানকার নারী আন্দোলনে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে অধিকার, বাল্যবিবাহ বন্ধের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না, বিস্তৃত পরিসরে পুরুষতান্ত্রিক চর্চা ও সামাজিক কাঠামোও এর মধ্যে অন্যতম। নারী অধিকারকে এগিয়ে নিতে প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্যাপন করা হয়, জাতিসংঘে প্রতি বছর নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশনের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে নারীর অধিকারের বাস্তবায়নের পর্যালোচনা করা হয়। নারী আন্দোলনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী নারীবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা অধিকার আদায়ে সক্রিয় আছে এর মধ্যে রয়েছে এলজিবিটিকিউআই জনগোষ্ঠীর ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নাগরিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে মানবাধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে জলবায়ু ন্যায্যতা সম্পর্কিত আন্দোলন। শিল্পবিপ্লবের পর বিশে^র জলবায়ু পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি পৃথিবীকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি করেছে। একে মোকাবিলায় জাতিসংঘ ১৯৮৮ সালে আইপিসিসি (জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল) প্রতিষ্ঠা করে, এখন প্রতি বছর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটকে এখন আর বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব এখন মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম উপলক্ষ। তাই জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যেমন পৃথিবীব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার দাবি করছে একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের অভিযোজন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে দাবি উত্থাপন করছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে আনা এবং দরিদ্র ও জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিলের ব্যবস্থা করা জলবায়ু কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি। এই পরিপ্রেক্ষিতে জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীরা জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। শিল্পবিপ্লবের পর ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো নির্বিচারে কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে যে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করেছে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে সেই সম্পদে অংশীদার হওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীর আছে।  জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলন অত্যন্ত ক্রিয়াশীল একটি বিষয়। এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠিত হয় যদিও তার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। আবার ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হবে তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার জন্য জলবায়ু আন্দোলনের কর্মী ও পরিবেশবাদীদের অন্যতম দাবি হচ্ছে বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর, জীবাশ্ম জ্বালানি ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি এখন জলবায়ু কর্মী ও নাগরিক সমাজের দাবি। অন্যদিকে এই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী দূষণ বিশেষ করে বায়ুদূষণে জীবাশ্ম জ্বালানিকে দায়ী করছে। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও এর মাধ্যমে নদী, খাল ও পানির দূষণ রোধ এই সময়ের নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম ক্ষেত্র বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। জীবাশ্ম জ্বালানির অন্যতম উপজাত হচ্ছে প্লাস্টিক, প্লাস্টিক শুধু কার্বন নিঃসরণই করছে না প্লাস্টিক পণ্য পরিবেশ দূষণ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্লাস্টিক এখন মাছের পেটে ও মানুষের রক্তে। ইউনেক্স-এর তথ্য মতে, প্রতি বছর আট থেকে দশ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সাগরে জমা হয়। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ও পরিবেশ সুরক্ষার কর্মীরা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বন্ধে দাবি করে আসছে। আশার কথা প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘের উদ্যোগ অব্যাহত আছে, এ সম্পর্কিত ইন্টারন্যাশনাল নেগোশিয়েশন কমিটি (আইএনসি) ২০২২ সাল থাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বাধ্যতামূলক চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা শুরু করে যা ২০২৪ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য আছে।

জলবায়ু ন্যায্যতা, টেকসই জ্বালানি, ও পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি খাদ্যের অধিকার, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র কৃষকের অধিকার এখন বিশ্ব নাগরিক সমাজের আন্দোলনের অন্যতম বিষয়বস্তু। পৃথিবীব্যাপী খাদ্যের অপচয় এবং কৃষির ওপর থেকে কৃষকের মালিকানা কমে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে। সেই অবস্থায় নাগরিক সমাজের আন্দোলনে জৈব উপায়ে পরিবেশসম্মত কৃষির প্রচলন নিয়ে আন্দোলন বেশ গতি লাভ করেছে। বাংলাদেশেও খাদ্য অধিকারের আন্দোলনের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

তবে সবকিছু ছাড়িয়ে এই সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। সারা বিশ্বেই এখন স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। আর এসব কারণে সেল্ফ সেন্সরশিপ এখন সময়ের আলোচিত বিষয়। সরকারের জায়গা থেকে তো আছেই বিভিন্ন দেশে জনতুষ্টিবাদের পাল্লায় পড়ে মুক্তমত ও মুক্তিচিন্তার আন্দোলন এখন অনেকটাই কোণঠাসা। আবার অনলাইন জগতে মানুষের যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং কার্যক্রম আগের থেকে বহুগুণ শক্তিশালী হলেও নিরাপদ ও মুক্ত অনলাইন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। তাই অনলাইন বা সাইবার পরিসরকে নিরাপদ ও মুক্ত করার আন্দোলন এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় আন্দোলন। আজ বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল অধিকারের ধারণা আলোচিত হচ্ছে, যার মধ্যে অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা সম্পর্কিত আলোচনা।

মানবাধিকারের সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। এই সময়ে আন্দোলন শুধু রাজপথে না এখন আন্দোলনের মঞ্চ সর্বত্র তবে অহিংস। একসময় শ্রমিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থক ছিল তবে বর্তমান বিশ্বে শ্রমিক আন্দোলন এখন যতটা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কেন্দ্রিক তার থেকে অনেক বেশি অধিকার আদায়ের আন্দোলন। তবে বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর পর্যালোচনায় মানবাধিকার বাস্তবায়নের সব আন্দোলনই রাজনৈতিক। কারণ এই আন্দোলনগুলো প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামোকে ভাঙতে চায়, পৃথিবীকে একটি সমতাপূর্ণ ও ন্যায্য কাঠামোতে গড়তে চায়। বিশেষ করে সুবিধিাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সবসময় সচেষ্ট থাকে। এই সময়ে জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়নের কথা বলছে যা মূলত তিনটি পিলারের সমন্বয়ে যেমন সমৃদ্ধি, ধরিত্রী ও মানুষ, পরিকল্পনা করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নে কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেওয়া, কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা ও উন্নয়নের সুফল সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। আর সেটাই এই সময়ে মানবাধিকার আন্দোলনের সার কথা। তবে এই আন্দোলনের প্রতিপক্ষ আছে বর্তমান বাজারব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আসল প্রতিপক্ষ আসল এখানেই। যে প্রতিপক্ষ বর্তমানে প্রভাবশালী বিভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে ধরা দেয় এবং স্বার্থ হাসিল করে থাকে। আর সেখানেই নাগরিক সমাজ, বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অব্যাহত প্রতিবাদ ও আন্দোলনের প্রচেষ্টা বাজায় রেখেছে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত