১৯৯৮ সালের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের কারণে আমার সহকর্মী-সহযোদ্ধাদের নানান দিক থেকে অনেক তর্জন-গর্জন শুনতে হয়েছে। আমারও শুনতে হয়েছে। হওয়ারই কথা। তবে গর্জনের রেশ দশকের পর দশক থাকাটা কেউই আন্দাজ করিনি। অবশ্য বছরের পর বছর একই রেজিম থাকাই বা কে আশা করেছি! গর্জনের সর্বশেষটা বেশ বেখাপ্পা ধরনের মাপের হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সেমি-মাননীয় এক পদস্থ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীরনগরের তিন শিক্ষকের নাম নিয়ে ধমকাধমকিমূলকভাবে একটা সাইবার পোস্ট দিয়েছিলেন, ২০২০ সালে দেশব্যাপী ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন হওয়ার কারণে। যাদের ৩-৪ বছরে রাজনৈতিক স্মৃতি ডিলিট হয়ে যায়, তাদের মনে করিয়ে দেওয়া লাগতে পারে যে, করোনার জীবাণুগুলো আসার আগে কমবেশি বেশ কিছু আন্দোলনের বেগ দেশে দেখা দিয়েছিল। আর সরকারও সেগুলো অমুকের-তমুকের ষড়যন্ত্র বলে চালাচ্ছিলেন। তো সেই পদস্থ মানুষটি ১৯৯৮ সালের ওই আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করতে গিয়েই আমাদের নাম নেন। তা নিন! যার যা চাকরি! কিন্তু পত্রপত্রিকা সয়লাব করে তার সেই পোস্টটিকে ‘নিবন্ধ’ আকারে প্রকাশ করতে শুরু করে। আমার মতো প্রায়-কিছুতে-হতভম্ব-হই না লোকও থতমত খেয়েছিলাম এতগুলো পত্রিকা/পোর্টালের ওই বেখাপ্পা কুৎসিত প্রপাগান্ডায়। এমনই এক দশা এই দেশে!
অর্জনের হিসাব জটিল। যার যার আলাদা করে দেওয়াই ভালো। আমারটাই বলব। কিন্তু তার আগে একটা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। বিশেষত, ৫ বছরে রাজনৈতিক স্মৃতিভ্রমের দেশে, মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কিছুটা আমার ওপরও বর্তায়। যেহেতু ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনটিকে ‘লৈঙ্গিক’ তথা ‘নারীবাদী’ আন্দোলন হিসাবে দেখার দরকার পড়েছিল আর যেহেতু তদানীন্তন বাম ছাত্র (ছাত্রী) সংগঠনের দাপ্তরিক মুরব্বিরা (তখনো এখনকার মতো বিলুপ্ত নয় এই ধারার সংগঠন) ‘নারীবাদ’কে এনজিও তৎপরতা হিসেবে দেখার গজ ফিতা বানিয়ে ফেলেছিলেন আর যেহেতু তারা নিজেরা যেভাবেই যেখানে যুক্ত থাকুন না কেন, অন্য কোনো বামকে এনজিওমুখী হতে দেবেন না, তাই আন্দোলনকারী কর্মীদের বেশ অনেক ভাবেই শায়েস্তা করার রাস্তা নিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। একদম কেইস-বাই-কেইস বলা যাবে। বলব না। অন্তত এই কারণেও যাতে ভুক্তভোগী নিজে এসে না বলতে শুরু করেন যে ‘কই এ রকম তো কিছু মনে পড়ছে না!’ তাহলে জাহাঙ্গীরনগরের আন্দোলনকারী বামপন্থি ছাত্রছাত্রীদের, বিশেষে ছাত্রীদের অনেকের অর্জন ছিল স্বীয় স্বীয় সংগঠনের তিরস্কার বা বহিষ্কারপত্র লাভ। অজুহাত বা কারণ যাই দেখানো হোক, এসব ঘটেছিল।
আমার অর্জনটা বেশ পেঁচালো। আন্দোলনটির পরে পাকেচক্রে আমি প্রায় সচিব বা খতিব বা মুখপাত্র বা স্পোকসপার্সনের একটা দায়িত্বে চলে এসেছিলাম। এই দায়িত্বটা যে মিত্র লোকজন আমার যোগ্যতা যাচাই করে ধরে-বেঁধে আমাকে অর্পণ করেছিলেন তা নয়। এটা আসলেই ঘটনাচক্রীয়। আমি থাকতাম আসাদগেটের কাছে। আমার গ্যারেজের পাশের দুই ঘরের বাসগৃহ ধ্রুপদি ‘আন্দোলনের অফিস ঘর’ হিসেবে ভালো মানাত। সর্বোপরি, আমি ছিলাম একদম খাঁটি ব্যাচেলর, ২৪ ঘণ্টার দোকানদারের মতো। প্রাক-মোবাইলকালে এ রকম একটা পরিস্থিতির পরিণতি খুব সুবিধাজনক হয়নি। আক্ষরিক অর্থেই ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’র মানুষজন, অর্থাৎ নানান সংগঠক, নানানভাবে আসতে থাকলেন ওই বাসাতে। তাদের উদ্দীপনার হেতু ছিল আর সেটা পাঠ করতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। একটা ‘সফল’ আন্দোলনের গল্প শুনতে চান তারা। আর তাদের স্বীয় স্বীয় আন্দোলন-সংগ্রামে সেখান থেকে প্রাণস্পন্দন গ্রহণ করতে চান। কিন্তু অচিরেই আমি ‘সফল’ আন্দোলনের মুখস্থ গল্পকার হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারলাম। আরও পরে আমার ভয় হতে শুরু করল যে, আমার মাস্টারিটাই না ভুল হতে বসে। আড়াই তিন বছরের মাথাতেই, ২০০১ আসতে আসতেই, আমি এই ‘রেকর্ডের গান’ গাইতে থাকার চাকরি থেকে অব্যাহতি উপায় খুঁজতে থাকলাম। অব্যাহতি নিলাম।
যতদূর মনে পড়ে বিশেষ সুবিধা হলো না। তিন মাসও গড়াল না, আবার কীভাবে যেন বেশ দ্রুতই “লালন আখড়া রক্ষা ‘আন্দোলন”’-এ জড়িয়ে পড়লাম। এ দফা অবশ্যই আর আমার গুহায় থেকে নয়। একদম টিএসসি-মিএসসিতে বসে, ঢাকার বাইরে সফর করে। ইত্যাদি। মোটামুটি যে রুট-ম্যাপ ঢাকা শহরের আন্দোলনের লিখে-রাখা আছে সেই পথেই। পঞ্চগড়ের বোদা শহরে ‘সংযোগ’-এর দায়িত্ব নিয়ে মধ্যরাতে পৌঁছালাম। এলাকার এক কলেজ শিক্ষকের বাসাতে মধ্যরাতে আমার পৌঁছে ঘুমানোর কথা। সকালে ঘুরে ঘুরে ‘সংযোগ’ করব এমনটাই জব-ডেস্ক্রিপশন ছিল। মোবাইল ফোন আমার ছিল না। সংগ্রামীদের প্রায় কারোরই ছিল না। কীভাবে যে তখন যাওয়ার আগের যোগাযোগ হতো সেসবও ভুলতে বসেছি। মনে হয় যেন আদিকাল থেকেই ফেসবুকে লিখে ‘চলে আয়’ বলা ছিল আমাদের জীবনে। তো সেই শিক্ষক রাত জেগে অপেক্ষাই করছিলেন মনে হয়। সকালে উঠে একটা রাজভোজনের নাশতাও জুটেছিল কপালে। কিন্তু ‘সংযোগ’ শুরু করার আগেই ঢাকা থেকে খবর গেল রমনা বটমূলে বোমা হামলা। খুব দ্রুতই মাথার মধ্যে অগ্রগুরুত্বের ভরকেন্দ্র বদলে গেল আমার। যদ্দুর মনে পড়ে, অনেকেরই।
দুইটা আন্দোলন নিয়ে আমাকে গুরুতর সংশয় করতে দেখা গেছে। আরও থাকতে পারে, আমার মনে পড়ছে না। আমার কপাল ভালো যে তার মধ্যে গুরুতরটির বিষয়ে আমার সংশয় তেমন লোকজন লক্ষ্য করেননি। নাহলে আমার অতিশয় গালমন্দ জুটতে পারত। এরশাদবিরোধী যে আন্দোলনটাকে গণ-অভ্যুত্থান বলা হয়ে থাকে সেই আন্দোলনটার কালে আমি নিজেও একে একটা মহাজাগরূক গণ-অভ্যুত্থান ভেবেছিলাম। হয়তো তাই-ই ছিল। আমিও ২০-২১ এর তরুণ হিসাবে যা যা পারা যায় করে বেড়াচ্ছিলাম। মনে পড়ে, মেহেরপুরে, যেহেতু জাহাঙ্গীরনগর বন্ধ ছিল, আমার লেখা নাটক হওয়ার পর বেশ কয়েকজন কলাকুশলীর বাড়িতে রাতের বেলা পুলিশে হানা দিয়েছিল। সেসব উত্তেজনায় মনে হতো প্রায় কিউবাতেই ষাটের দশকের শেষভাগে চে গুয়েভারার পাশাপাশি দৌড়ে বেড়াচ্ছি। কয়েক বছর যেতে না যেতেই আমি এরশাদের পতনকে দেখতে শুরু করলাম মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির একটা শক্তিশালী কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে (চাল শব্দটা খারাপ শোনাতে পারে)। এই দেখা নিয়ে আমার অশান্তি জগতে না জানলেও আমি জানি, আর জানতেন উন্মোচন বলে একটা রাজনৈতিক ছোটকাগজের সম্পাদক। আমি সংক্ষিপ্ত একটা রচনাতে আমার মনের ভাব জানিয়েছিলাম। পত্রিকার সম্পাদক বড় হয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ একটা পত্রিকার সম্পাদক হলেন। আমার ওই থিসিস আর বড় অডিয়েন্সকে জানানো হলো না। আমিও গালমন্দের হাত থেকে রক্ষা পেলাম।
অন্যটা ঘটেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাতিকের মতো আবারও ‘আন্দোলনে’ জড়িয়ে পড়ি আমি ২০১২-তে জুবায়ের হত্যার পর। আন্দোলনের শুরু জুবায়ের হত্যার বিচার চেয়ে হলেও, খুব দ্রুত তা প্রশাসনিক অনাচার, মহাদুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, যত্রতত্র নিয়োগে অনিয়ম এবং পরিবেশ ধ্বংস করার বিরুদ্ধে চলে গেল। একটা পর্যায়ে উপাচার্যের পতনের আন্দোলন। কিছু পরিস্থিতিতে আমি তখন ‘নেতা’-ফেতা ধরনের একটা দশাতেও পৌঁছেছি। সহ-আন্দোলকদের পঁইপঁই করে শর্ত দিলাম যে, উপাচার্য বিদায় নিলে, যদি সত্যিই আমরা ‘জিতি’, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেনিয়ম-দুর্নীতি-অপকর্মের একটা গণতদন্তের আহ্বান জানাব আমরা। সবাই একমত ছিলেন/হলেন। যেই না আমরা ‘জিতলাম’, উপাচার্যের অবনয়ন হলো, আমাদের সহ-আন্দোলকরা মোচড়ামুচড়ি করে গণতদন্ত থেকে সরলেন। অন্তত আমার সেই অনুভূতি হলো।
নানান কারণে ও বিবিধ পরিক্রমায় গত এক দশক ধরে আমার পরিচিতদের অনেকেই আমাকে কম-আন্দোলনকারী ভাবতে শুরু করেছেন। বিশেষত নবীন বয়সের যারা। তাদের যে খুব দোষ দিতে পারব তা নয়। মহা-আলসেমি একটা কারণ অবশ্যই। কিন্তু আরও বড় কারণ আছে সম্ভবত। তারা কমবেশি ‘আন্দোলন’-এর যেসব কার্যসূচি দেন সে সবে নিতান্ত নিরুৎসাহ বোধ করি। বিশেষত, মানববন্ধন ধরনের একটা বস্তু চালু হয়েছে যেখানে কিছু লোককে নির্বাক হাতে প্লাস্টিকের ব্যানার সমেত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আমি যতবার এ রকম লোকদের কোথাও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, আমার কৌতূহল অবশ্যই হয়, অবশ্যই আমি দাঁড়িয়ে ব্যানারের ভাষা পড়তে চেষ্টা করি। কিন্তু একই সঙ্গে এই কোলাহলের শহরে ওই লোকগুলোকে অতিশয় বেচারি মনে হয়। যেহেতু আমার এ রকম মনে হয়, তাই আমি ভাবি অন্যদেরও তা মনে হতে পারে। এখন ‘আন্দোলন’ করতে হবে অথচ আমাদের লোকবল নেই, মানুষের স্পৃহা কম বা বাড়াতে পারছি না ইত্যাদি দশার মধ্যে ওই কর্মসূচি মাথাতে আসাতে দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু আমার কেবল মনে হয়, যতই কম লোকজন থাকুক না কেন, সেই কাজ কিছুতেই করা যাবে না, যাতে ‘আন্দোলনকারী’দের বেচারি মনে করেন অন্যরা। বেচারিত্বের তুলনায় ধৃষ্টতা আমার অধিক কার্যকর মনে হয়, পরিমাণে তা কম উৎপাদন করতে পারলেও। ‘আন্দোলন’কারীদের ভীম মনে না হোক, অন্তত ভীষ্ম, বা পার্থসারথি, নিদেন বিদুরের মতো প্রাজ্ঞ-তীক্ষè হাজির করা খুব দরকার। নতুন ক্ষমতা-মোডালিটিতে নতুন রাস্তা খুঁজতে আমাদের কষ্ট হতে পারে, খুঁজে না পেতে পারি, সেটা কষ্টের অবশ্যই। কিন্তু কেবল ‘আন্দোলনের’ মায়ায় পড়ে কিছু করতে আমার মন সায় দেয় না। ‘আন্দোলন’-এর উপচারের থেকে ‘আন্দোলনকারী’দের পর্বতপ্রমাণ পাবলিক অবয়ব আমার বেশি প্রিয় সম্ভবত। ওই অবয়বের অবনয়নের দামে ‘আন্দোলন’ করতে অনিচ্ছুক থাকি আমি। তবে এই উছিলায় ‘মশারির দড়ি হাতে’ বলে যত লোককে তির্যক কথা শুনিয়েছি, আজ তাদের দরবারে মাফ চেয়ে নিলাম।
আদাবর। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪।। প্রকাশ : দৈনিক দেশ রূপান্তর বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা, ?????? ফেব্রুয়ারি ২০২৪