সোশ্যাল মিডিয়া মুভমেন্ট

হাইব্রিড-জনপরিসরের সুখ-স্বপ্নটি ভেঙে যাওয়ার পর

কখনো বিস্মৃতিই ইতিহাস, কখনো বাছাইকৃত ঘটনাই ইতিহাস। এটি সর্বদাই পক্ষপাতপূর্ণ (দুষ্ট) এবং সব ইতিহাসই খ-িত ইতিহাস। এরপরও ইতিহাসের দরকার আছে। সৌভাগ্যবশত, এখন অনেক তরুণদের সঙ্গেই আমার আলাপচারিতার সুযোগ হয়। এরা অনলাইন এবং অফলাইনের সমন্বয়ে গঠিত হাইব্রিড সমাজের সদস্য। ২০২৪ সালে এনাদের অনেকেরই বিস্ময় জাগে যখন তারা শোনেন যে জনপরিসর তৈরিতে এই মাত্র দশ-পনেরো বছর আগেও বাংলাদেশের তরুণরা অনলাইন এবং অফলাইন স্পেসে কী কী করেছিলেন/ঘটিয়েছিলেন। বিস্ময় যেমন থাকে তাচ্ছিল্যও থাকে, বিরক্তিও থাকে কখনো ঘৃণাও থাকে। একটা কথা মোটামুটি নিরপেক্ষভাবেই বলা যায় যে, তরুণদের এই ‘বিস্ময়’ একটি রাজনৈতিক সৃষ্টি। সেই রাজনীতিটি হাইব্রিড এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে এর বাইরের রাখার কোনো উপায় নেই।

জনপরিসরের (পাবলিক স্ফিয়ার) ধারণা দিয়েই আলাপটা শুরু করা যাক। ২০১০-এর সময়টাতে যখন বিশ্বের বড় শহরগুলোর বড় বড় চত্বরে লাখো মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো ইস্যুকে ঘিরে জমায়েত হওয়া শুরু করল দেখা গেল যে, এদের অধিকাংশই প্রথাগত রাজনীতিতে যেটাকে আমরা বলতে পারি দল-করা, তেমন রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। যেমন গাজী পার্ক মুভমেন্ট, আরব স্প্রিং, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার ইত্যাদি। ফলে আগে যেভাবে জনপরিসরের বিন্যাস ছিল, যেমন রাজনৈতিকভাবে সচেতন গোষ্ঠী নানা জায়গায় আড্ডা দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মতামত ও শক্তি তৈরি করতেন, পত্রিকায় প্রকাশ করতেন, কথার গুরুত্ব থাকত। মনে করে দেখেন মুক্তিযুদ্ধের সময় রেডিওর ভূমিকার কথা।

পরবর্তী সময় এর সঙ্গে যুক্ত হয় সোশ্যাল মিডিয়া। আগে কোনো বিষয়ে একত্র, একমত এবং প্রতিরোধ তৈরিতে যে সময় লাগত তা আর লাগে না। আগে যে পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিওর কাছে ধরনা দেওয়া লাগত তা লাগে না। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে একটি লোকাল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে জাতীয় ইস্যু, এমনকি আন্তর্জাতিক ইস্যু। এই আন্দোলনগুলোকে তাই বলা হয় সোশ্যাল মিডিয়া মুভমেন্ট হিসেবে। প্রথাগতভাবে জনপরিসর নিজের করে নেওয়ার বিষয়টা কিন্তু সহজ নয়। রাষ্ট্রের এবং ক্ষমতাসীন দলের নানান প্রভাবের মধ্যে নিজেদের জন্য জায়গা বের করা কঠিনই, বিশেষ করে ‘কেন্দ্রীয়-ক্ষমতাবিরোধী’ হলে। সংবিধানে তাই জমায়েত করার অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। খেয়াল করে দেখেন আধুনিক রাষ্ট্রের নানান সিদ্ধান্তে মানুষের নির্ভয় অংশগ্রহণ ও প্রভাবিত করার নামই কিন্তু গণতন্ত্র। তাই এখন রোমান্টিক শোনালেও সোশ্যাল মিডিয়া মুভমেন্টগুলোকে তখন বলা হতো ‘সত্যিকারের গণতান্ত্রিক’ আন্দোলন। এশিয়াতে গুরুত্বপূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়া মুভমেন্ট ঘটেছিল বাংলাদেশে। ২০১৩ সালের শাহবাগ মুভমেন্ট। (অনেক পাঠকের মুখে শ্লেষাত্মক হাসিটি আমি কল্পনা করে নিচ্ছি)।

২০০৫-০৬ সালের দিকে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে অনলাইনে জনপরিসর তৈরি হওয়া সম্ভব হয়েছিল। এই পরিবর্তনটা এসেছিল ব্লগের সূত্র ধরে। এ দেশে ফেসবুক-ইন্সটা-টিকটকের বহু আগেই বাংলা ব্লগস্ফিয়ার তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার হাতেখড়ি কমিউনিটি ব্লগের হাত ধরে। ২০১২-১৩-তে সক্রিয় ব্লগ প্ল্যাটফরমের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ষাটেরও বেশি। ২০০৬-১২ সালে সেখান থেকে তৈরি হয়েছিল ওপেনিয়ন লিডার যারা পরবর্তী সময় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ও ক্ষমতাবান হন। ‘আই হেইট পলিটিক্স’ প্রজন্ম যখন প্রচলিত পার্টিজান পলিটিক্সের বিষয়ে আস্থাহীন তখন অনলাইন স্পেস সেই জায়গা তৈরি করেছিল। প্রচলিত মিডিয়ার পক্ষপাতের ফলে তারা সেখান থেকেও আস্থা হারিয়েছিলেন। অনলাইন আড্ডাগুলো তখনো ছিল কঠোর নজরদারির বাইরে এবং সেল্ফ-সেন্সরশিপের ধারণা প্রায় ছিল না বললেই চলে। যদিও কিছু ব্লগে প্রমিত আচরণ করার চাপ ছিল; আবার নিজেদের ইচ্ছামতো ব্লগ সাইট বানিয়ে কথা বলার সুযোগও ছিল। অন্তত কাউকে বলা যাইত, ‘এই যে মডারেটর আমার লেখা এখনো আসে নাই কেন?’ এই স্পেস যেমন যা ইচ্ছে তাই বলার এবং বিতর্কের জায়গা তৈরি করেছিল, তেমনি করেছিল যাচ্ছেতাই বলার জায়গাও। পরবর্তী সময় এই ‘যাচ্ছেতাই’ বিরাট ইস্যুতে পরিণত হবে। যদিও যাচ্ছেতাই জিনিসটাও বিভিন্ন গ্রুপের কাছে বিভিন্ন অর্থ বহন করে। কিন্তু আলাপচারিতার যে পরিবেশ, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা তৈরি করতে পেরেছিল তা এখন দুর্লভ, অনেকের কাছেই অকল্পনীয়। কেন?

শাহবাগ মুভমেন্ট ও হেফাজত-এ-ইসলাম বিষয়ক এত এত বিশেষজ্ঞ বাজারে এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো এত জনপ্রিয় যে, এই প্রসঙ্গে কথা বা আলাপচারিতা ‘তুই শাহবাগী’, ‘আমি হেফাজতিতে’ বিভক্ত। ঝগড়া আগে শুরু হলে আলোচনা তৈরি করা বড় মুশকিল। অতি-অ্যাক্টিভিস্ট এবং সবাই অ্যাক্টিভিস্ট হওয়ার সমস্যা আর কী। ২০১৩ পরবর্তী ১১ বছরে সমাজ ভীষণ বাই-পোলার হয়েছে। এতেই বোঝা যায় যে, ‘কেউ বা কাহারা নিশ্চয়ই লাভবান হইয়াছেন কেউবা খেলুমনা বলিয়া গোষ্মা করিয়াছিলেন।’ তবে শাহবাগ নিয়ে একটা কথা মনে করিয়ে দেই আপনাদের। শাহবাগ শুরু হয়েছিল ক্ষামতাসীন দলের বিরুদ্ধে, চিরশত্রু বলে প্রচারিত দলের সঙ্গে তাদের আঁতাতের বিরুদ্ধে। গভীর এক অন্যায় এর বিরুদ্ধে। এই অংশটিকে অনেকেই উপেক্ষা করে যেতে চান, অস্বীকার করতে চান, ভুলে যেতে চান, খারিজ করতে চান, ফ্যাসিস্টও বলেন; কিন্তু এটি আত্মঘাতী। নিজেদের শক্তিকে অস্বীকার করা। এই নিজও বহু, শাহবাগ বহু, হেফাজতও বহু। এই বহুকে একটি বিশেষে পরিণত করার নাম রাজনীতি।

একটু দার্শনিক শোনালেও রাজনীতি শেষমেশ ‘ন্যারেটিভ’ দখলের প্রতিযোগিতা। আধিপত্যশীল ন্যারেটিভ তৈরি এবং বহাল কেবল ভাষা/শব্দ/ছবি/নৈঃশব্দের বিষয় নয়; এটি বাস্তবতা নির্মাণের/নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও বটে। মানে রক্ত-মাংসেরও বটে। তো এখানে সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে ঢুকল? কেনইবা গুরুত্বপূর্ণ? সোশ্যাল মিডিয়াকে যখন বেশি বেশি অলটারনেটিভ বা নিউ মিডিয়া বলা হতো তখনকার জমানাতেও অনলাইন এবং অফলাইন স্পেসের দূরত্ব কমে আসছিল। নিজেদের মতের দলবাজি তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনলাইন স্পেস দখলের ঘটনাও ঘটেছে, ঘটেছে খেদানোর ঘটনাও, যেমনটা অনলাইনে তেমনি অফলাইনে। তাই ২০০৬-এ সামহ্যোয়ার ইন ব্লগে যখন প্রথম ব্লগার বিদ্রোহ হয় তখন থেকেই বাংলা অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের শুরুটা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আর বিরোধী শক্তি এবং আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক দুটি সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া চলমান ইস্যু ছিল বাংলা ব্লগে। তবে এসব বিতর্কের যে গুণগত পরিবেশ ছিল তা আর নেই। ২০২৪ সালে বহু মানুষ আরও বহুগুণ বেশি কথা বলে, আস্তিক-নাস্তিকের বাইরেও আরও সেনসেটিভ কথাবার্তাও হয় কিন্তু মানুষজন কি রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী বোধ করে?

শাহবাগ বিষয়ক যে কয়েকটা পর্যবেক্ষণ হাজির করা দরকার তা হলের, বহু স্বরের ব্লগস্ফিয়ার একটা নতুন ধরনের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের অনলাইন জনপরিসরের বলয় থেকে আরও বৃহত্তর অফলাইন জনপরিসরের বলয়ে হাজির হলো, যা ছিল উদ্যমী এবং অপ্রস্তুত। একটি অ-রাজনৈতিক চেহারা হাজির করেই সে বিপুল জনসমর্থন পেল। ‘ব্লগার’ একটি অ-রাজনৈতিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই হাজির হয়েছিল এবং নতুন দিনের হিরো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। নৈতিক শক্তির ন্যায্যতার ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হতে পারে তা জাতি অনেক দিন পর দেখতে পেয়েছিল। খেয়াল করে দেখবেন প্রথম আক্রমণ কিন্তু এসেছিল নৈতিক ভিত্তির ওপরেই। আর সঙ্গে যুক্ত হওয়া রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত লাশগুলো। আজকের নৈতিক পুলিশিং এর শুরুটা কিন্তু ব্লগ থেকেই। এরপর ক্রমাগত নৃশংস হত্যাগুলোর মধ্য দিয়ে ব্লগ এবং ব্লগ এর সবকিছু হয়ে উঠল ভয়াবহ ভয়ের জায়গা। ব্লগাররা এবং পরবর্তী সময় শাহবাগীরা যে নৈতিকভাবে অধঃপতিত সেই ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়ে উঠল আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। ন্যারেটিভ বা একটা লেখা স্ট্যাটাস, মন্তব্য থেকে নৃশংস রক্তাক্ত পরিণতির দূরত্ব ক্রমশ কমে আসতে থাকল। অনলাইনের কারণে জেলে যাওয়ার উদাহরণে উল্লাস ঘটল। দুই প্রতিপক্ষ পরস্পরের রক্তাক্ত পরিণতিতে যে উল্লাস করলেন সেটির প্রদর্শনের জায়গা হয়ে উঠল অনলাইন স্পেস। একটি রক্তাক্ত হাইব্রিড স্পেস। নারীর চরিত্র হনন, পরবর্তী ধর্মীয় নেতার চরিত্র হনন এরই ধারাবাহিকতা। অনলাইন জনপরিসরের প্রথম ফ্রন্টিয়াররা লুকিয়ে দেশ ছাড়া শুরু করলেন। সেটাও গালমন্দসহ, এসব তো করছেই ‘অ্যাসাইলামের জন্য’। এদিকে দুপক্ষের বিপুল উল্লাস প্রতিপক্ষের কতজন মারা গ্যাছে সেসব নিয়ে। এই নৃশংস উল্লাসের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। তাই আজকের তুমুল জনপ্রিয়তাবাদের উত্থানকে ভুলে যাওয়া চলবে না। শাহবাগ এবং হেফাজত অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে  গেছে। জনপরিসরের আর নিরাপত্তা নেই। সোশ্যাল মিডিয়া একটা ভয়ের জায়গা। নৈতিক পুলিশিং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র।

অনলাইন দিয়ে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করা যায়। মনে রাখবেন, শাহবাগ একটি রাজনৈতিক পদ্ধতিও বটে। খেয়াল করে দেখবেন শাহবাগ-পরবর্তী আন্দোলনগুলোতে কোনো না কোনোভাবে পদ্ধতিগতভাবে শাহবাগের ছায়া রয়েছে। যেমন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলন-পদ্ধতির অনেক কৌশল কপি করা অনেক সহজ। আবার অনলাইন জনপরিসরে ইমেজ নষ্ট করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দলবদ্ধ আক্রমণ, ক্যানসেল কালচার, নেগেটিভ ভাইরাল এমন আরও অনেক কিছু। সেই ২০০৬ সালেই প্রায় গোপনে প্রথম ডিজিটাল আইন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এরপর বিভিন্ন বছরে আরও নিপীড়ক ডিজিটাল আইন তৈরি হয়েছে। বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে নজরদারির বিভিন্ন প্রযুক্তিতে। ডিজিটাল আইনগুলোর রাষ্ট্রীয় ব্যবহার যেমন লক্ষণীয় তেমনি লক্ষণীয় কীভাবে একে অপরকে বিপদগ্রস্ত করতে মানুষজন নিয়মিত ডিজিটাল আইন (অপ) ব্যবহার করেছে। অনলাইন জনপরিসের ইউজার/তথা নাগরিকের ক্ষমতা কতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটার জন্য বিপুল উদ্যম কাজ করেছে। অনলাইন এবং অফলাইন মিলিয়ে শক্ত উদাহরণ তৈরি করা হয়েছে। এটা শুধু অনলাইন আচরণ হিসেবেই আবদ্ধ থাকেনি অনূদিত হয়েছে অফলাইনেও। ফলে মোটামুটি সবাই এখন জানেন, কী বললে চাকরি থাকবে না। এখানে আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অফলাইনের রাজনৈতিক তৎপরতাকে সংকুচিত করে কিছু ছোট ছোট পকেটের অনলাইন পরিসরে নিয়ে আসার প্রবণতা। কারণ অনলাইন স্পেস নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সস্তা এবং বেশি কার্যকরী।

নিউলিবারেল অর্থনীতিতে অ্যাটেনশন ইকোনমি ম্যাটার করে আবার এটি গোপনে রাজনৈতিকও। ফলে দেখবেন যে স্থানীয় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো যেখানে পথে বসেছে সেখানে উত্থান ঘটেছে ফেসবুকের মতো দানবদের। এর রাজনৈতিক অর্থনীতিকে আপনার বুঝতে হবে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলভেদে এর রাজনীতি আলাদা। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডগুলো নিয়ে উল্লম্ফন করার পরও দেখবেন আপনার কাছে প্রায় পর্নো রিলগুলো সহসাই চলে আসছে। আবার আপনার বিশেষ ধরনের পোস্ট রিচ পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির নিজের রাজনীতি যেমন আছে, তেমনি আছে আপনার রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঁতাত। বিশ্ব রাজনীতির পালাবদলে নিজেদের বিপুল ক্ষমতার কথা এই দানবীয় কোম্পানিগুলো জানে। এরা আবার বোঝে যে, ইউজারদের একটি ছদ্ম প্রাইভেসির ধারণা দিতে হবে। তাই তারা ক্রমাগত তৈরি করেছে প্রাইভেট গ্রুপের সুযোগগুলো। আবার আপনার রাষ্ট্রেই আপনি দেখছেন কীভাবে ইনবক্স ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। আপনার কোনো ডেটা প্রটেকশন আইন নেই।

দেখতে চকচকে স্বাধীন যদিও মূলত বদ্ধ এবং চির আতঙ্কগ্রস্ত এই হাইব্রিড স্পেসে আপনি যতটা সেফ ও বিনোদিত থাকা যায় সেটাই তো ভাববেন। এখানে বাই-পোলার হওয়া বেশি সোজা। এতে দুটো লাভ, তাও আপনি একটা দল পাবেন। ফলে অ্যাটেনশন পাওয়া ইউজার/সোশ্যাল মিডিয়া শ্রমিক হিসেবে কোম্পানির কাছে গণ্য হবেন। হোক তবু ক্ষণকালের তাতে তো হিটের সংখ্যা কমছে না। এটা আপনার হাইব্রিড সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ফলে নিজের ফলোয়ার, তথা দল, তথা অর্থনীতি এবং নিরাপদ লাভের দিকেই অনেকেই ছুটবেন। ভাইরাল হওয়াই স্বপ্ন হয়ে উঠবে। নিউলিবারেল অর্থনীতি, মনোযোগ ব্যবসায়ী ইউজার ও সদা-জাগ্রত নজরদারি সমন্বয়ে গঠিত যে হাইব্রিড জনপরিসর সেখানে আগের জনপরিসরের ঘটনা জানলে তাই বিস্ময়ই জাগবে এই ২০২৪-এ। তবুও মানুষজন ইঙ্গিতে কথা বলা শিখে গেছেন, মিমের ইশারায় হয় যোগাযোগ। সবই তো ন্যারেটিভের খেলা শেষমেশ; তাই আস্থা থাকুক ইতিহাসে। ইতিহাস বলে যে জনপরিসর ক্রমাগত বানাতে থাকতে হয়, প্রযুক্তি যদি ঘাড়ে চেপে বসে তাহলে মানুষের নতুন পথ খুঁজতে হবে।

লেখক : নৃবিজ্ঞানী এবং শিক্ষক