বাংলার রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়েছিল ইংরেজি শিক্ষা তথা আধুনিক শিক্ষার প্রচলনের অনুষঙ্গ হিসেবে। রেনেসাঁ বা বাংলার নবজাগরণই আমাদের পাশ্চাত্য শিক্ষা, চিন্তা-ভাবনা, পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা, ভাবাদর্শ, যুক্তিবাদ, সমাজ ও ধর্ম সংস্কারে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পরাধীন বাংলার ও ভারতবর্ষে ইংরেজি শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় উনিশ শতকের গোড়া থেকে। রাষ্ট্রের প্রণোদনা বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রথম দিকে খ্রিস্টান পাদ্রি এবং এদেশের বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের উদ্যোগে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। টোল ও মাদ্রাসা, মক্তবের বেড়া ভেঙে নবজাগরণের পথিকৃৎরা এসব আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে শুরু করেন। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উদ্যোগ নিয়ে বা সম্পৃক্ত থেকে কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বে প্রভৃতি শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তেমনি একটি আদি প্রতিষ্ঠান।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ সরকার এদেশে শিক্ষার লক্ষ্য কী হবে, পাঠ্য বিষয় কী হবে, শিক্ষার পর্যায়ক্রম কী হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থা কী হবে সে বিষয়ে উনিশ শতকের গোড়া থেকে তাদের চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা প্রণয়নে উদ্যোগী হয়। এরই সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের ভূমিকা কী হবে প্রভৃতি বিষয় ও ক্রমান্বয়ে তাত্ত্বিক ও মূর্ত নির্দিষ্ট রূপ লাভ করে। এই পরম্পরাই পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশের গত অর্ধশতাব্দী জুড়ে চলে আসছে।
উল্লিখিত বিষয়গুলোকে সূত্রাবদ্ধ করার জন্য ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ আমলে অসংখ্য শিক্ষা কমিশন, বিশেষজ্ঞ কমিটি-উপকমিটি গঠিত হয়েছে। এসব কমিশনের মধ্যে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে অন্তত ৬টি কমিশন গঠিত হয়। এগুলো হচ্ছে
১. লর্ড ম্যাকল এর শিক্ষানীতি-১৮১৩
২. উইলিয়াম অ্যাডাম শিক্ষা কমিশন-১৮৩৫
৩. উড-এর ডেসথ্যাচ-১৮৫৪
৪. লর্ড কার্জনের শিক্ষা সংস্কার সম্মেলন-১৯০১
৫. মাইকেল স্যাডলার কমিশন-১৯১৭ এবং
৬. সার্জেন্ট কমিশন-১৯৪৪
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ৫টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে
১. মওলানা মুহম্মদ আকরাম খাঁ শিক্ষা কমিশন-১৯৪৯
২. আতাউর রহমান খান শিক্ষা কমিশন-১৯৫৭
৩. এস এম শরীফ শিক্ষা কমিশন-১৯৫৮-৫৯
৪. হামুদুর রহমান ‘ছাত্র সমস্যা ও ছাত্রকল্যাণ-বিষয়ক শিক্ষা কমিশন-১৯৬৪
৫. নূর খান শিক্ষা কমিশন-১৯৬৯
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর অনেকগুলো সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭-৮টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে
১. ড. কুদরত-ই-খুদার শিক্ষা কমিশন-১৯৭২ (বঙ্গবন্ধুর আমল)
২. জাতীয় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন কমিটি ১৯৭৬ (জিয়ার আমল)
৩. জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি-১৯৭৮ (জিয়ার শিক্ষা উপদেষ্টা কাজী জাফর।
৪. মজিদ খান শিক্ষা কমিশন-১৯৮৩ (এরশাদ আমল)
৫. মফিজ উদ্দিন আহমেদ শিক্ষা কমিশন-১৯৮৭ (এরশাদ আমল)
৬. এম এ বারী শিক্ষা কমিশন-২০০১ (খালেদা জিয়ার আমল)
৭. মনিরুজ্জামান মিয়া পরে এম এ বারীর ....... হন-২০০ ও
৮. কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশন-২০০৯ (শেখ হাসিনার আমল)
কবীর চৌধুরী প্রয়াত হলেও শেখ হাসিনার সরকার নতুন কোনো শিক্ষা কমিশন গঠন করেনি। কবীর চৌধুরী কমিশনও মূলত বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের ভাবাদর্শগত নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনার সুপারিশসমূহকে যুগোপযোগী করার নীতি গ্রহণ করেন। বর্তমানেও কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টকে ভিত্তি করেই শিক্ষাব্যবস্থার যুগবিন্যাস ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতি নিয়ে কোনো অসন্তোষ ছিল না। তবে সেই শিক্ষা কমিশন প্রয়াত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা কমিশনের সদস্য আবুল ফজলের আপত্তির কারণে প্রথমে ছাত্রসমাজের কোনো অভিমত শুনতে রাজি ছিল না। আমরা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এই অভিমত দিতে চেয়েছিলাম। আবুল ফজল সাহেবের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি শিক্ষা কমিশনের সদস্য সচিব কবীর চৌধুরীকে আমাদের সুপারিশগুলো বিবেচনার জন্য দেখতে বলেন। বিষয়টির শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সমাধান করে দেন তিনি।
সামরিক শাসকদের দেওয়া নীতিগুলো ছিল এডহকভিত্তিক। জিয়ার দুটি শিক্ষানীতি (১৯৭৬ ও ১৯৭৮) নানা অসংগতিতে পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও জিয়ার কঠোর সামরিক শাসনের কারণে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি। কিন্তু ১৯৮১ সালে বস্তুত এরশাদ আমলে সামরিক শাসনের কঠোরতা থাকলেও ছাত্রসমাজ এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে সাহসিকতাপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলে। শিক্ষা আন্দোলন পরিণত হয় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে।
আমাদের দেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে আইউব খানের আমলে, ১৯৬২, ১৯৬৪ এবং ১৯৬৯ সালে। ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনের পটভূমি ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। ১৯৬১ সালের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের মধ্যে গোপন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ১৯৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ ঐক্যবদ্ধভাবে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা করবে। কিন্তু তার আগেই ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তারের ফলে ১ জানুয়ারি থেকে ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে মাঠে নেমে আসে। পরিণামে আইউব খান পিছু হটতে বাধ্য হন। সোহরাওয়ার্দী মুক্তি লাভ করেন। পাকিস্তানে সামরিক শাসন তুলে নেওয়া হয়।
এর ফলে ছাত্রসমাজের আন্দোলন আরও বেগবান হয়। সাময়িক বিরতি দিয়ে এবার শরীফ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আন্দোলনে কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় তো আছেই, ব্যাপকভাবে স্কুলছাত্ররা অংশগ্রহণ করে। শরীফ শিক্ষা কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শিক্ষা সংকোচনের। শুধু তিনি বছর মেয়াদি বিএ কোর্স ছাড়াও মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রদের বেতন বৃদ্ধি, শিক্ষাকে অধিকার বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি পুঁজিতে রূপান্তরের সুপারিশ করা হয়। শিক্ষা যার টাকা বা পুঁজি আছে, তার জন্য শিক্ষার সুযোগ অবারিত করার নীতি নেওয়া হয়। সামগ্রিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল ও শিক্ষা সংকোচনের এই উলঙ্গ প্রয়াসের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে নেমে আসে। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্রমিছিলের ওপর গুলি চালানো হয়। ফলে সেদিন গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ, বাবুল প্রমুখ কিশোর ..... ছাত্র নিহত আছে। পরিস্থিতি শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই রক্তাক্ত ঘটনাবলি আইউব খানকে শরীফ শিক্ষা কমিশন বাতিল করতে বাধ্য করে। ছাত্রদের নিজস্ব দাবিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি হয়।
৬২-এর আন্দোলনের পটভূমিতে শরীফ শিক্ষা কমিশন বাতিল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র আন্দোলনও স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু আইউব খান ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। ভাবাদর্শগত দিক থেকে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনও পূর্বসূরির ..... শরীফ পদাঙ্ক অনুসরণ করে। শিক্ষা ‘অধিকার’ নয়, শিক্ষা ‘সুযোগ’ শরীফ কমিশনের এই অবস্থান থেকে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন সরে আসেনি।
ছাত্রসমাজ হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধেও তাদের প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৬৪ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর ৬২-এর আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ‘শিক্ষা দিবস’ পালন করতে গিয়ে আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠে। আইউব সরকার হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাস্তবায়নে ধীর গতি নেয়, ছাত্র আন্দোলনও নমনীয় কৌশল গ্রহণ করে। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দল বা ‘কপ’ থেকে ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করা হলেও ছাত্র আন্দোলনেও ভাটার টান নেমে আসে।
১৯৬৯ সালের ১১ দফাভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন আইউব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করে। ১১ দফার প্রথম দফাতে ছাত্রসমাজের শিক্ষার দাবিগুলো সন্নিবেশিত হয়। ১১ দফা আন্দোলন ছিল মূলত রাজনৈতিক আন্দোলন। ৬৯-এর ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুর আগরতলা মামলা বাতিল, বঙ্গবন্ধুসহ রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি এবং আইউবের পতনের ভেতর দিয়ে এই আন্দোলনের সার্থক পরিসমাপ্তি ঘটে।
দেশে নতুন সামরিক শাসক সাধারণ নির্বাচনের কথা বললেও ১৯৬৯ সালে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা নূর খানের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। সামরিক শাসনের মধ্যেই নূর খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ গর্জে ওঠে। ইয়াহিয়া পিছু হটে। ফলে নূর খানের শিক্ষা কমিশন অকার্যকর হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতা-উত্তর ছাত্র আন্দোলনের কথা আগে উল্লেখ করেছি। এরশাদ সরকারের আমলে মজিদ খান কমিশনের বিরুদ্ধে সূচিত আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে পুরো আশির দশক জুড়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। নব্বইয়ের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ ফল হলো সামরিক শাসক এরশাদের পতন। নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের পর গত তিন দশকে বাংলাদেশে শিক্ষা বা অন্য কোনো দাবিতে আর কোনো ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। ছাত্র সংগঠনগুলোর স্বাধীন কোনো ভূমিকা চোখে পড়বে না। প্রায় প্রতিটি ছাত্র সংগঠন এখন রাজনৈতিক দলের পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। একসময়ের বাম ছাত্র সংগঠনগুলো নামেই আছে বটে, কিন্তু তাদের কোনো প্রভাব নেই। দীর্ঘদিন ডাকসুর মতো ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন না হওয়া, ছাত্র সংগঠনগুলোর আবেদন হ্রাস পাওয়া এবং সাধারণ ছাত্রদের রাজনীতিবিমুখতা প্রভূত কারণে ইস্যু থাকলেও ছাত্ররা আন্দোলনে উৎসাহ পায় না। ছাত্র আন্দোলন তার অতীত সংগ্রামী ঐতিহ্য হারিয়েছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে নেতিবাচক এবং দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও বাণিজ্যকীকরণ ছাত্র আন্দোলনকে চোরাবালিতে ফেলে দিয়েছে।
লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা