জবাবদিহিতা না থাকায় ভাষার বিকৃতি বাড়ছে। বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহারে অনীহা শুধু সরকারের ভেতরই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও রয়েছে। এ নিয়ে অনীহা, অবজ্ঞা বা সচেতনতার অভাব সব জায়গায়ই আছে। সব গণমাধ্যম বা রাজনৈতিক দলও এ বিষয়ে সমান যত্নবান না। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেরও (এনসিটিভি) একটি বানানবিধি আছে। পাঠ্যপুস্তক তাদের বানানরীতি অনুসরণ করেই রচিত হওয়ার কথা। বেশিরভাগ সময় তাই হয়। কিন্তু এর ব্যত্যয়ও হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এই স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে না। আর যদি দুর্বোধ্য শব্দ চয়নের কথা বলতে হয় তাহলে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই। আমি এটা সারা জীবনই লক্ষ করেছি। দুর্বোধ্যতা ইংরেজিতেও ছিল। সরকারি অফিসে ইংরেজির চেয়ে বাংলা আরও দুর্বোধ্য করে লেখা হয়।
কেন এমন হয়, এটা যদি জানতে চাই তাহলে বলতে হয় সচেতনতার অভাবই বড় কারণ। যেকোনো লেখাই রিভিশন (পুনরায় দেখা) দিতে হয়। রিভিশন শুধু শব্দ ঠিক করার জন্য নয়। রিভিশনে পাঠক সাবলীলভাবে বুঝতে পারবে কি না, সেটাও দেখা হয়। সরকারি দপ্তরের একটা চিঠি একজন লেখেন। সেটা আরও ধাপে ধাপে অনেকে দেখেন বা রিভিশন দেন। কিন্তু সেই রিভিশনে দরদ থাকে না। তারা সচেতন থাকেন না। রিভিশনের সময় দুটি বিষয় দেখা উচিত। এক নম্বর বিষয় হলো শুদ্ধ হওয়া। ভাষা পরিবর্তনশীল। এটা দিনে দিনে হয় না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিবর্তন হয়। টের পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় বিষয় হলো যার উদ্দেশে লিখছি, সে এটা পড়ে বুঝতে পারবে কি না। লেখার সময়ই নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে যার উদ্দেশে চিঠিটা লেখা হচ্ছে, সে এটা কতটা বুঝতে পারবে।
অনেকের ধারণা আরে, লিখলেই হলো। পোশাকের ক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন শরীর ঢাকলেই হলো। কিন্তু যে রঙের পোশাক পড়ছি সেটা যথাযথ কি না, ফিটিং ঠিক আছে কি না, আউট অব ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছি কি না এসব দেখতে হয়। একটা কিছু পড়লেই হলো না। তেমনি ভাষার ক্ষেত্রে একটা কিছু লিখলেই হলো না। সেটা শুদ্ধ এবং সাবলীল হতে হবে। এর জন্য যত্ন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিতাই আসল। এই যে আজ দুর্নীতির কথা বলা হয়, অনিয়মের কথা বলা হয় সব জায়গায়ই জবাবদিহিতার বিষয় চলে আসে। একজন জুনিয়র কর্মকর্তা যদি বুঝতে পারেন ভাষাটা শুদ্ধ না হলে, সাবলীল না হলে তাকে সিনিয়রের কাছে জবাবদিহি করতে হবে; তাহলে জুনিয়র কর্মকর্তা তটস্থ থাকবেন। আর যদি জবাবদিহিতা না থাকে তাহলে যা হচ্ছে তাই হবে। জুনিয়র কর্মকর্তা যখন দেখেন কঠোর জবাবদিহিতা আছে তাহলে ভুল করার বা সাবলীল না হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আমার সময়ই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটা পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। বাংলা একাডেমি বানানরীতি ও ব্যবহারবিধি অনুসরণ করার জন্য। ভাষাটা শুদ্ধ করে লেখার জন্য যখন বলা হয়, তখন অনেকেই প্রতিউত্তর দেন ‘শুদ্ধই তো আছে।’ এজন্যই একটা প্রমিত রূপ দরকার। কোনটাকে আপনি শুদ্ধ বলবেন সেটা নির্ধারণ করা দরকার। ওই অবস্থায় আমরা বাংলা একাডেমিকেই অনুসরণ করার কথা বলি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাজের ধারাবাহিকতায় ওই সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিছু কাজ করেছিল। এর মধ্যে যেসব শব্দ বেশি ব্যবহার হয়, সেগুলো নিয়ে বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ একটি বই করেছিল, যা খুব কাজে দিয়েছিল।
অশুদ্ধ বাংলা লিখলে কোনো শাস্তি হয় না। জবাবদিহিতা না থাকায় ভাষার বিকৃতি হচ্ছে। এটা একটা আবেগের বিষয়। ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি। এর ধারাবাহিকতা ধরেই স্বাধীনতা এসেছে। যারা ভাষার জন্য জীবন দেয়নি তারা কিন্তু ভুল করে না। প্রতিবেশী দেশ ভারতে যদি কোনো ড্রাফটে ভুল হয় বা সঠিক না হয় বা বিষয়টা যদি পরিষ্কারভাবে না বোঝা যায়, তাহলে এর জন্য কঠোর জবাবদিহিতা আছে। আমাদের এখানে তো উচ্চারণের বিষয়টি উপেক্ষিত। কিন্তু ওরা উচ্চারণের বিষয়েও নাক সিটকায়।
লেখক : মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
অনুলিখন : আশরাফুল হক