দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালের বাজার সম্প্রতি অস্থির হয়ে ওঠে। এতে প্রতি কেজি চালের দাম অন্তত ৬-৭ টাকা পর্যন্ত বাড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে খোদ খাদ্যমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের বাজার তদারকি টিম কয়েকটি জেলায় মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে। দেখা যায়, বাজারে একই জাতের ধান থেকে উৎপাদিত চাল ভিন্ন ভিন্ন নামে ও দামে বিক্রি হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে চালের দাম সহনশীল ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বস্তায় মিলগেট পর্যায়ের মূল্য এবং চালের বস্তায় ধানের জাত উল্লেখ করাসহ ছয়টি তথ্য লেখা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। গতকাল বুধবার এ সংক্রান্ত ‘চালকল থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহকৃত চালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ মূল্য অবহিতকরণ’ পরিপত্র জারি করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
এতে বলা হয়েছে, চাল উৎপাদনকারী মিলারদের গুদাম থেকে বাণিজ্যিক কাজে চাল সরবরাহের প্রাক্কালে চালের বস্তার ওপর উৎপাদনকারী মিলের নাম, জেলা ও উপজেলার নাম, উৎপাদনের তারিখ, মিলগেট মূল্য এবং ধান-চালের জাত উল্লেখ করতে হবে। তবে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নতুন সিদ্ধান্ত সব জেলা প্রশাসক/উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা/আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক/জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক/উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, খাদ্য পরিদর্শকরা পরিদর্শনকালে এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। তবে এ প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন না হলে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ, বিপণন, (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন ২০২৩ এর ধারা-৬ ও ধারা-৭ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী ধারা-৬-এর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার সুযোগ রয়েছে। ধারা-৭-এর শাস্তি হিসেবে রয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ১৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম বলেন, ‘ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি আনতে কৃষি মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা যে মাঝেমধ্যে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমদানি-রপ্তানি করতাম, এবার বাজার মনিটরিং করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে দেব। কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করব। এতে ভোক্তা থেকে উৎপাদক পর্যায়ে সবাই স্বস্তিতে থাকবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, আমনের মৌসুমে দেশের মোট চালের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৭ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের উৎপাদান হয়। সে অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চালের উৎপাদন বেশি হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চালের বেশি উৎপাদন হলেও কোনো কারণ ছাড়াই দেশের বাজারে চালের দর বেড়েছে।
অন্যদিকে চলতি বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে হঠাৎ করে চালের কেজিতে ৭ টাকা দাম বাড়ে। বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৭৫ টাকা। আর দরিদ্র মানুষের খাবার হিসেবে পরিচিত এক কেজি মোটা (ব্রি-২৮) চাল ৫৩-৫৫, গুটি স্বর্ণা ৫০-৫২ ও প্রতি কেজি নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বাজার তদারকি সংস্থাগুলো মাঠে নামে। এতে নানা অনিয়মের দায়ে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছর ২১ জানুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খাদ্য মন্ত্রণালয় বাজারে অভিযান পরিচালনা করে। এতে মজুদ কারবারসহ চাল বিক্রিতে নানা অনিয়ম ঠেকাতে সারা দেশে ৩ হাজার ৩৭০টি অভিযান পরিচালনা করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এসব অভিযানে ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫০ টাকা জরিমানা আদায় হয়। কিন্তু বাজারে এর দৃশ্যমান কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। ফলে চালের দামে তেমন কোনো পার্থক্য আসেনি।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, হঠাৎ করে চালের বাজারে অস্থিরতার জন্য নিবন্ধনবিহীন মজুদদার ও করপোরেট ব্যবসায়ীরা দায়ী।