দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই প্রথম সোনা পরিশোধনাগার শিল্প স্থাপন হতে যাচ্ছে। এতে করে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ সংবলিত সোনার বার রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে দেশে এ ধরনের শিল্পে যন্ত্রপাতির শুল্ক অনেক বেশি। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। তাই সোনা পরিশোধনাগার শিল্পকে মূল্য সাশ্রয়ী করতে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ দাবি জানায় সংগঠনটি। এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে বাজুস ও অন্যান্য সংগঠনের একাধিক কর্মকর্তা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বাজুসের সাধারণ সম্পাদক বাদল চন্দ্র রায় প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেন, সোনা নীতিমালা অনুযায়ী, বৈধভাবে সোনার অলংকার, সোনার বার, সোনার কয়েন তৈরির কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে রেয়াতসহ বিভিন্ন প্রকার প্রণোদনামূলক সহায়তা প্রদান করা হবে। কিন্তু এই পরিশোধনাগারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির শুল্ক-কর ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে প্রাথমিক উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। তাই এই পরিশোধনাগারকে সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে কর অবকাশ সুবিধা বড় ভূমিকা পালন করবে।
পরিশোধনাগারে কর অবকাশ সুবিধার পাশাপাশি অপরিশোধিত ও আংশিক পরিশোধিত সোনা আকরিক আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি কমানোর দাবিও জানিয়েছে বাজুস। সংগঠনটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে অপরিশোধিত সোনা আকরিক আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক কর রয়েছে। এক্ষেত্রে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান বাজুসের নেতারা। বর্তমানে আংশিক পরিশোধন সোনা আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক কর আরোপ করা আছে। এটি কমিয়ে ৫ শতাংশ নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুল্ক কর কমানো হলে আমদানিকারকরা পরিশোধনপরবর্তী খাঁটি সোনা আন্তর্জাতিক মূল্যে ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন। এতে সোনা চোরাচালানও বন্ধ হবে।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাদল চন্দ্র রায় বলেন, বর্তমানে সোনা-রুপার বিক্রয় মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট ধার্য রয়েছে। সোনার অলংকারে বাজুসের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ও ভ্যাটের কারণে বর্তমানে প্রতি ভরি সোনার দাম দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা। ভারতের মতো এ খাতে ৩ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করা হলে ত্রেতাদের কাছে তা কিছুটা সহনীয় হবে। বাজেট প্রস্তাবে সারা দেশের ৪০ হাজার জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) মেশিন বসানোর প্রস্তাব দেন বাজুস সাধারণ সম্পাদক। এতে সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আয় করতে পারবে। ব্যবসায় সমতা আসবে।
বাদল চন্দ্র রায় সোনার নীতিমালা সংশোধনের মাধ্যমে পর্যটকদের সোনার বার আনা বন্ধ করা, ট্যাক্স ফ্রি সোনার অলংকার অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। তিনি পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে ব্যাগেজ রুল সমন্বয় ও একজন যাত্রীকে একবার ব্যাগেজ রুলের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
বাজুসের ধারণা, দেশের জল, স্থল ও আকাশপথে প্রতিদিন অন্তত ২০০ কোটি টাকার সোনার অলংকার ও বার অবৈধপথে দেশে আসছে, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এই চোরাচালানের পুরোটাই ডলার আকারে অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সোনার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেট, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সোনা নীতিমালার অধীন ব্যাগেজ রুল সংশোধনের মাধ্যমে পর্যটক কর্তৃক সোনার বার আনা পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাজুস। এছাড়া পর্যটকদের ট্যাক্স ফ্রি সোনার অলংকারের ক্ষেত্রে ১০০ গ্রামের পরিবর্তে ৫০ গ্রাম করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
গতকালের প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারী সমিতি মূসক আইনের ২৬ ধারার আলোকে অব্যাহতির তালিকায় হাতে তৈরি কনফেকশনারি পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
ই-ক্যাব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যূনতম কর শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে হ্রাস করে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ করা, বাড়িওয়ালার আয়কর রিটার্নের দাখিল প্রমাণ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা বাতিলের প্রস্তাব দেয়।
৪০ হাজার প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দাখিল করে কি না তা কর্মকর্তাদের খোঁজ নিতে বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। পাশাপাশি জুয়েলারি ও ই-কমার্স খাতকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান।