প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, কিছু কথা বলা বাঙালির চরিত্র, কিছু ভালো লাগে না। একটা দলই আছে যাদের কিছু ভালো লাগে না। তারপর যখন হয়, তখন সেটা তারা উপভোগ করে।
গতকাল শুক্রবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। জার্মানির মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন করেন সরকারপ্রধান। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের পর এটাই তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন।
একটা দলই আছে যাদের কিছু ভালো লাগে না : রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের অভাব রয়েছে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালে গঠিত হয়েছিল গণমানুষের কথা বলে। সেই সময় থেকে যত আন্দোলন- সংগ্রাম করেই কিন্তু আওয়ামী লীগ এগিয়ে গেছে। আমি আমার প্রতিপক্ষ কয়েকটি দল দেখি একটা যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতে ইসলামী, যাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিল সংবিধান সংশোধন করে। ভোটের অধিকার, এমনকি পাসপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানে গেছে তাদেরও ভোটের অধিকার দিয়েছে এবং দল করার অধিকার দিয়েছে। জাতির পিতার হত্যাকারী তাদেরও পার্লামেন্টে এনে ভোটচুরি করে খালেদা জিয়া বসিয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আজ আমি যদি দেখি মিলিটারি ডিক্টেটরদের পকেটের দুটি পার্টি একটি বিএনপি, আরেকটি জাতীয় পার্টি। ক্ষমতার উচ্চাসনে বসে যে দলগুলো তৈরি হয়, সে দলগুলোর মাটি-মানুষের সঙ্গে সম্পর্কটা থাকে না। তাদের শিকড়ের সন্ধানটা কোথায়? তাদের চিন্তা-চেতনা, এমন একটা পরিবেশ হোক তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। সেটা করতে গিয়ে প্রথম ধরা খেল ২০০৮-এর নির্বাচনে। প্রচার-প্রচারণা সব দিক থেকে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমান সমান এরকম একটা ভাব ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের যে মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, আস্থা-বিশ্বাস আওয়ামী লীগের ওপর আছে এটা কিন্তু অপপ্রচারের কারণে অনেকটা ঢেকে গিয়েছিল। ওই নির্বাচনে দেখা গেল, নির্বাচন নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করতে পারেনি। নির্বাচনের রেজাল্টটা কী? আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩৩টি আসন পেল ৩০০ সিটের মধ্যে। বিএনপি ২০-দলীয় জোট নিয়ে পেল ৩০টি আসন। এরপর থেকে এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধ্বংস করার একটা চেষ্টা...।’
বারবার সেই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যেভাবে পারি সেখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে এই গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত রাখতে পেরেছি। আমার সামনে এটাই থাকবে এই যে গণতান্ত্রিক ধারা আমরা স্থায়ী করেছি যার সুফল দেশবাসী পাচ্ছে, তাদের জীবনমান উন্নত হয়েছে, এই ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা এগিযে যাব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিপক্ষের কী দেখি? জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ খুন, রেলে আগুন, বাসে আগুন! এটাই করে যাচ্ছে। এটা তো দেখতে হবে, কারা মানুষের পাশে আছে। রাজনীতি জনগণের কল্যাণে কাজ করে। রাজনীতি যদি ক্ষমতা দখল আর ক্ষমতা উপভোগ করা হলে তো মানুষ কিছু পাবে না।’
রমজানে কোনো জিনিসের অভাব হবে না : সরকারপ্রধান বলেন, রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের অভাব হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রমজান তো কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য। রমজানে মানুষ কম খায়। কিন্তু আমাদের সাইকোলজি হচ্ছে, রমজান এলে যেন খাওয়া-দাওয়ার চাহিদাটা বেড়ে যায়। রমজানে যে জিনিসগুলো বেশি দরকার যেমন ছোলা, খেজুর, চিনি এগুলো পর্র্যাপ্ত পরিমাণে আনার ব্যবস্থা আছে। কাজেই এটা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। এ ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি অনেক আগে থেকেই।’
৫ বছরে দেশকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে চান প্রধানমন্ত্রী : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে কোন জায়গায় নিয়ে যেতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এই ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা এগিযে যাব। ইতিমধ্যে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১ থেকে ২০৪১ ঘোষণা দিয়েছি। সেখানে প্রত্যেক মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে, বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হবে এটাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘আজ এটা প্রমাণিত সত্য যে, একমাত্র গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা যদি বজায় থাকে তাহলে একটা দেশ উন্নত হয়। গত ১৫ বছরে আমরা দেশটাকে যে উন্নত করতে পেরেছি, আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে, শিক্ষা-দীক্ষা, স্বাস্থ্য সব দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক ওপরে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। আগামী পাঁচ বছরে আমাদের কাজ হবে এই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের যেহেতু যাত্রা শুরু ২০২৬ সালে, যে সময়টুকু পাব উন্নয়নশীল দেশ এটাকে যথাযথভাবে যেন আমরা এগিয়ে যেতে পারি, সেই কাজটা করাই হচ্ছে সব থেকে বড় কথা। সেদিকে আমরা মনোযোগ দিয়েছি। কমিটি করেছি, সবই করছি। আমরা সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’
বিশ্বমোড়লরা দুমুখো নীতিতে বিশ্বাস করে : ‘বিশ্বমোড়লদের’ বিরুদ্ধে দুমুখো নীতি গ্রহণের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের বিশ্বমোড়লরা দুমুখো নীতিতে বিশ্বাস করে। এক জায়গায় ফিলিস্তিনের সব জমি দখল করে রেখেছে, সেটা ইনভেশন (আগ্রাসন) নয়। ইউক্রেনেরটা ইনভেশন! এই দুমুখো নীতি কেন হবে, সেটা আমার প্রশ্ন ছিল। অনেকেই সাহস করে বলবে না। আমি বলেছি।’
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, “অনেকেই সাহস করে বলবে না। নানাজনের নানা দুর্বলতা আছে, আমার কোনো দুর্বলতা নেই। আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমার কাছে ক্ষমতাটা হলো ‘থাকে লক্ষ্মী যায় বলাই’ একটা কথা আছে না, আমার কাছে সেটাই। থাকলে ভালো! আমি দেশের জন্য কাজ করতে পারব। না থাকলে আমার কোনো আফসোস নেই।”
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি যুদ্ধ চাই না। যুদ্ধকালীন যে কষ্ট আমরা তার ভুক্তভোগী। আমি নিজেই ভুক্তভোগী। আমাদের দেশের মানুষ যে গণহত্যার শিকার হয়েছে সেটা তো আমি জানি। সেজন্য সবসময় বলে আসছি আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আজ ফিলিস্তিনে যেটি হচ্ছে সেটি তো অমানবিক কাজ। হাসপাতালের ওপর আক্রমণ, হাসপাতালে গিয়ে মানুষ মারা! শিশুদের কী দুরবস্থা! এটা মানবতাবিরোধী।’ তিনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য ছিল ২০২১ পর্যন্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশকে একটা ধাপে তুলতে হবে। আমি সেটি করে দিয়েছি। আমি ক্ষমতায় আসব কি আসব না, আমি তো পরনির্ভরশীল হয়ে করিনি। আমার একমাত্র নির্ভরতা হচ্ছে দেশের জনগণ। আমি সবসময় চেয়েছি জনগণের সমর্থন। হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব প্রয়োজন। দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হবে। এখন তো বিশ্বটা গ্লোবাল ভিলেজ, একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের অনেক জিনিস কিনতে হচ্ছে, আমরা বাধা পাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে আমরা বলেছি যুদ্ধটা যখন শুরু হয়, নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, সেটি ওই জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশে মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাইনি, ঝগড়া করতে যাইনি। আমরা ধৈর্য ধরেছি, আলোচনা করেছি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি, তারা ফেরত নিক। এখন যে অবস্থা চলছে, আমি সবাইকে বলেছি ধৈর্য ধরতে। আমরা লক্ষ রাখব, কোনো কিছুতে আমাদের কোনোরকম উত্তেজিত হলে চলবে না। শান্ত মাথায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সেটা করে আমরা সুফল পাচ্ছি। যদি হিসাব করেন, দক্ষিণ এশিয়া-দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আমরাই কিন্তু সব থেকে সুস্থ অবস্থায় বিরাজ করছি। অন্য দেশগুলো কষ্ট পাচ্ছে।’
আমরা চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার একটা চাপের ভেতরে আছি। এ অবস্থায় বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মিডল পাওয়ার বা ইমার্জিং পাওয়ারের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির চিন্তা কি আপনি করছেন এমন প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সাধারণ একজন মানুষ। ছোট একটা ভূখন্ডে বিশাল জনগোষ্ঠী। আমি সেটি নিয়েই ব্যস্ত। তবে কোথাও কোনো অন্যায় দেখলে আমি আমার কণ্ঠ সোচ্চার করি। প্রতিবাদ করি। যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই এই কথাটা বলি। কিন্তু কোনো প্ল্যাটফর্ম করার মতো দক্ষতা আমার নেই। যোগ্যতাও আমার নেই। সেই চিন্তাও আমার নেই। আমি মনে করি অনেক প্ল্যাটফর্ম হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে তো কাজের সময় কাজে লাগে না, সেটা হলো বাস্তব। না হলে আজ গাজায় যুদ্ধ বন্ধে নিরাপত্তা কাউন্সিলে প্রস্তাব আসে। সেখানে ভেটো দেওয়া হয়। বাংলাদেশে যুদ্ধ চলার সময়ও এই অবস্থাটা আমরা দেখেছি। আমার যেটুকু ক্ষমতা, আমার ক্ষমতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। এর থেকে বড় কিছু চিন্তা করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। সেই দক্ষতাও আমার নেই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কাছে যুদ্ধ কীভাবে বন্ধ হবে সেটা জানতে চেয়েছি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বা দেখা হলেও সেটা জানতে চাইব। আমি চাইব যুদ্ধ বন্ধ হোক। আমার কথা আমি বলে যাব। যে বোঝার বুঝুক, না বুঝলে আমার কিছু আসে যায় না। পরিষ্কার কথা।’
ইউরোপীয়রা জানত আমিই ইলেকশনে জিতে আসব : নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় প্রতিটি দেশের সঙ্গে আমাদের যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক আছে, সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও আছে। যে কারণে এবারের ইলেকশন নিয়ে তারা কোনো কথা বলেনি। তারা জানত নির্বাচনে আমিই জিতে আসব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের ভালো একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। ফ্রান্স আমাদের এক বিলিয়ন ইউরো দেবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য। এখন আমরা যেসব প্রজেক্ট করব, সেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেন হয়, তাহলে আমরা এসব অর্থায়ন কাজে লাগাতে পারব।’
পাকিস্তানের নির্বাচন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটি দেশে নির্বাচনের রেজাল্ট ডিক্লেয়ার করতে ১২-১৪ দিন সময় লাগলেও তাদের ইলেকশন ফ্রি-ফেয়ার। আর বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাত্র ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেজাল্ট এসে গেল, সেটি ফ্রি-ফেয়ার না? সুতরাং এ রোগের কোনো ওষুধ আমাদের হাতে নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশটিতে (পাকিস্তান) এখন তো বোধহয় একটা সমঝোতায় এসেছে কে প্রেসিডেন্ট হবে, কে কী হবে। এরকম যদি আমাদের দেশে হতো, তাহলে বোধহয় সমালোচনাকারীরা খুশি হতো।’
টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই প্রসঙ্গ : ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে টাঙ্গাইল শাড়ির নিবন্ধন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি টানা কিছুদিন টাঙ্গাইল শাড়িই পরেছেন। কারণ এটা বাংলাদেশেরই শাড়ি। সংবাদ সম্মেলনে তার নিজের পরনে যে শাড়িটি আছে, সেটি ফ্রেঞ্চ শিফন নয়, সেটির তিনি নাম দিয়েছেন শফিপুর শিফন, যা আনসার-ভিডিপির সদস্যদের হাতে তৈরি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।