রিংয়ের জটিলতা এখনো কাটেনি

চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের (মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ট্রেডার্স) সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথা সরকারের একটা সমঝোতা হয়েছে। হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত করোনারি স্টেন্টের (হার্টের রিং) দাম আবারও বাড়তে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

ইউরোপীয় রিং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে এ দাম বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। হার্টের রিংয়ের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে ঔষধ প্রশাসন, যা ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়েছে। নতুন মূল্য নির্ধারণের দিন থেকে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে হাসপাতালে রিং সরবরাহ বন্ধ রাখেন ইউরোপীয় রিংয়ের আমদানিকরা।

এরপর ৭০ দিন কেটে গেছে, কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আন্দোলনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় এ নিয়ে রোগীদের ভোগান্তি চলছিল।

দর কমানোর প্রতিবাদে ইউরোপীয় রিংয়ের আমদানিকারকরা প্রথমে ধর্মঘট ডাকেন এবং হাসপাতালে স্টেন্ট সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। এতে সফল না হয়ে তারা দাম বাড়াতে আদালতের শরণাপন্ন হন। পরে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আমদানিকারকদের মধ্যে সমঝোতা হয়। ১০ জানুয়ারি রিট প্রত্যাহার করেন আমদানিকারকরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউরোপীয় রিংয়ের এক আমদানিকারক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আদালতে রিট করেছিলাম। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দাম বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলে আমরা রিট প্রত্যাহার করে নিই। দাম কতটা বাড়ানো হবে বা সমন্বয় করা হবে, এ নিয়ে কিছু মতানৈক্য চলছিল। ২৭ ফেব্রুয়ারি অধিদপ্তরের সঙ্গে আমাদের একটা বৈঠক আছে, যেখান থেকে দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসবে। কত টাকা দাম বাড়তে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্টেন্টভেদে দেড় হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা বাড়তে পারে বলে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।’ 

দাম নির্ধারণ কমিটির সভাপতি স্বাস্থ্য সচিব (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ) জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৭ বা ২৮ ফেব্রুয়ারি আমাদের একটা বৈঠক হবে। সেখানে দাম নির্ধারণ কমিটির সদস্যরা ছাড়াও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আমদানিকারকরা থাকবেন। সেখানেই এ বিষয়ে আলোচনা হবে। কার কী দাবি তা শোনা হবে এবং বিশেষজ্ঞদের অভিমত নেওয়া হবে। তারপর দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। দাম বাড়ানো হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। আগে বৈঠক হোক, তারপর আপনারা জানতে পারবেন।’

রিং আমদানিকারকরা বলেন, নতুন দাম যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর আমদানিকারকরা মেনে নিলেও মানতে নারাজ ইউরোপীয় রিংয়ের আমদানিকারকরা। দাম নির্ধারণে মার্কআপ ফর্মুলা অনুসরণ করে সরকার। সেই অনুযায়ী রিংয়ের কেনা মূল্যের চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশিতে দাম ঠিক করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে আমদানি খরচ, মার্কেটিং, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও মুনাফা অন্তর্ভুক্ত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের রিংয়ের দামের ক্ষেত্রে এই ফর্মুলা মানা হলেও ইউরোপীয় রিংয়ের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

ইউরোপ থেকে রিং আমদানি করে ওমেগা হেলথ কেয়ার। এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ইশতিয়াক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংকট সমাধানে আমরা অধিদপ্তরের দিকে তাকিয়ে আছি। আশা করি, ২৭ ফেব্রুয়ারি এ সমস্যার অবসান হবে। তবে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা স্টেন্ট সরবরাহ বন্ধ রাখছি। আমাদের রিং শুধু জরুরি রোগীদের দেওয়া হবে।’

হার্টের চিকিৎসায় বহু ব্যবহৃত পদ্ধতি হচ্ছে স্টেন্ট বা রিং পরানো। কারও হৃৎপিন্ডে ব্লক বা রক্তসঞ্চালনে বাধার সৃষ্টি হলে চিকিৎসকরা তাকে এক বা একাধিক রিং পরার পরামর্শ দেন। এসব রিং বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে হার্টের রিং আমদানিকারক ২৭টি কোম্পানি আছে। ৩টি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ও ২৪টি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে রিং আমদানি করে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকেও কিছু রিং আসে।

ইউরোপীয় রিংয়ের অমদানিকারকরা সরবরাহ বন্ধ রাখায় বিপাকে পড়েছে রোগীরা। জানা গেছে, ইউরোপীয় রিংয়ের আমদানিকারকরা সরবরাহ বন্ধ রাখায় রোগীরা বাজেট অনুযায়ী বিকল্প ব্র্যান্ডের রিং বেছে নিতে পারছে না। তারা সমস্যায় পড়ছে।

বৃহস্পতিবার হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তিনতলায় গিয়ে দেখা যায়, আমেরিকার তিন রিং কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা রিং নিয়ে অপেক্ষা করছেন আর রোগীরা তাদের বাজেট অনুযায়ী রিং পছন্দ করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রয়কর্মী বলেন, ‘আগের চেয়ে আমাদের রিংয়ের বিক্রি অনেক বেড়েছে। তবে অনেক রোগীর সাইজ অনুযায়ী হচ্ছে না। এ নিয়ে কিছুটা সমস্যা আছে। তবে আমাদের সরবরাহে ঘাটতি নেই।’

রাজধানীর ইব্রাাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মাসুম সিরাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরবরাহ একটা পক্ষ বন্ধ রাখলেও এর প্রভাব এখনো হাসপাতালে পড়েনি। সরকার যে দাম ঠিক করেছে তা যৌক্তিক। নতুন করে দাম বাড়ানো উচিত হবে না।’ 

হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মীর জামাল উদ্দীন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত রিং নিয়ে সংকট হয়নি। কিছু কোম্পানি রিং সরবরাহ বন্ধ রাখলেও রোগীরা সমস্যায় পড়ছে না। শীতকাল চলে যাচ্ছে, হার্টে রিং পরাতে আসা রোগীদের সংখ্যা আগামী দিনে বাড়বে। তাই এ নিয়ে একটা মীমাংসা হলে ভালো হয়।’