সানেমে রেহমান সোবহান

একদলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে রাষ্ট্র

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের দুটি জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য যুগান্তকারী সাফল্য। গণতন্ত্রের সেই চর্চা পরে আর অনুসরণ করা হয়নি। ৯৬ সালের নির্বাচন এবং গণতন্ত্রচর্চা-পরবর্তী সময়ে আর অনুসরণ করেনি আওয়ামী লীগ। বরং ক্ষমতা কত দীর্ঘ করা যায়, সে চেষ্টাই করছে তারা। রাষ্ট্র চলে যায় একদলীয় নিয়ন্ত্রণে।

দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতি অধ্যাপক রেহমান সোবহান একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই অভিমত জানান।

গতকাল শনিবার ঢাকায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন রেহমান সোবহান। সম্মেলনের একটি অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘রাষ্ট্রব্যবস্থায় দলীয় কর্তৃত্বের উত্থান এবং বিকাশ : বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের পরিণাম কী।’

গণতন্ত্রের চর্চা বাংলাদেশে অনুসরণ করা হচ্ছে না জানিয়ে গবেষণা সংস্থা সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, দেশে ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের দুটি জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য যুগান্তকারী সাফল্য। কোনো ধরনের সেনা সমর্থন ছাড়াই অবাধ এবং অংশগ্রহণমূলক ওই দুই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম দফায় খালেদা জিয়া এবং পরেরবার শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন। এটি দ্বিদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও বড় অবদান রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও বাংলাদেশের এই নির্বাচনব্যবস্থা অনুসরণ করে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এই চরিত্রের পেছনে অপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রভাব। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানেই রাজনৈতিক পরিচয় আগে দেখা হয়। এটা এক ভয়ংকর পরিস্থিতি, যা উন্নত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে বড় বাধা।

এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান। বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ, গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. আশিকুর রাহমান। বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউটস অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মির্জা এম হাসান।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-সানেম সপ্তমবারের মতো ঢাকায় এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।

গতকালের বিভিন্ন কর্ম-অধিবেশনে অন্যদের মধ্যে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান উপস্থিত ছিলেন।

গত শুক্রবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে তিন দিনের এই সম্মেলন উদ্বোধন করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিউ ফ্রন্টিয়ার্স ইন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইমার্জিং ডাইনামিকস’। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি ও ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন আয়োজনে সহযোগিতা দিচ্ছে। ১৬টি অধিবেশনে ১১ দেশের অর্থনীতিবিদ, গবেষক, উন্নয়নকর্মী এবং শিক্ষার্থীরা গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছেন।

১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা-পরবর্তীতে অনুসরণ না হওয়া, সুশাসনের ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিনষ্ট করা, ব্যাংকঋণ প্রাপ্তি এবং পরিশোধ না করার সংস্কৃতি, টেন্ডারে অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রে দলীয় দাপটের সমালোচনা করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, দলীয় কর্তৃত্ববাদীয় রাষ্ট্রের যে কথা বলা হয়ে থাকে, তা সঠিক নয়। দুই দল বা বহুদলের অংশগ্রহণ খুব একটা দেখা যায় না। বরং রাষ্ট্র এখন একদলীয় নিয়ন্ত্রণে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভূরাজনীতির প্রভাব প্রসঙ্গে ড. রেহমান সোবহান বলেন, এ ধরনের প্রভাব সব সময়ই ছিল। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় রাখা এবং ক্ষমতার বাইরে রাখার বিষয়ে তাদের ভূমিকা থাকে। তবে কিছু ডলারের ব্যবসা দিলে তাদের রাজি রাখা যায়। এ রকম ক্ষেত্রে তারা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। শক্তিশালী বিরোধী দলই শেষ পর্যন্ত ভরসা।

রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ এখন বাংলাদেশের ব্যবসা মডেলের অংশ হয়ে গেছে। সব ব্যবসা এখন সিন্ডিকেটের কবজায়। তবে সব ব্যবসায়ী এর সঙ্গে জড়িত নন, কিংবা ব্যাংকঋণ পরিশোধে খেলাপি নয়। রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীরা এর সঙ্গে জড়িত। তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেন, কিন্তু পরিশোধ করেন না। রিসিডিউলিং বা পুনঃতফসিলীকরণের ব্যবস্থা নেন। টেন্ডারেও তারাই অংশ নেন। রাজনীতিকে তারা ভাগ্যবদলের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।