সময় বাকি ৪ দিন কাজ ‘অর্ধেক’

প্রবল বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরবেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জে প্রায় প্রতি বছরই দেখা দেয় অকাল বন্যা। মার্চ মাসের দিকে শুরু হওয়া এই বন্যার পানি জেলার হাওরের কৃষকদের বোরো ধান ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফলে ধান রক্ষা করতে প্রতি বছর সরকারি অর্থায়নে হাওরে নির্মাণ করা হয় ফসলরক্ষা বাঁধ। গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার নীতিমালা অনুযায়ী এসব ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ গত ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। সে হিসেবে হাতে সময় আছে আর মাত্র চার দিন। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাদবাকি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে। তবে হাওর বাঁচাও আন্দোলন নেতাদের দাবি, কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় আগাম বন্যা নিয়ে শঙ্কিত হাজারো কৃষক।

এদিকে কাজ শেষের আগেই কয়েকটি উপজেলার বেশ কিছু বাঁধে ধস ও ফাটলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কৃষকরা জানান, বাঁধের ওপরে ও দুদিকের ঢালে দূর্বা ঘাস না দেওয়া এবং মাটি পিটিয়ে (দুরমুশ) শক্ত না করায় এমন ঘটনা ঘটছে।

ভুক্তভোগী কৃষকরা এবং হাওর বাঁচাও আন্দোলন নেতারা বলেন, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে প্রতি বছরই নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হয় কয়েকশ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ। আর প্রতিবারই এ কাজে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় হাওরের ফসল। যে বছর বৃষ্টিপাত ও ঢল বেশি হয়, সেই বছর ফসলের ক্ষতিও হয় বেশি।

এ জেলায় রয়েছে ছোট-বড় ১৩৭টি হাওর। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে। যার ওপর নির্ভরশীল জেলার প্রায় চার লাখ কৃষকের জীবন-জীবিকা। যে কারণে গণ-শুনানির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন শেষে এই পিআইসির মাধ্যমে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ করানো হয়।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধের মধ্যে ৫৮১ কিলোমিটার বাঁধে ৭৪১টি পিআইসির মাধ্যমে ১২৬ কোটি টাকার মাটির কাজ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা এবং হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা বলছেন, এ বছরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনোভাবেই বাঁধের বাদবাকি কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। কাজ চলছে ধীরগতিতে। আর এই ধীরগতির কারণ অজুহাত হিসেবে বলা হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে। ওই সময় প্রকল্প বাস্তবায়নসংশ্লিষ্ট লোকজন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কাজ কিছুটা পিছিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির লোকজন এবং শ্রমিকরা নির্বাচন নিয়ে মেতেছিল। কিন্তু গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচন শেষের ১ মাস ১৭ দিন পার হলেও কাজে তেমন গতি আনতে পারেনি পাউবো।

কৃষকরা বলছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও পাউবো কাজ শেষ করতে সময় বাড়াবে। কিন্তু এরই মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে অনেক ফসলরক্ষা বাঁধ। যে বাঁধগুলোর কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোতেও দুরমুশ দিয়ে মাটি শক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া বাঁধের মাটি যাতে সরে না যায়, সে জন্য দেওয়া হয়নি দূর্বা ঘাস। এই ঘাস না দেওয়ায় ইতিমধ্যে কয়েকটি উপজেলার বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে; বিশেষ করে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ছাইয়ার হাওর কিত্তার ফসলরক্ষা বাঁধ এবং জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া ও মইয়ার হাওর ফসলরক্ষা বাঁধে দেখা দিয়েছে ফাটল।

তবে বাঁধে ধস বা ফাটলের অভিযোগ মানতে নারাজ সুনামগঞ্জ পাউবোর কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, হঠাৎ বৃষ্টির কারণে বাঁধের মাটি সামান্য সরেছে। এগুলো দ্রুতই ঠিক করা হবে। একই সঙ্গে বাকি চার দিনের মধ্যে ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে যাবে।

জেলায় ইতিমধ্যে শতভাগ জমিতে ধান রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় এবং বাঁধে ঘাস না দেওয়ায় ফসলরক্ষা নিয়ে চিন্তা যেন শেষ হচ্ছে না কৃষকদের। শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা অনেক টাকা খরচ করে ধান রোপণ করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় আতঙ্কে আছি। বাঁধ শক্ত করতে দুরমুশ দেওয়া এবং বৃষ্টির পানি যাতে সরাসরি বাঁধের মাটিতে না পড়ে, সে জন্য দূর্বা ঘাস দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এবার যদি আগাম বন্যায় বাঁধ ভেঙে যায় তাহলে আমাদের পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেছিল, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করবে। কিন্তু তারা আমাদের হিসেবে এখনো ৫০ শতাংশ কাজই শেষ করতে পারেনি। আমরা ২৮ ফেব্রুয়ারির পর জেলাব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেব। এমনকি জনস্বার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে মামলাও করতে পারি। তারা কৃষকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই বোরো ফসল অনেক কৃষক পরিবারের সারা বছরের আয়। এই ধান বিক্রির টাকা দিয়ে তাদের সংসার চলে। কিন্তু অকাল বন্যায় যদি ২০১৭ ও ২০২২ সালের মতো আবারও বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায় তাহলে কৃষকরা পথে বসে যাবে। তাই ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করার বিকল্প নেই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মামুন হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাঁধে কোনো ধস হয়নি। আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছি। সামান্য মাটি সরেছে, এগুলো দ্রুত ঠিক করা হবে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮১ শতাংশ বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে। আর যে কয়েক দিন বাকি আছে আশা করি এর মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করতে পারব। কাজের সময় বাড়াতে হবে না। কাজ কিছুটা ধীরগতিতে হলেও এখন পুরোদমে চলছে। কোথাও কোনো গাফিলতি পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’