বিদেশি ঋণ প্রাপ্তির ৪২ শতাংশই যাচ্ছে পরিশোধে

দেশে ডলার সংকটের এ মুহূর্তে চিন্তা আরও বাড়িয়েছে বিদেশি ঋণ পরিশোধ। বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া বিদেশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ইতিমধ্যে পার হয়েছে। ফলে ঋণ ও সুদ দুটোতেই চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে অর্থছাড়ও কিছুটা বেড়েছে। তবে ঋণের অর্থছাড়ের চেয়ে পরিশোধের চাপ অনেক বেশি।

গত রবিবার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে অর্থছাড় হয়েছে ৪৩৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের, কিন্তু ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৮৫ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের। অর্থাৎ ঋণ প্রাপ্তির ৪২ দশমিক ২১ শতাংশই চলে যাচ্ছে পরিশোধে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাজারভিত্তিক ঋণের সুদহার বেড়েছে, যা সরকারের বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়িয়েছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, সরকার চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি মেয়াদে উন্নয়ন অংশীদারদের সুদ ও আসল পরিশোধে ১৮৫ কোটি ডলার ছাড় করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়কালে ১২৮ কোটি ডলার ছিল।

ইআরডির তথ্যানুসারে, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে শুধু সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১০৭ দশমিক ৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সুদ পরিশোধের জন্য ৭৬ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার ছাড় করা হয়েছে। এই সময়ে সরকার বিভিন্ন ঋণের আসলের ১০৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে।

ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (এসওএফআর) ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এসওএফআর রেট ছিল ১ শতাংশের কম। এ ছাড়া এ সময়ে বাংলাদেশের বাজারভিত্তিক সুদহারে ঋণগ্রহণও ক্রমেই বাড়ছে, যার ফলে দেশের সুদ পরিশোধ বাড়ছে।

এডিবি থেকে বাংলাদেশের ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাজারভিত্তিক সুদে নেওয়া। এ ছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকেও বাজারভিত্তিক সুদহারে ঋণ নিয়ে থাকে বাংলাদেশ। তাছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক থেকেও সীমিত পরিসরে বাজারভিত্তিক সুদহারে ঋণ নেয়।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক সুদের হার অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ ১১৯ কোটি বা ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধ করবে বলে প্রক্ষেপণ হয়েছে। গত অর্থবছরে (২০২২-২৩), বাংলাদেশের সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৯৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার, এর আগের অর্থবছরে যা ছিল ৪৬৯ মিলিয়ন ডলার।

ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন, সুদ পরিশোধের পাশাপাশি আসল পরিশোধের চাপও বাড়বে। বিভিন্ন বাজার সহায়তা ঋণ এবং কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা রেল লিঙ্কের মতো মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর এখন এসব ঋণের আসলের অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

অবশ্য ঋণ পরিশোধের এমন চাপের মধ্যে ঋণ প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন সহায়তা প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ৩০৬ দশমিক ১ শতাংশ। এ সময়ে ঋণের অর্থছাড় বেড়েছে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সঙ্গে সরকারের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।

উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে নতুন ৭১৭ কোটি ২২ লাখ বা ৭ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের প্রতিশ্রুত ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার থেকে অনেকটাই বেশি। ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন, ঋণ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা প্রশংসনীয়।

তারা বলেন, অর্থবছরের শুরু থেকে অনেকগুলো প্রকল্পের জন্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে ঋণচুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার কারণে এ সাফল্য এসেছে। বিপরীতে আগের অর্থবছরে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নেওয়ায় বেশ কয়েকটি প্রকল্পের চুক্তি বিলম্বিত হয়েছিল।

ইআরডির তথ্য অনুসারে, বেশিরভাগ ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে প্রধান তিন উন্নয়ন সহযোগী এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক ও জাপান থেকে। তিন উন্নয়ন সহযোগী সম্মিলিতভাবে ৬০৫ কোটি বা ৬ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সর্বোচ্চ ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে এডিবি থেকে, মোট ২ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি এ সময়ে জাপান থেকে ২ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়কালে উন্নয়ন সহায়তা সংস্থাগুলো মোট ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার অর্থছাড় করেছে, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার ছিল।