দেশের অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। একসময় এ বিদ্যায়নটি অন্যদের কাছে আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে তা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিটি স্তরেই বাসা বেঁধেছে অনিয়ম-দুর্নীতি। অনিয়ম আর অদক্ষতায় ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি যেন ডুবতে বসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অধ্যক্ষ। মূলত তার ওপরই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটি কেমন চলবে। কতখানি নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে থাকবে। কিন্তু গত ১৪ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি চলছে স্থায়ী অধ্যক্ষ ছাড়াই। কখনো স্বল্প সময়ের জন্য শিক্ষা ক্যাডার থেকে অধ্যক্ষ আসছেন। আবার কখনোবা স্কুল থেকেই একজনকে ভারপ্রাপ্তের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য সেখানেও মানা হয় না জ্যেষ্ঠতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে জুনিয়রদের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর যিনিই দায়িত্ব পাচ্ছেন তিনিই একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
সম্প্রতি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর শাখার গণিতের শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে প্রাইভেট কোচিংয়ের সময় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে এখন উত্তাল ভিকারুননিসা। ওই শিক্ষককে বহিষ্কার ও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠে। প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও মুরাদ হোসেনকে প্রথমে বাঁচানোর চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটিরই একটি সিন্ডিকেট।
শেষমেশ অভিভাবকদের আন্দোলনের মুখে চাপে পড়ে গতকাল সোমবার রাতে গভর্নিং বডির বৈঠকে শিক্ষক মুরাদ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যৌন নির্যাতনের ওই অভিযোগ তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। যার আহ্বায়ক আইসিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মমতাজ বেগম। আর সদস্য হলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানম ও ইংরেজি প্রভাতি শাখার শাখাপ্রধান শামসুন আরা সুলতানা।
এ কমিটির গত ২২ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে তিন ছাত্রীর আনা অভিযোগের ঘটনাগুলো এক বছর আগের। এরপর তিনি পবিত্র হজ করার পর এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বিধায় তাকে বরাখাস্ত না করে শেষবারের মতো সতর্ক করে অন্য কোনো শাখায় বদলি করা যেতে পারে। এ ছাড়া অভিযোগকারীরা উপযুক্ত কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে না পারায় তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ ছাড়া শাখা প্রধানদের মনিটরিং আরও বাড়াতে হবে।’
তবে এ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনরত অভিভাবকরা। এ প্রসঙ্গে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অভিভাবক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমে তদন্ত কমিটি ঘটনার সত্যতা পায়নি বলে প্রতিবেদন দিয়েছিল। কিন্তু এরপর অভিভাবকরা যখন আন্দোলনে নামেন তখন অন্য শাখায় বদলির সুপারিশ করা হয়। আসলে অভিযুক্ত শিক্ষক মুরাদ হোসেনের ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও শিক্ষক প্রতিনিধি ড. ফারহানা খানম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এখন এক দফা এক দাবি। অধ্যক্ষ, শিক্ষক প্রতিনিধি ও অভিযুক্ত শিক্ষক তিনজনেরই পদত্যাগ চাই। তাদের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাই। বাচ্চাকে স্কুলে পাঠিয়ে আমরা আর দুশ্চিন্তায় থাকতে চাই না।’
জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির (পরিচালনা পর্ষদ) সভাপতি করা হচ্ছে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারকে। কিন্তু তিনি নানা সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় ভিকারুননিসায় সরাসরি খুব একটা সময় দিতে পারেন না। ফলে গভর্নিং বডির অন্য সদস্যরাই মূলত প্রতিষ্ঠানটি চালান। আর এতে নেতৃত্ব দেন শিক্ষক প্রতিনিধি ড. ফারহানা খানম। তার কথার বাইরে কোনো কিছুই হয় না। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটিতে যৌন নির্যাতনের মতো এত গুরুতর অভিযোগ উঠলেও গভর্নিং বডির ভূমিকা অনেকটাই রহস্যজনক রয়ে গেছে।
শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১৪ বছর ধরে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে কোনো স্থায়ী অধ্যক্ষ নেই। প্রায় পাঁচ বছর আগে স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। এরপর দুই দফায় বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা অধ্যাপক ফওজিয়া ও কামরুন নাহারকে অধ্যক্ষ হিসেবে প্রেষণে পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাদের প্রেষণ শেষে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক কেকা রায় চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন। তার চেয়ে দুজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক থাকলেও তাদের ডিঙ্গিয়ে কৌশলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়েছেন কেকা রায় চৌধুরী। কিন্তু তিনি দক্ষভাবে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন সামলাতে পারছেন না। আগের অন্যদের মতোই একটি সিন্ডিকেটে কবজা হয়ে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভিকারুননিসার ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করছি। তাদের যেহেতু গভর্নিং বডি আছে, আগে দেখি তারা কী ব্যবস্থা নেয়। এতে যদি অভিভাবকরা সন্তুষ্ট না হন তাহলে আমাদের জানালে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। এ প্রতিষ্ঠানটিতে এত দলাদলি যে, সেখানে শিক্ষা ক্যাডারের কোনো অধ্যক্ষও আর যেতে চাচ্ছেন না।’
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯ ও ’২০ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণিতে ৭৫০ জন শিক্ষার্থী অবৈধভাবে ভর্তি করা হয়। শিক্ষার্থীপ্রতি ভর্তির জন্য নেওয়া হয় ৪-৫ লাখ টাকা। এরপর থেকে ভর্তি কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হওয়ায় একবারে বেশিসংখ্যককে অবৈধভাবে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও সংখ্যায় অল্প হলেও অবৈধ ভর্তি চলছে। এখন সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শাখা বদলিতে। এক শাখা থেকে পছন্দের অন্য শাখায় বদলিতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে। এ ছাড়া স্কুলের কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা ও নানা ধরনের টেন্ডারে বড় ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে। এর বাইরে অস্থায়ী শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগেও লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলে কোনো সাড়া মেলেনি।
ভিকারুননিসার মূল ক্যাম্পাস সিদ্ধেশ্বরী এলাকার বেইলি রোডে। এ ছাড়া রাজধানীর ধানমণ্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরায়সহ চারটি শাখা রয়েছে। সব শাখা মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। আর শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় ৮৫০ জন।