১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোতে সুইডেনের যোগদান প্রশ্নে আপত্তি তুলে নিয়েছে হাঙ্গেরি। দেশটির আইনসভা গত সোমবার সুইডেনের ন্যাটোভুক্তিতে সায় দিয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনা অভিযানের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ২০২২ সালের মে মাসে বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী সুইডেন এবং রাশিয়ার প্রতিবেশি ফিনল্যান্ড ট্রান্স-আটলান্টিক সামরিক জোটটিতে যোগদানের আবেদন করে।
ইউরোপের মানচিত্রের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী ছোট্ট তিন দেশ এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া ২০০৪ সালে ন্যাটো জোটে যোগদান করে। এস্তোনিয়া ও লাটভিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সীমান্ত রয়েছে। গত বছর ফিনল্যান্ডের যোগদান সম্পন্ন হওয়ার পর বাল্টিক অঞ্চল থেকে স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ওপর পর্যন্ত ন্যাটো-রাশিয়া সীমানা বিস্তৃত হয়। এরপর সুইডেনের ন্যাটোভুক্তির প্রশ্নে তুরস্ক ও হাঙ্গেরির আপত্তি উঠে যাওয়ায় ইউরোপের ন্যাটো মানচিত্রে তাৎপর্যপূর্ণ আরও বদল আসতে চলেছে। অর্থাৎ বাল্টিক সাগরের সবচেয়ে বড় উপকূলের দেশ সুইডেনের ন্যাটোভুক্তির মধ্য দিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে বাল্টিক সাগর এবং আরও উত্তরে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড উপকূল পর্যন্ত ন্যাটোর ভারী সমরাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত নিরাপত্তা বলয় তৈরি হচ্ছে। এই মুহূর্তে সুইডেনের ন্যাটো জোটভুক্তিতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতাই নেই। হয়তো বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে জোটের দপ্তরে ৩২তম ন্যাটো দেশ হিসেবে আর কয়েকদিনের মধ্যে সুইডেনের পতাকা উড়বে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঐতিহাসিকভাবে ধরে রাখা নিরপেক্ষ অবস্থানের খোলস ঝেড়ে ফেলে সুইডেনের ন্যাটো জোটে ঢোকার মাধ্যমে বাল্টিক সাগর কার্যত ‘ন্যাটোর সাগরে’ রূপ নিতে যাচ্ছে যার চারপাশেই এখন জোটভুক্ত দেশগুলো। ‘সুইডিশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’ এর গবেষণা ফেলো এমা রোসেনগ্রেন বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধের সম্মুখরেখা বিবেচনায় নিলে সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রে সুইডেন সম্ভবত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্য বড় কোনো যুদ্ধাস্ত্র মজুদকেন্দ্র (হাব) হয়ে উঠতে পারে। সুইডেন এরই মধ্যে পশ্চিমা বিশে^র অবিভাবক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের মিত্রতা এগিয়ে নিতে অগ্রসর হয়েছে। নিজ দেশের ১৭টি ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার দিয়েছে তারা। এ ছাড়া লাটভিয়ায় সেনা পাঠাতেও পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে দেশটি।
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন গত জানুয়ারি মাসে নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করে বলেন, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর সুইডেনের নিরাপত্তা উদ্বেগ শঙ্কার জায়গায় পৌঁছেছে। এ জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য দেশের নাগরিকদের স্বল্পসংখ্যক অংশকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে হবে। সোভিয়েত-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর নাগরিকদের জন্য এই শর্ত বাতিল করা হয়েছিল। সুইডেনকে এখন প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বৃদ্ধি করতে হবে। সুইডেনের রাজনীতিতে ন্যাটো জোটে যোগদানের ব্যাপারটি গত দশকেও বেশ বিতর্কিত ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর গোটা দৃশপাট পাল্টে যায়। বিশেষ করে দেশটির সোশ্যাল ডেমোক্রেট রাজনীতিকরা এ নিয়ে বরাবরই অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর সাবেক সোশ্যাল ডেমোক্রেট নেত্রী সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসন জোটভুক্তির উদ্যোগ নেন। সুইডিশ প্রতিরক্ষা গবেষণার পরিচালক রবার্ট দালসজো অবশ্য মনে করেন, সুইডেন দীর্ঘদিন থেকেই তার নিরপেক্ষতার তকমা পরিত্যাগ করার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের আবেদন করার মধ্য দিয়েই দেশটি তার নিরপেক্ষার আবরণ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। সুইডেনের ন্যাটোভুক্ত রাশিয়ার জন্য কতটা চাপের হতে পারে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের একটি নিবন্ধে বলা হয়, বাল্টিক সাগরের গোটল্যান্ড দ্বীপটি ন্যাটোর কৌশলগত লড়াইয়ের প্রশ্নে গুরুত্ববাহী। সম্ভাব্য রুশ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি হতে ন্যাটোর বড় ঘাঁটি।