অর্থসংকটে উন্নয়নের গতি কমেছে

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই বিশে^র বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। অন্য দেশগুলো সংকট অনেকটা কাটাতে পারলেও বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই রয়েছে। অর্থসংকটের কারণে ইতিমধ্যেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থসংকট এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, অন্তত গত ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে চলতি অর্থবছরের সাত মাসে।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৭ দশমিক ১১ শতাংশ। এটি গত ১৪ বছরে সবচেয়ে কম। আইএমইডির মাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের তথ্য দেওয়া আছে। ওই সময় থেকে চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়ন এত কম হতে দেখা যায়নি। ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৩৩ শতাংশ।  

চলতি বছর ১ হাজার ৩৯২টি প্রকল্পের বিপরীতে ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচির কাজ চলছে। অর্থবছরের বাকি আছে আর মাত্র ৫ মাস। এই সময়ে অর্থবছরের বরাদ্দের বাকি ৭২ দশমিক ৮৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করতে হবে। বরাদ্দের হিসাবে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছাড়া বেশিরভাগই তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না।

আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়নের যে হার তা ২০২২-২৩ অর্থবছরের চেয়েও এক শতাংশ কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরের এ সময়কালে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

গত এক যুগে সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল মোট বরাদ্দের ৩৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর আগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৩৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এছাড়া ২০১৫-১৬, ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে ২৮ শতাংশের বেশি এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল। অন্য অর্থবছরগুলোর একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৩০ শতাংশের ওপরে।

অবশ্য অর্থবছরের তুলনায় কম হলেও একক মাসের হিসেবে জানুয়ারিতে এডিপি বাস্তবায়ন হার গত অর্থবছরের সমান হয়েছে। এক যুগের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জানুয়ারিতে এডিপি বাস্তবায়ন সবচেয়ে কম ছিল। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারি মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। যদিও অন্য অর্থবছরগুলোতে জানুয়ারি মাসে বাস্তবায়ন হার ছিল ৫ থেকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৭ মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে খরচ হয়েছে মাত্র ৭৪ হাজার ৪৬৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়ন অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে আইএমইডি। বিভাগটি বাস্তবায়ন করেছে ৯৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করেছে ৭৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন ৭১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ৫৯ দশমিক ২৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করছে।

অন্যদিকে অর্থবছরের সাত মাস পার হলেও ১০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি দুটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়টি সাত মাসে তাদের বরাদ্দের মাত্র ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। মোট বরাদ্দের মাত্র ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। এছাড়া এডিপির ২০ শতাংশের কম বাস্তবায়ন করেছে ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিভাগটি আলোচিত সময়ে খরচ করেছে ১৫ হাজার ২১৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৩৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম খরচ করেছে বাংলাদেশ সংসদ সচিবালয়। তারা খরচ করেছে মাত্র ২৪ লাখ টাকা। যদিও তাদের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা।