পাবনার চাটমোহরে একের পর এক সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি বা মিউটেশনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের বিরুদ্ধে। হান্ডিয়াল ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের মধ্যস্থতায় এসব জমি ব্যক্তির নামে খারিজ করেছেন এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার-ভূমি) তানজিনা খাতুন। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সরকারি সম্পত্তি বেহাতের এ চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এলাকাবাসী বলছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণ ছাড়াই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে খাসজমি ব্যক্তির নামে নামজারি করতে সহযোগিতা করেন ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম ও চাটমোহরের এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন। এমনকি উৎকোচ নিয়ে খারিজের পর আবার চাপে পড়ে সে সিদ্ধান্ত বাতিলের একাধিক নজিরও রয়েছে। এসব নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন তারা। বিপদ আঁচ করতে পেরে সম্প্রতি ঘুষ নিয়ে নামজারি করা বেশ কিছু জমি নিজেই খারিজ বাতিলের আবেদন করে তড়িঘড়ি করে বদলি নিয়ে পাশের উপজেলার এক ইউনিয়নে চলে গেছেন সিরাজুল।
নামজারি বা মিউটেশন হচ্ছে জমিসংক্রান্ত বিষয়ে মালিকানা পরিবর্তন করা। জমি হস্তান্তর হলে খতিয়ানে পুরনো মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম প্রতিস্থাপন করাই হচ্ছে নামজারি। নামজারির মাধ্যমে জমির আগের জোতজমা থেকে খারিজ (কর্তন) হয়ে আবেদনকারীর নামে নতুন হোল্ডিং বা জোতের সৃষ্টি হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারির (মিউটেশন) জন্য আবেদন করতে হয়।
ইতিহাস ঘেঁটে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাটমোহর উপজেলার চলনবিল পাড়ের প্রাচীন এক জনপদ হান্ডিয়াল। মুঘল আমলে এখানে ছিলেন সম্রাট আকবর নিযুক্ত সুবাদার, থাকতেন পাঁচ হাজার সেনাও। ব্রিটিশ আমলে ১৮৪৫ সালে প্রশাসনিক থানার মর্যাদা পায় হান্ডিয়াল। দেশ ভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হিন্দু জমিদার ও ভূমি মালিকরা ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার পর তাদের সম্পদের দাবিদার না থাকায় তা সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে আবার অনেক ক্ষেত্রে বন্দোবস্ত ছাড়াই এসব জমিতে চাষবাস করে আসছিলেন স্থানীয় দরিদ্র মানুষরা। আর খাস খতিয়ানভুক্ত জলাশয়গুলোর বেশ কিছু স্থানীয় মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যরা সুফলভোগী হিসেবে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করেন।
এলাকাবাসী জানায়, গত কয়েক বছর ধরে হান্ডিয়ালের এসব খাসজমি দখলে নিতে মরিয়া একাধিক চক্র। অভিযোগের সূত্র ধরে বাঘলবাড়ী মৌজায় ৯৬৬নং খতিয়ানে ১৬টি দাগে কছিমউদ্দিন, ছকির উদ্দিন, আব্দুর রশিদ ও রমজান আলীসহ ১১ ব্যক্তির নামে সম্প্রতি খারিজ হওয়া ১৫ বিঘা জমির নথি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দেশ রূপান্তর। রেকর্ড রুমে সংরক্ষিত মূল নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ওই দাগের সব জমিই ১নং খাস খতিয়ানের, যার মালিকানায় নাম বাংলাদেশ সরকার। হঠাৎ কীভাবে ১১ জন এসব জমির মালিক বনে গেলেন, তা জানতে হান্ডিয়ালের বাঘলবাড়ী গ্রামে গিয়ে জানা যায়, শুধু এই ১৫ বিঘাই নয়। গত এক বছরে হান্ডিয়াল ইউনিয়ন ভূমি সহকারী সিরাজুল ইসলাম খাস খতিয়ানভুক্ত আরও কয়েকটি জমি ও জলাশয় এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুনের মাধ্যমে ব্যক্তির নামে খারিজ করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি জমি নিয়ে এলাকাবাসী প্রতিবাদমুখর হলে গোপনে নামজারি বাতিলেরও আবেদন করেন তিনি। এ ছাড়া ব্যক্তিগত পৈতৃক জমিও খারিজের জন্য অনেকের কাছ থেকে সিরাজুল ইসলাম হাজার হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। সিরাজুলের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে অর্থ পাঠানোর একাধিক প্রমাণও দেখান ভুক্তভোগীরা।
বাঘলবাড়ী গ্রামের সোনা উল্লাহ বলেন, ‘সিরাজুল নায়েব হান্ডিয়ালে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘুষ দুর্নীতির আস্তানায় পরিণত হয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস। তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে রমজান, ছকিরউদ্দিন গংদের ১৫ বিঘা সরকারি জমি ১৫ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ব্যক্তি নামে খারিজ করে দিয়েছেন। এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব জমি খারিজে অনুমোদন দিয়েছেন।’
একই গ্রামের বৃদ্ধ হাসান আলী জানান, তিন বিঘা পৈতৃক জমি খারিজের জন্য তিনি এক বছরেরও বেশি সময় সিরাজুল ইসলামের কাছে ঘুরেছেন। কিন্তু সিরাজুলের দাবি অনুযায়ী ২০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার পরও কাজ হয়নি। এখন আরও টাকা দাবি করছেন।
হান্ডিয়ালের নিমগাছী মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মনিরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি খাস জলাশয় নিয়ম অনুযায়ী ইজারা নিয়ে সমিতির সদস্যরা সুফলভোগী হিসেবে মাছ চাষ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু কয়েক মাস আগে স্থানীয় নজরুল মেম্বর নামে এক ব্যক্তি জলাশয় তার নামে খারিজ হয়েছে জানিয়ে মাছ ছাড়তে বাধা দেয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, নায়েব ও এসিল্যান্ডকে ঘুষ দিয়ে নজরুল জলাশয়ের কয়েকটি দাগ নিজ নামে খারিজ করে নিয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি। তারা এখনো জলাশয়টি জোর করে জবরদখলের চেষ্টা করছে।’
আরেক ভুক্তভোগী একই গ্রামের পল্লী চিকিৎসক ইদ্রিস আলী। তিনি বলেন, ‘বাড়িসংলগ্ন খাস খতিয়ানভুক্ত ১০৮ ও ১২১ দাগের ২৩ শতাংশ জমি সরকারি লিজ মানি দিয়ে ইজারা নিয়েছিলাম। ইজারা বাতিলের কথা বলে এসিল্যান্ড ও নায়েব কয়েক দফায় আমার কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছে। তারপরও তারা ইজারা দেওয়া জমি ব্যক্তি নামে খারিজ করে দিয়েছে। এখন জাল দলিল ও খারিজের বলে ভূমিদস্যুরা সরকারি জমি দখল নিতে চাইছে।’
কীভাবে সরকারি জমি নিজ নামে নামজারি করেছেন জানতে চাইলে বাঘলবাড়ী গ্রামের রমজান আলী বলেন, ‘সরকারি নয়, পৈতৃক জমি আইনগত প্রক্রিয়ায় খারিজ করেছি। জমির দলিল আছে। এখন দলিল খুঁজে পাচ্ছি না।’ তবে একপর্যায়ে নায়েব সিরাজুল ও এসিল্যান্ড জমি খারিজে সহযোগিতা করেছেন বলে স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে গণমাধ্যমকর্মীরা এ জালিয়াতি নিয়ে অনুসন্ধান করছেন জানতে পেরে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কয়েক দফায় টাকা সাধেন ভূমি কর্মকর্তা সিরাজুল। তবে টাকার বিনিময়ে খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় খারিজের অভিযোগ অস্বীকার করেন এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন।
জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে ভূমি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দোতরফা সূত্রে রায় পাওয়ায় রমজান গংদের জমি খারিজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু এটি নিয়ে আপত্তি এসেছে তাই বাতিলের আবেদনও করা হয়েছে। এখন কিছু লোক নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে না পেরে অসত্য অভিযোগ করছে।’ আর এসিল্যান্ড তানজিনা খাতুন বলেন, ‘অভিযোগ হলেই সবকিছু সত্য হয়ে যায় না। তারা প্রমাণ দেখাক। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।’
এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাবনার জেলা প্রশাসক মু. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি জমি ব্যক্তি নামে নামজারির কোনো সুযোগ নেই। তদন্তে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জালিয়াতিতে ভূমি কর্মকর্তারা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’