দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি কূটনীতিতেও ভরসা করেছিল বিএনপি। দলটির ধারণা ছিল, ২০১৪ সালের মতো এবার একতরফা নির্বাচন করতে পারবেন না ক্ষমতাসীনরা। দেশি-বিদেশি চাপে সরকার বিরত থাকতে বাধ্য হবে এবং সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের একটা পথ বের হবে।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল ঠিকই। টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ। এ অবস্থায় বিএনপি নেতারা বলছেন, দলের কূটনৈতিক উইং বা ফরেন রিলেশন কমিটির তৎপরতা দুর্বল ছিল। ভূরাজনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
সর্বশেষ দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামেও বিষয়টির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয়, নির্বাচন ঘিরে সরকার পতনের আন্দোলনের পরিকল্পনায় আরও বৈচিত্র্য দরকার ছিল। কূটনৈতিক তৎপরতায়ও ঘাটতি ছিল। তবে সফলতার কথাও বলেছেন কেউ কেউ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সরকারকে সমর্থন দেয়নি বলে তারা স্বস্তি প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা নির্বাচন ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির কূূটনৈতিক উইংয়ের দায়িত্বশীলদের এমন মনোভাব ছিল যে, ইউরোপ-আমেরিকার প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে তাদের বেশ ভালো বোঝাপড়া হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকা নিজের থেকেই সরকারের নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শক্তভাবে বলেছে। সেটা বিএনপির পক্ষে গেছে। কিন্তু তারা যে বিএনপির পক্ষে কথা বলেনি সেটা বিএনপির এ উইংয়ের কান্ডারিরা বুঝে উঠতে পারেননি।
কূটনৈতিক উইংয়ের দায়িত্বে থাকা কেউ কেউ দলের শীর্ষ ফোরামে এও বলেছেন, নির্বাচন ইস্যুতে ভারত নিরপেক্ষ থাকবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। ভারতের সমর্থন এ সরকারকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভুয়া উপদেষ্টাকে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টি বিএনপির বিপক্ষে গেছে।
বিএনপি নেতারা আরও বলেন, একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অনেকে এখন বিএনপির পক্ষে নেই। আবার যারা সরকারের বিপক্ষে রয়েছে, তাদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ২০০৯ সালের পর থেকে বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিদেশিদের সঙ্গে বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত, চীনের মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারেননি। ফলে আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো আরেকটি ‘একতরফা’ নির্বাচন করে সরকার গঠন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর নানা অনিয়মের বিষয় আলোচনায় এলেও আন্তর্জাতিক মহলে তা ভালোভাবে তুলে ধরতে পারেনি কূটনৈতিক উইং।
ওই নেতারা বলেন, দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি প্রায় তিন মাস জেলে থেকে গত সপ্তাহে মুক্তি পেয়েছেন। তার অবর্তমানে সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি না থাকলে পরবর্তী নেতারা দায়িত্ব পালন করবেন। এ উইংয়ের দুজনকে নিয়েই দলের ভেতরে এখন সমালোচনা বেশি হচ্ছে। শামা ওবায়েদ জেলের বাইরে থেকেও কেন সক্রিয় হননি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার আমীর খসরু যে সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করেননি, সেটি সিনিয়র নেতারা বুঝতে পারেন তার অনুপস্থিতিতে।
ওই নেতারা কাজ করতে গিয়ে দেখেন, কূটনৈতিক পর্যায়ে নিরন্তর যোগাযোগ ছিল না বর্তমান উইংয়ের নেতাদের। শুধু চিঠি চালাচালি আর ইস্যুভিত্তিক দেখা-সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কার্যক্রম। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে বিএনপির সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর ভালো বোঝাপড়া গড়ে ওঠেনি। যদিও পশ্চিমাদের সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা প্রচার করে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বিদেশনির্ভরতা তৈরি করা হয়েছিল।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনের পর বিএনপির ভেতরে-বাইরে কূটনৈতিক উইং নিয়ে কথা হচ্ছে। উইংয়ের দুর্বলতাও সামনে আনা হচ্ছে। এখানে কূটনৈতিক তৎপরতার অবদান কিংবা দুর্বলতার কিছু নেই। কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি তো আমরা নির্ধারণ করতে পারব না। আমাদের কাজ বিদেশিদের সামনে দেশের অবস্থা ও জনগণের আকাক্সক্ষার কথা তুলে ধরা। এরপর সিদ্ধান্ত তাদের। কোনো বিদেশি রাষ্ট্র যদি জনমত উপেক্ষা করে বিশেষ একটি গোষ্ঠী বা দলকে গুরুত্ব দিতে চায়, সেটি তাদের সমস্যা। এর সমাধান তো বিএনপির কূটনৈতিক উইং দিতে পারবে না। বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই বাংলাদেশের জন-আকাক্সক্ষার পক্ষে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।’
বিএনপি বরাবরই কূটনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি মনে করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত হচ্ছে, ভূরাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ দেশ ভারত আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত বন্ধু। রাশিয়া ও চীনও তাদের পক্ষে। বিপরীতে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চীনের সঙ্গে যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তার উন্নতি হয়নি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে গিয়ে পাকিস্তানকে অবহেলা করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর কাছেও বিএনপি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়েছে। ভারত, চীন ও রাশিয়া যেভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে গুরুত্ব দেয়, সেভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব বিএনপিকে গুরুত্ব দেয় না। বিএনপি সাম্প্রতিক সময়ে ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে সম্পর্ককে আরও তিক্ত করেছে। অথচ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।
তারা আরও মনে করছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কিছু দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করতে পারলে হয়তো পরিস্থিতি আরও উন্নত হতো। যেমনটা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিকট অতীতে করেছেন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সেটা করতে পারেননি। তিনি যদি নিজ উদ্যোগে প্রতিবেশী ভারতসহ পশ্চিমা গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখতে পারতেন, তাহলে পরিস্থিতি একতরফা নাও হতে পারত।
গত শনিবার ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আখতারের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ফরেন উইংয়ের একটি প্রতিনিধিদল। ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও শামা ওবায়েদ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীর কারাবন্দি থাকা ও বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়।
সূত্রগুলো বলছে, ৭ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে যে কূটনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি আবারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়। মার্কিনিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নির্র্বাচন পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে। তারা একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছে। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর মার্কিনিদের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দেওয়া হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে ২১ সদস্যের ফরেন রিলেশন কমিটি (এফআরসি) গঠন করেছিল বিএনপি। এফআরসির অন্য সদস্যরা হলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, এনামুল হক চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নওশাদ জমির, আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল, মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহ-সম্পাদক ফাহিমা নাসরিন মুন্নী ও রুমিন ফারহানা, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাসভিরুল ইসলাম, জিবা খান, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, তাবিথ আউয়াল, খন্দকার আহাদ আহমেদ, ইয়াসের খান চৌধুরী ও ইশরাক হোসেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এফআরসি কমিটি পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়া শিগগির শুরু করবে হাইকমান্ড। এতে কেউ যুক্ত হবেন, কেউ বাদ পড়বেন।’
কূটনৈতিক উইংয়ের সদস্য ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি দলের স্বার্থ নয়, দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীনরা দেশের নয়, নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। আমরা প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকেও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস পেয়েছি। কিন্তু নির্বাচনের সময় তারা সেটি রক্ষা করেনি।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘রাজনীতি এখন আর দেশের দলগুলোর মধ্যে নেই। বিদেশিদের হাতে চলে গেছে। সেখানে বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের সফলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। তবে বিএনপি কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’