নতুন প্যারেড গ্রাউন্ড পাচ্ছে পুলিশ

রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন পুলিশ সদস্যরা। প্রতিরোধ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারা যান। পঙ্গুত্ব বরণ করেন অনেকেই। পুলিশ লাইনস মাঠেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুলিশের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহসহ অনেক অনুষ্ঠান হয় এ মাঠে। পুলিশ লাইনসের আশপাশে বিভিন্ন স্থাপনাও তৈরি হচ্ছে। ফলে দিনে দিনে মাঠের পরিধি কমছে।

মাঠটির ছোট হয়ে যাওয়া চোখে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন শেষে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘কল্যাণ প্যারেড’ করেন তিনি। অসুস্থ থাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান উপস্থিত ছিলেন না। কল্যাণ প্যারেডে নতুন আরেকটি নতুন পুলিশ লাইনসের জন্য ঢাকার আশপাশে জায়গা খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে প্যারেড গ্রাউন্ড হবে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

ভালো কাজের জন্য প্রতি বছরের মতো এবারও পদক দেওয়া হয়েছে। ৪০০ জন পুলিশ সদস্য মনোনীত হয়েছেন পদকের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন পদকপ্রাপ্তরা। তবে গতকাল সময় স্বল্পতার কারণে ২০০ জনকে পদক পরিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বাকিদের পদক কে পরাবেন সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে রাজারবাগের বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কল্যাণ প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক চলে। প্যারেডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান, পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) কামরুল আহসান, র‌্যাব মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন, এসবির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি এসএম রুহুল আমিন, পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর মল্লিক ফকরুল ইসলাম, শিল্পাঞ্চল পুলিশের প্রধান মাহাবুবুর রহমান, হাইওয়ে পুলিশের প্রধান শাহাবুদ্দিন খান, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ সব অতিরিক্ত আইজিপি, সব মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ও অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। পরে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন।

আইজিপি বলেন, ‘পুলিশের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিক। আমাদের যেসব সমস্যা আছে তা প্রধানমন্ত্রী সমাধান করে দেবেন বলে আশা করছি।’ সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী তার বক্ততায় বলেছেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠটি ছোট হয়ে গেছে। নতুন আরেকটি পুলিশ লাইনস দরকার। ঢাকার আশপাশে নতুন জায়গা দেখতে হবে। সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। স্মার্ট পুলিশ হতে হবে। পুলিশের উন্নয়নের জন্য সরকার সব ব্যবস্থা করবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনানুযায়ী পুলিশ সপ্তাহের পর নতুন পুলিশ লাইনসের জায়গা খোঁজা হবে। সেখানেই প্যারেড গ্রাউন্ড হবে। ডেমরা এলাকায় বিশাল একটি জায়গা পাওয়া গেছে। এখন সেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এ জায়গাটিই পুলিশ লাইনসের জন্য উপযুক্ত। সেখানে যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো।

এসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভালো কাজের জন্য পিপিএম পদক পেয়েছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক নিতে না পেরে কষ্ট লাগছে। আমাদের একটা স্বপ্ন থাকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করার। এটি স্মৃতি হিসেবে আমাদের কাছে থাকে। আজ (গতকাল) পুলিশ সপ্তাহে মাত্র ২০০ জনকে পদক পরিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

‘স্মার্ট পুলিশ, স্মার্ট দেশ, শান্তি প্রগতির বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে বার্ষিক পুলিশ প্যারেডের মধ্য দিয়ে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৪’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবার সর্বাধিক ৪০০ পুলিশ সদস্যকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম) দেওয়া হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে ২০০ জনকে পদক পরিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উৎসর্গকারী নয়জনের পরিবারের সদস্যদের হাতে মরণোত্তর বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) তুলে দেন তিনি।

বিপিএম সাহসিকতা ও সেবা এবং পিপিএম সাহসিকতা ও সেবা এ চার ক্যাটাগরিতে প্রতি বছর এ পুরস্কার দেওয়া হয়। যারা এ পদকে ভূষিত হন তাদের নামের শেষে বিপিএম-পিপিএম উপাধি যুক্ত হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রতি বছরই প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠক হয়। ওইসব বৈঠকে দাবি উত্থাপন করা হলে শুধু আশ্বাস পাওয়া যায়। বেশিরভাগ আশ্বাসই পূরণ হয় না। এবারও বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করা হবে।

পুলিশের দাবিনামা : সরকারি অন্যান্য দপ্তরে আট ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। কিন্তু পুলিশের ডিউটির নির্ধারিত সময় নেই। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টাও কাজ করতে হয়। পুলিশ সদস্যদের আট ঘণ্টার অতিরিক্ত সময়ের জন্য ওভারটাইম দাবি করা হবে। সরকারের উপসচিবসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর মেজর বা সমমানসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা বিনা সুদে গাড়ির ঋণ পান। কিন্তু পুলিশ সুপারসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিনা সুদে ঋণের দাবি উত্থাপন করা হবে। উপকূলীয় থানা ও দ্বীপ এলাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের জন্য দ্বীপাঞ্চল ভাতার দাবি করা হবে। পার্বত্য এলাকায় পুলিশ সদস্যরা দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেন, তারা মূল বেতনের ৩০ শতাংশ অনধিক ৩ হাজার টাকা হারে পাহাড়ি ভাতা পান। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা সিলিং বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সিলিং তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হবে। ট্রাফিক পুলিশে কর্মরত সদস্যদের সরাসরি সড়কে দায়িত্ব পালন করতে হয়। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও সড়ক দুর্ঘটনার মতো ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয় তাদের। তাদের জন্য ট্রাফিক ভাতা বাড়ানোর দাবি তোলা হবে। রেল পুলিশের নিজস্ব ভবনের জন্য জায়গা চাওয়া হবে। সাইবার সিকিউরিটি ও সামাজিকমাধ্যমকে ঘিরে অপরাধ ঠেকানোসহ শাস্তি নিশ্চিতে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি স্বতন্ত্র ইউনিট গঠনের দাবি করা হবে। বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ব্যাটালিয়নের মূল দপ্তরকে বলা হয় সদর দপ্তর। কিন্তু পুলিশের সদর দপ্তরকে বলা হয় পুলিশ অধিদপ্তর। মন্ত্রণালয় যাতে কাগজে কলমে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স লেখে; সে দাবি আবারও উত্থাপন করা হবে। পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করা হলে আইজিপি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে বসেই সিনিয়র সচিবের ভূমিকা পালন করতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানও অর্থ মন্ত্রণালয়ে বসে সিনিয়র সচিবের ভূমিকা পালন করেন। আইজিপির পদটি সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবও একই পদমর্যাদার। পুলিশের ছুটি, বদলির কাজগুলো এখন জননিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমে হয়। পুলিশ চায়, এসব কাজ আইজিপির অধীনে থাকুক।