টি-টোয়েন্টির বিশ্বায়ন, ছোট দলের বড় বড় রেকর্ড

বল খেলেছেন মাত্র ৩৩টি। ছক্কা ৮, চার ১১। নামের পাশে স্কোর ১০১। অথচ মঙ্গলবারের আগে ইয়ান নিকোল লফটি-ইটনের ব্যাটে ছিল না কোনো ফিফটিই। তবে নেপালের কীর্তিপুরে এমন ব্যাটিং তাণ্ডব চালিয়ে তিনি বনে গেছেন নামিবিয়ান ক্রিকেটের এক কীর্তিমান। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুততম সেঞ্চুরির মালিক যে এখন শুধু তিনিই। পেছনে ফেলেছেন সেই ম্যাচেরই প্রতিপক্ষ নেপালের কুশল মাল্লার রেকর্ডকে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে চীনের হাংজুতে এশিয়ান গেমসে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে ৩৪ বলে সেঞ্চুরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন এই নেপালিয়ান। রেকর্ড হাতছাড়া হলেও মুহূর্তটা যে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ তিনি পেছনে ফেলেছিলেন ‘কিলার মিলার’ হিসেবে খ্যাত দক্ষিণ আফ্রিকার বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান ডেভিড মিলারের রেকর্ডকে। ২০১৭ সালে পচেফস্ট্রুমে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩৫ বলে মিলার করেছিলেন সেঞ্চুরিটি। দুই মাস পর ইন্দোরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রোহিত শর্মাও সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন মাত্র ৩৫ বলেই।

৩৫ বলে সেঞ্চুরি হাঁকানো নেপালের কুশল মাল্লা।

ক্রিকেটে রেকর্ড গড়াই হয় ভাঙার জন্য। তবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে কিছু রেকর্ড আছে, যা দেখে রীতিমতো চোখ কপালে উঠে। কারণ দুই মহাতারকার কাছ থেকে রেকর্ড চলে গেছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের অচেনা দুই ক্রিকেটারের হাতে। প্রশ্ন ওঠা তাই স্বাভাবিক, কিভাবে সম্ভব হচ্ছে এটা?

ছোটো দলের ক্রিকেটাররা তারকা না হতে পারলেও রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিচ্ছেন সবার শীর্ষে। মহাতারকাদের সব রেকর্ড ভেঙেচুরে একাকার করে দিচ্ছেন। এটা সম্ভব হয়েছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিশ্বায়নের কারণে। ১০ দল নিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজিত হয় ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে। তার আগে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়েছিল ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি।

সেই সমালোচনার মাঝেই ২০১৮ সালে ‘বৈপ্লবিক’ এক পদক্ষেপ নেয় আইসিসি। সংস্থাটির সদস্য ১০৪টি দেশকেই টি-টোয়েন্টির স্বীকৃতি প্রদান করে তারা। আর তাতেই শুরু হয় ক্রিকেটের বিশ্বায়ন। শুরুতে এতটা বোঝা না গেলেও ধীরে ধীরে তা আসে নজরে। ওয়ানডে কিংবা স্বীকৃতি না পাওয়া দলগুলো ঝুঁকে টি-টোয়েন্টিতে। তাতে একটা সময় পর ছোটো দলগুলোই গড়তে থাকে বড় বড় সব রেকর্ড।

লেখার শুরুতেই বলা হয়েছিল, দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড নিয়ে। তবে ছোটো দলগুলোর কাছে শুধু একটাই রেকর্ড নয়। বরং ভুরি ভুরি। যেমন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়টা নেপালের। সেটা সবশেষ এশিয়ান গেমসে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে ২৭৩ রানের। এক ইনিংসে সর্বোচ্চ সংগ্রহটাও নেপারেই। ঐ একই ম্যাচে আগে ব্যাট করে কুশল মাল্লার ১৩৭ রানে ভর করে ৩১৪ রান করেছিল। জবাবে মাত্র ৪১ রানে গুটিয়ে যায় মঙ্গোলিয়ানরা। এই সংস্করণে তিন শ রানের ঘরে পা দেওয়া একমাত্র দলও হিমালয়ের দেশটি।

নেপাল এই রেকর্ড গড়ার দিনে পেছনে ফেলেছিল চেক প্রজাতন্ত্রকে। ২০১৯ সালে তুরস্ককে তারা হারিয়েছিল ২৫৭ রানে। দীর্ঘ ৪ বছর সেটাই ছিল বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড। সেদিন আগে ব্যাট করে ৪ উইকেট হারিয়ে ২৭৮ রানের সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছিল চেক। তুরস্ক তাড়া করতে নেমে মাত্র ২১ রানেই গুটিয়ে যায়। অবশ্য সর্বোচ্চ সংগ্রহের তালিকায় তারা তৃতীয়তে। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ উইকেট হারিয়ে ২৭৮ রান করায় আফগানিস্তান আছে তালিকার দ্বিতীয়তে। ৪ উইকেটে ২৬৮ রান করে মালয়েশিয়া আছে তালিকার ৪ নম্বরে। সেদিন তারা থাইল্যান্ডকে হারায় ১৯৪ রানে। ৫ নম্বরে আছে ২৬৭ রান করা ইংল্যান্ডের অবস্থান।

চেক রিপাবলিক ক্রিকেট দল।

এই সংগ্রহটা যদিও প্রথম ইনিংসে ব্যাট করে। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করে এত রান করা দলের শীর্ষ পাঁচের চারটিই দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও উইন্ডিজ। তবে তালিকার দুই নম্বরে আছে বুলগেরিয়ার নাম। সার্বিয়ার বিপক্ষে ২৪৩ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নেমে ২ বল হাতে রেখে ২৪৬ রান করে ৬ উইকেটের জয় তুলে নেয়।

এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কা হাঁকানোতেও শীর্ষ দুইয়ে নাম নেপাল (২৬) ও জাপানের (২৩) নাম। তারপরেই আছে আফগানিস্তান, উইন্ডিজ ও ভারতের। ভারতের সমান ২১ ছক্কা হাঁকিয়ে পরে আবার তাদের পরেই আছে অস্ট্রিয়ার নাম। সর্বোচ্চ চার হাঁকানোর তালিকায় আবার শীর্ষ ৫-এর ৪টিই বড় দল। তবে ২৯ চার হাঁকিয়ে তালিকার তৃতীয়তে নাম আছে চেক রিপাবলিকের।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় আবার মহাতারকাদের ছড়াছড়ি। শীর্ষে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা ও বাবর আজমদের নাম। শীর্ষ বিশেও নেই কোনো ছোটো দলের তারকাদের নাম। সেটা বজায় আছে উইকেটের বেলাতেও।

টি-টোয়েন্টির অভিষেক ম্যাচে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকাতেও আবার ছোটো দলের তারকাদের ছড়াছড়ি। কানাডার ম্যাথু স্পোরস নিজের অভিষেক ম্যাচে ১০৮ রান করেছিলেন। তালিকার শীর্ষ পাঁচের চারজনেরই আছে সেঞ্চুরি। সবাই দুর্বল দলের ক্রিকেটার। কেউ সার্বিয়ার, কেউবা নামিবিয়ার ক্রিকেটার। তবে বেশিরভাগরাই অভিবাসি। কেউ কেউ আবার ক্রিকেটের জন্য নাগরিকত্বও করেছেন বদল।

কানাডার হয়ে খেলা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ম্যাথু স্পোরস।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলা স্পোর্স কানাডার জাতীয় দলে খেলেন এখন। ডেভিড ভিসা দক্ষিণ আফ্রিকার হলেও খেলেন নামিবিয়ায়। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকেই সেঞ্চুরি হাঁকানো প্রথম ক্রিকেটার রবীন্দারপাল সিংও ভারতীয় বংশোদ্ভুত কানাডিয়ান ক্রিকেটার। তার হাত থেকে রেকর্ডটা ছিটকে গেলেও আছে ছোটো দলের তারকার হাতেই।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকে সেঞ্চুরি হাঁকানো প্রথম ক্রিকেটার রবীন্দারপাল সিং।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের যুগে টি-টোয়েন্টির চাহিদা বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে শুরু হচ্ছে নতুন নতুন সব লিগ। ইউরোপিয়ান ফুটবলের মডেল আসতে শুরু করেছে ক্রিকেটেও। তাতে আপত্তি দেখাচ্ছেন না ক্রিকেটাররাও। বিশেষ করে ছোটো দলের ক্রিকেটাররা নিজেদের তারকা গড়ার মঞ্চ হিসেবে দেখছেন এসব লিগকে। জাতীয় দলে নিজেদের জাত চিনিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকও বাড়ছে।

যা সম্ভব হয়েছে আইসিসির সেই বৈপ্লবিক পদক্ষেপের কারণে। ১০৪টি দেশকে টি-টোয়েন্টি মর্যাদা প্রদানের দিনে আইসিসির প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসন বলেন, ‘আমরা খেলাকে ছড়িয়ে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। টি-টোয়েন্টি হবে ক্রিকেট বিস্তারের চাকা।’

তার কথা বাস্তবে রূপ নিতে সময় লেগেছে মাত্র ৬ বছর। ক্রিকেট বিস্তারের চাকা হিসেবে ঠিকই কাজ করেছে সীমিত ওভারের সংস্করণটি। ক্রিকেট ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র। তাই তো রেকর্ডে ভাগ বসাচ্ছে ছোটো দলগুলোও।