বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অ্যাড-হক কমিটির সভাপতি হিসেবে এক নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। ভারতের ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র সাথে এক খোলামেলা আড্ডায় তামিম অকপটে জানিয়েছেন—কীভাবে একটি হার্ট অ্যাটাক তাঁকে ক্রিকেট প্রশাসনে আসতে বাধ্য করেছে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে তাঁর পরিকল্পনা কী এবং বিশ্ব ক্রিকেটের বদলে যাওয়া গতিপ্রকৃতিকেই বা তিনি কীভাবে দেখছেন।
সাক্ষাৎকারটি দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো
প্রশ্ন: নতুন এই ভূমিকার সাথে কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন? নতুন বলের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে এটি কতটা আলাদা?
তামিম ইকবাল: অনেক, অনেক আলাদা। তবে এটাই আমি চেয়েছিলাম। আমি সমস্যাগুলো সমাধান করতে চেয়েছিলাম। গত ১৭-১৮ বছর ধরে যখন আমি আমার সতীর্থদের সাথে খেলতাম, খেলোয়াড় হিসেবে আমরা যেসব বিষয় নিয়ে সবসময় অভিযোগ করতাম—আমি সেই সবকিছুর সমাধান করতে চাই, যাতে বর্তমান খেলোয়াড়দের মনে আর কোনো অভিযোগ না থাকে। আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমি একা সবকিছু বদলে ফেলতে পারব না, তবে আমি নিশ্চিত যে অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতি করার জন্য আমি যথেষ্ট অবদান রাখতে পারব।
আসলে সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা মোটেও সুখকর ছিল না। বাংলাদেশে ক্রিকেট মানুষের কাছে অনেক বড় একটা আবেগের জায়গা এবং তারা এটিকে নিয়ে গর্ব করে। আমার কাজ হলো সেই হারিয়ে যাওয়া গর্ব ফিরিয়ে আনা, আমি সেটাই করার চেষ্টা করছি।
ব্যাটিং, বোলিং বা ফিল্ডিং এখন আর আমার কাজ নয়। আমি এখন ব্যাট বা বল কোনোটাই করতে পারব না, তবে আমি নিশ্চিত যে খেলোয়াড়দের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে তাদের পারফরম্যান্স আরও ২, ৩ বা ৫ শতাংশ উন্নত করতে সাহায্য করতে পারব। এটাই আমার লক্ষ্য।
প্রশ্ন: আপনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে কথা বলছিলেন; আপনার কি মনে হয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়াটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?
তামিম ইকবাল: আমরা পরিস্থিতিটা আরও ভালোভাবে সামলাতে পারতাম। আমরা আরও পরিপক্ব আলোচনা করতে পারতাম এবং একটি সমাধান খুঁজে বের করতে পারতাম। মাঠের লড়াই বা ক্রিকেট যেন কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
প্রশ্ন: আপনি ঠিক কখন মাঠের খেলা ছেড়ে টেবিলের অন্য পাশে (প্রশাসনে) আসার সিদ্ধান্ত নিলেন?
তামিম ইকবাল: আমার জন্য ‘হার্ট অ্যাটাক’ ছিল মূল টার্নিং পয়েন্ট। গত বছর যখন আমি জাতীয় দলে ফেরার চেষ্টা করছিলাম, তখন আমার একটি হার্ট অ্যাটাক হয়। আর তখনই আমি ভেবেছিলাম, ব্যস অনেক হয়েছে। হার্ট অ্যাটাকের পর আমার আর ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হতো না; কারণ আমি যদি খেলতামও, বড়জোর আর এক বা দুই বছর খেলতে পারতাম। আমার পরিবারে ছোট ছোট সন্তান আছে, তাই সম্ভবত ক্রিকেটে ফেরার জন্য আমি আর প্রস্তুত ছিলাম না।
প্রশ্ন: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে সম্পর্ক কিছুটা প্রভাবিত হওয়ার পর, অদূর ভবিষ্যতে কি আমরা আবার ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ দেখতে পাব?
তামিম ইকবাল: চলতি বছরের শেষের দিকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি নির্ধারিত সিরিজ রয়েছে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে ভারত বাংলাদেশে আসবে এবং পুরো সিরিজটি খেলবে। এটি এমন একটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ যা বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই উপভোগ করে। তারা মাঠে আসে এবং একটি স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ভারতের বিপক্ষে গত সিরিজে বাংলাদেশ দারুণ পারফর্ম করেছিল। এই দুটি দেশ যখনই মুখোমুখি হয়, বিশেষ করে ভারত যখন বাংলাদেশে আসে, তখন খেলাটির তীব্রতা থাকে আকাশচুম্বী।
আমি খুবই আশাবাদী। সমস্যা সবসময়ই থাকবে এবং সেগুলো সমাধান করা ক্রিকেট বোর্ডগুলোর দায়িত্ব। আমাদের এখন একটি নতুন ক্রিকেট বোর্ড রয়েছে, অ্যাড-হক কমিটি কাজ করছে এবং আমি নিশ্চিত যে আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান আসবে। দিনশেষে ক্রিকেটের জয় হওয়া উচিত। অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে ক্রিকেট সবসময় জয়ী হওয়া উচিত এবং আমি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাব।
আমি মনে করি না ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের মধ্যে কোনো সমস্যা আছে। যদি কিছু থেকেও থাকে, আমরা সবসময় আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করতে পারি। আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে চলতি বছরের শেষের দিকে ভারত বাংলাদেশ সফর করবে।
প্রশ্ন: পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়—প্রথমে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে হারাল এবং এবার নিজেদের মাঠে। এই জয়কে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
তামিম ইকবাল: আপনি যদি পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচগুলো লক্ষ্য করে থাকেন, তবে দেখবেন দুটি মাঠের উইকেটই ছিল স্পোর্টিং। বাংলাদেশ দুই টেস্টেই সবুজ ও ঘাসযুক্ত (গ্রিন টপ) উইকেট তৈরি করেছিল। এটি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশের জন্য স্পিন ট্র্যাক বানিয়ে সিরিজ জিতে নেওয়াটা খুব সহজ হতো, কিন্তু আমরা সবুজ উইকেট প্রস্তুত করেছি এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটে আমি ঠিক এই মানসিকতার পরিবর্তনই দেখতে চাই।
আমাদের প্রথমে নিজেদের মাঠে ভালো করতে হবে, বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে। নিজেদের মাঠকে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ বানাতে হবে। হ্যাঁ, আমরা ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি এবং ওয়ানডেতে দারুণ করেছি, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে এখনও সেই সাফল্য পুরোপুরি আসেনি। তবে স্পষ্টতই, আমরা বিদেশের মাটিতেও ম্যাচ জিততে চাই, কারণ ঘরের মাঠে টেস্ট জেতার আত্মবিশ্বাস বিদেশের মাটিতে দারুণ কাজে দেবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের এই মানসিকতার পরিবর্তন, বিশেষ করে ফাস্ট বোলিং বিভাগের এই উত্থান সম্পর্কে কিছু বলুন।
তামিম ইকবাল: আমি এটি খুব কাছ থেকে দেখেছি কারণ আমি সে সময় খেলছিলাম। আমি মনে করি এর অনেকখানি কৃতিত্ব তৎকালীন অধিনায়ক মুমিনুল হকের প্রাপ্য। আমার এখনও মনে আছে, প্রথম শ্রেণীর ম্যাচগুলোতে ও নিশ্চিত করত যেন ফাস্ট বোলাররা সর্বোচ্চ ওভার বল পায়। একটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচের কথা আমার মনে আছে—যেহেতু আমরা একই দলের হয়ে খেলছিলাম—আমি ওর কাছে গিয়ে বলেছিলাম যে আমরা সহজেই স্পিনারদের দিয়ে বল করাতে পারি। ও বলেছিল, “না, আমি যদি এখন এই ফাস্ট বোলারদের দিয়ে বল না করাই, তবে ওরা শিখবে কীভাবে? ওরা ভালো করুক বা খারাপ করুক, জাতীয় দলে আমাদের ফাস্ট বোলার দরকার এবং ওদের যত বেশি সম্ভব বল করতে হবে।”
আমার মনে হয় ওই মূল ব্যক্তি যে ফাস্ট বোলিং ইউনিটের চেহারা বদলে দিয়েছে। ও ফাস্ট বোলারদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যেন তারা ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশি বেশি ওভার বল করার সুযোগ পায়। ফাস্ট বোলাররা যখন সাফল্য পেতে শুরু করল, তখন ঘরোয়া ক্রিকেটার এবং তরুণ ছেলেরাও বিশ্বাস করতে শুরু করল যে বাংলাদেশেও একজন ফাস্ট বোলার হয়ে সফল হওয়া যায় এবং সুপারস্টার হওয়া সম্ভব। এর জন্য মুমিনুল হককে অনেক কৃতিত্ব দিতে হবে এবং সেই সাথে অ্যালান ডোনাল্ড ও ওটিস গিবসনের মতো কোচরাও এতে বড় ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রশ্ন: বিশ্বজুড়ে এত ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ভিড়ে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কী? আপনার কি মনে হয় ওয়ানডে ক্রিকেট এই ব্যস্ত সূচির মাঝে টিকে থাকবে, নাকি ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপই শেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে?
তামিম ইকবাল: ক্রিকেটের গতিপ্রকৃতি নিশ্চিতভাবেই বদলে গেছে। ৫০ ওভারের ক্রিকেটের কথা বললে, ওয়ানডে বিশ্বকাপ এখনও ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। হ্যাঁ, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নিয়ে মানুষের প্রচুর আগ্রহ আছে এবং এই ফরম্যাটটি দারুণ করছে, তবে আমাদের অবশ্যই একটি ভারসাম্য বজায় রাখার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এখন বিশ্বজুড়ে প্রচুর লিগ হচ্ছে, এমনকি সহযোগী দেশগুলোও নিজেদের টি-টোয়েন্টি লিগ নিয়ে আসছে।
আমাদের এমন একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে যেখানে সবকিছুর ভারসাম্য থাকবে। এটি নিয়ে আলোচনা হলে নিশ্চিতভাবেই সবার নিজস্ব মতামত থাকবে। তবে দিনশেষে আমাদের টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচাতে হবে, কারণ এটি ক্রিকেটের সবচেয়ে সম্মানিত সংস্করণ এবং এখনও এটি নিয়ে মানুষের প্রচুর আগ্রহ রয়েছে। হয়তো কিছু দেশে বড় দর্শক সমাগম দেখা যায় না, তবে এখনও এমন কিছু দেশ আছে যেখানে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। আমাদের এই বিষয়গুলোকে আরও একটু আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।
প্রশ্ন: আমরা যদি নাহিদ রানার উদাহরণ ধরি; আগামীকাল যদি একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি—যাদের ৫-৬টি ভিন্ন লিগে দল রয়েছে—এই তরুণকে একটি বড় অঙ্কের চুক্তি অফার করে এবং লাল বলের ক্রিকেট এড়িয়ে বিশ্বজুড়ে খেলে বেড়ানোর প্রস্তাব দেয়, আপনার কি মনে হয় আজকালকার তরুণদের পক্ষে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ (যেখানে তারা দশগুণ বেশি টাকা আয় করতে পারে) উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মনোনিবেশ করা সহজ?
তামিম ইকবাল: একটা জিনিস টাকা দিয়ে কেনা যায় না, আর তা হলো দেশের হয়ে খেলার আবেগ ও ভালোবাসা। যদি টাকার খেলাই সব হতো, তবে ৮০ শতাংশ ক্রিকেটার ওই পথেই চলে যেত। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রতি আমার সর্বোচ্চ সম্মান রয়েছে, তবে আপনি যখন আপনার জাতি ও দেশের হয়ে খেলেন, সেই অনুভূতি টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।
এমনকি আপনার দেশেও বড় বড় সুপারস্টাররা বিশাল অঙ্কের অফার পায়, কিন্তু তারা এখনও দেশের হয়েই খেলে। দেশের হয়ে খেলার এই তাড়না ভেতর থেকে, নিজের হৃদয় থেকে আসে।
আমি যদি ফুটবলের সাথে তুলনা করি—সেখানে খেলোয়াড়েরা লাখ লাখ ডলার বেতন পায়, কিন্তু যখন দেশের হয়ে খেলার সুযোগ আসে, তারা ঠিকই দেশের জার্সিতে মাঠে নামে। কিছু জিনিস সত্যিই টাকা দিয়ে কেনা যায় না এবং দেশের হয়ে খেলার এই আবেগ কখনোই বদলাবে না। হ্যাঁ, কিছু ব্যতিক্রম সবসময়ই থাকবে এবং দু-একজন ক্রিকেটার হয়তো ভিন্ন পথ বেছে নিতে পারে, তবে আপনি যদি আমাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা জিজ্ঞেস করেন, আমি মনে করি না যে এই চিত্র খুব দ্রুত বদলে যাবে।
