জনজীবনে নানামুখী সংকট আর মুদ্রাস্ফীতির মধ্যেই ভর্তুকি সমন্বয় করতে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়াল সরকার। এর ফলে আবাসিক (বাসাবাড়ি) গ্রাহকদের শ্রেণি বিবেচনায় বিদ্যুতের ব্যবহারভেদে মাসিক ব্যয় ২২ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়বে। আনুপাতিক হারে ব্যয় আরও বাড়বে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য শ্রেণির গ্রাহকদের।
এবারও গণশুনানি ছাড়াই সরকার নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করেছে। একইভাবে এর আগে গত বছর ২৫ মার্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ঘনমিটারপ্রতি ৭৫ পয়সা হারে বাড়ানো হয়েছে। গত ১৪ বছরে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৩ দফা বৃদ্ধি করেছে সরকার। এর মধ্যে গত বছর এক মাসেই তিন দফায় বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনজীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে
উঠবে। বিশেষ করে রোজার আগে মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে। বিদ্যুৎ খাতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অযাচিত ব্যয়ের কারণেই এভাবে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকির যে অঙ্কের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়েও বিতর্ক আছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের যে ব্যয় হয় তার চেয়ে কম মূল্যে গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করার কারণে প্রতি বছর এ খাতে লোকসান বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে ভর্তুকির পরিমাণ। এ ভর্তুকি থেকে সরে আসতে চায় সরকার। এজন্য বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এটা মূল্যবৃদ্ধি নয়। আগামী তিন বছরে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে এর উৎপাদন ব্যয় সমন্বয় করা হবে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতে সরকারের ভর্তুকি গুনতে হবে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এবারের মূল্য সমন্বয়ের কারণে ভর্তুকির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলোর রাজস্ব সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি বাড়বে।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন গতকাল রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ মূল্যবৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তা কার্যকর হবে একই মাসের ১ তারিখ থেকে। এবার পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। পিডিবির কাছে এই বিদ্যুৎ কিনে ছয়টি বিতরণ কোম্পানি যখন গ্রাহক পর্যায়ে তা বিক্রি করবে সে ক্ষেত্রে গড়ে সাড়ে ৮ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, এখন বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রতি ইউনিট ১২ টাকার মতো। আর বিক্রি করা হচ্ছে গড়ে ৭ টাকায়। তবে উচ্চবিত্ত শ্রেণির যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের বেশি দাম দিতে হবে। কারণ সরকারের ভর্তুকির সুবিধাও তারা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘ভোক্তা হিসেবে যেকোনো পণ্যের দাম বাড়–ক সেটা আমিও চাই না। সরকারও চায় না। বিদ্যুৎ খাতে সরকার তার রাজস্ব থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে। সেই ভর্তুকি কমিয়ে আনতেই উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে। কোনো পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করার পর যদি এর দাম বাড়ে তাহলে সেটাকে মূল্যবৃদ্ধি বলা হয়। কিন্তু এখানে তো সরকার লোকসান গুনছে। ফলে এটাকে দামবৃদ্ধি বলার কোনো সুযোগ নেই।’ এই দাম বাড়ায় জনগণের খরচ বেড়ে যাবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খরচ তো কিছুটা বাড়বে। তবে তা সহনীয় মাত্রায় থাকবে।’
মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সরকার চাইছে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে বাড়াতে। এতে ভর্তুকি যেমন কমবে তেমনি অপচয়ও কমে আসবে।
বাসাবাড়িতে নিম্নচাপ শ্রেণির লাইফলাইন গ্রাহকের (৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৬৩ পয়সা, প্রথম ধাপে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর ৪ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ২৬ পয়সা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে (৭৬-২০০ ইউনিট পর্যন্ত) ৬ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ২০ পয়সা, ২০১-৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৬ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৫৯ পয়সা, ৩০১-৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর বিল ৭ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২ পয়সা, ৪০১-৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ১১ টাকা ৫১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৬৭ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের ওপর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ১৩ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা করা হয়েছে।
মধ্যমচাপে (৫০ কিলোওয়াট থেকে ৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত) আবাসিক গ্রাহকদের ফ্ল্যাট রেট ৯ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৫৫ পয়সা, অফ-পিকে ৮ টাকা ৭৬ থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৫০ পয়সা এবং পিক সময়ে ১২ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে।
কৃষির সেচে ব্যবহৃত কৃষকের বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। সেচে বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৮২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ২৫ পয়সা হয়েছে। এ ধরনের গ্রাহকের মধ্যমচাপে (১১ কেভি) ফ্ল্যাট রেটে ৫ টাকা ৭৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪২ পয়সা, অফ-পিকে ৫ টাকা ২২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৭৭ পয়সা, পিকে ৭ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৬ পয়সা করা হয়েছে।
নিম্নচাপে ক্ষুদ্র শিল্পে ফ্ল্যাট রেটে ৯ টাকা ৮৮ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৭৬ পয়সা, অফ-পিকে ৮ টাকা ৮৮ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৬৮ পয়সা এবং পিকে ১১ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৯৫ পয়সা হয়েছে। মধ্যমচাপে শিল্প গ্রাহকদের ফ্ল্যাট রেটে ৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৮৮ পয়সা, অফ-পিকে ৮ টাকা ৯১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৭৫ পয়সা এবং পিকে ১২ টাকা ৩৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে। শিল্প গ্রাহকদের উচ্চচাপে ফ্ল্যাট রেট ৯ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা, অফ-পিকে ৮ টাকা ৮১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬৯ পয়সা এবং পিকে ১২ টাকা ২২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৪৭ পয়সা করা হয়েছে।
অতি উচ্চচাপ (শিল্প) (২০ মেগাওয়াট থেকে ১৪০ মেগাওয়াট) ফ্ল্যাট রেট ৯ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৬ পয়সা, অফ-পিকে ৮ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬১ পয়সা এবং পিকে ১২ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৪৫ পয়সা করা হয়েছে। এই শ্রেণিতে ১৪০ মেগাওয়াটের ওপরের গ্রাহকদের ফ্ল্যাট রেট ৯ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬১ পয়সা, অফ-পিকে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৫৪ পয়সা এবং পিকে ১২ টাকা ৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সা করা হয়েছে।
নিম্নচাপে বাণিজ্যিক ও অফিসের ফ্ল্যাট রেটে ১১ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ১ পয়সা, অফ-পিকে ১০ টাকা ৭৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৭১ পয়সা এবং পিক সময়ে ১৪ টাকা ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে। মধ্যচাপে এই শ্রেণিতে ফ্ল্যাট রেটে ১০ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৬৩ পয়সা, অফ-পিকে ৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৪৮ পয়সা এবং পিক সময়ে ১৩ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা ৫৭ পয়সা করা হয়েছে। উচ্চচাপে ফ্ল্যাট রেটে ১০ টাকা ৪৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৩৯ পয়সা, অফ-পিকে ৯ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ২৬ পয়সা এবং পিক সময়ে ১৩ টাকা ৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে।
শিক্ষা, ধর্মীয়, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল, রাস্তার বাতি ও পানির পাম্প, ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন ও অন্যান্য শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন ক্যাবের জ¦ালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হতেই পারে। কিন্তু সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে যেভাবে মূল্যবৃদ্ধি করছে সেখানেই আপত্তি।’
তিনি বলেন, ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় না করে বারবার বিদ্যুৎ-জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করতে চাইছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রক্রিয়া তোয়াক্কা না করে সরকারের নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর। এর মাধ্যমে যে আইন দিয়ে ভোক্তার স্বার্থ-সংরক্ষণ করা, সেই আইনকেই একপ্রকার বিলুপ্ত করে দেওয়া হলো।’
নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মাধ্যমে দাম সমন্বয় করতে গেলে অনেক বেশি সময় প্রয়োজন। এতে করে লোকসান বেড়ে যায়। যে কারণে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, এই দামবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।