কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পুরো ভবন। ভেতরে শুধু বাঁচার আকুতি। সবার চোখ সেখানে, কিন্তু সাধ্য নেই হাত বাড়ানোর। লেগে আছে ফায়ার ফাইটারের দল। তাদের মধ্যে আছে একজন দুঃসাহসী সোহাগ চন্দ্র কর্মকার। তিনিই বাড়িয়েছেন কাক্সিক্ষত হাত। তবে ধোঁয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবনে এগোতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম তার। তবু থেমে থাকেননি। অনেককে সেখান থেকে নিয়ে এসেছেন নতুন জীবনে। রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের একটি খণ্ডচিত্র এটি। এখান থেকেই সোহাগের সাহসের গল্প উঠে এসেছে।
সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশনে কর্মরত ফায়ার ফাইটার সোহাগ চন্দ্র কর্মকার অত্যন্ত সাহসী ও মানবিক। এ কথা বলছিলেন তার সহকর্মী ও সিনিয়র অফিসাররা। ওই স্টেশনের অফিসার সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোহাগ ভবনে আটকেপড়াদের উদ্ধার করতে গিয়ে মই থেকে পড়ে যাচ্ছিল, অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে। কিছুটা আহত হয়েছিল, এখন সে স্বাভাবিক। সে খুবই সাহসী, ফায়ার সার্ভিসের সব ধরনের কাজে তার দক্ষতা আছে। এর আগেও আগুনের ঘটনায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। সবখানে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। সে আমাদের সেরা একজন ফায়ার ফাইটার।’
সোহাগের সাহসিকতার কথা উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের ফটোসাংবাদিক মহুবার রহমানের ক্যামেরায়। তার ছবিতে দেখা যায়, উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে উঁচু মই থেকে পড়ে যাচ্ছে একজন ফায়ার ফাইটার। গতকাল শুক্রবার এই ছবির গল্প জানতে চাইলে সোহাগ চন্দ্র কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেইলি রোডের ওই ভবনে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ চলছিল। এরই মধ্যে আমরা ওপরের তলা থেকে কয়েকজনকে উদ্ধার করি। আমরা জানতে পারি ভেতরে আরও অনেকে আটকে আছে, তারা বের হয়ে সামনে আসতে পারছে না। এ খবরের পর আমি সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করি, তখন পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম। অল্পের জন্য নিচে পড়ে যাইনি। এরপর সেখান থেকে আটকে থাকা বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করি।’
ফায়ার ফাইটার সোহাগ বলেন, ‘এর আগেও অনেক বড় অগ্নিকান্ডে মানুষকে উদ্ধারে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। কেউ ভেতরে আটকে আছে আমি বাইরে থেকে তা দেখে থেমে থাকতে পারি না। তাদের আর্তনাদ শুনলে আমার আর কোনো পিছুটান থাকে না। নিরাপদে সরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি পাই। কারণ একটা প্রাণ চোখের সামনে ঝরে যাক সেটা আমার মেনে নেওয়া খুবই কষ্টের। আমার মতো সব ফায়ার ফাইটারই জীবনবাজি রেখে আগুনে কাজ করেন।’
গত বৃহস্পতিবার ওই ভবনের দোকানগুলোতে ভিড় ছিল মানুষজনের। তাদের আমেজে হঠাৎ বিপত্তি ঘটে নিচতলায় জ্বলে ওঠা আগুনে। রাত পৌনে ১০টার দিকে লাগা আগুন ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে সাড়ে ১১টায়। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৪৬ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারায় তাদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। ৭৫ জনকে জীবিত উদ্ধারের কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের ১৩ জন চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।