খামখেয়ালিপনায় গেল কত জীবন!

বেইলি রোডে পোড়া বহুতল ভবনের সামনে মানুষের ভিড়। কেউ জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে তাকিয়ে, কেউ ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করছেন। বেইলি রোডে ভবনটি ঘিরে যখন মানুষের জটলা তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনহারা মানুষের আহাজারি, কান্নার রোল চলছে।

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের এই বহুতল ভবনে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৪৬ জন। তাদের মধ্যে শিশু ৭, নারী ১৭ ও পুরুষ ১৬ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। দগ্ধ ১২ জন চিকিৎসাধীন। যাদের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে তাদের বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলছেন চিকিৎসকরা। রাজধানীর বহুতল ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে খামখেয়ালিপনার পুনরাবৃত্তি ঘটল গত বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডে। আর নিমতলী, চুড়িহাট্টার পর রাজধানীতে অগ্নিকান্ডে এতসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটল। আগুনের এমন ভয়াবহতার আশঙ্কা থেকে গ্রিন কোজি কটেজের মালিকপক্ষকে তিনবার সতর্ক করেছিল সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। তাদের নির্দেশনা উপেক্ষা আর অব্যবস্থাপনার খেসারত দিতে হলো ৫৮টি পরিবারকে।

এ ঘটনায় একটি খাবার দোকানের দুই মালিকসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর তুলনায় কোজি কটেজের দোকানগুলোতে ভিড় ছিল মানুষজনের। ভবনের ওপরে-নিচে থাকা রেস্তোরাঁগুলোতে ক্রেতা সমাগমও ছিল বেশ। স্বজন-প্রিয়জনদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় আসা ক্রেতাদের আনন্দঘন সময়টা নিমিষেই আগুনের বিভীষিকায় বিষাদে পরিণত হয়। রাত পৌনে ১০টার দিকে লাগা আগুন ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে রাত সাড়ে ১১টায়। জীবিত ও অচেতন অবস্থা উদ্ধার করা হয় অনেককে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানোর পর রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যুর খবর আসে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৪৬ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারায় ঢামেক হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে।

নিহতদের বেশিরভাগেরই শরীরে পোড়া ক্ষত নেই। কিংবা ক্ষত থাকলেও মৃত্যুঝুঁকির মতো মারাত্মক নয়। চিকিৎসকরা বলেছেন, তাদের মৃত্যুর কারণ ‘কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং’ বা বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায়।

আগুনে নিহতদের মধ্যে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে তারা হলেন আশরাফুল ইসলাম (২৫), মো. নুরুল ইসলাম (৩২), পপি রায় (৩৬), সম্পূর্ণা পোদ্দার (১২), জান্নাতিন তাজরিন (২৩), নাজিয়া আক্তার (৩১), আরহান মোস্তফা (১৪), মাইশা কবির মাহী (২১), মেহেরা কবীর দোলা (২৯), সম্পা সাহা (৪৭), জিহাদ হোসেন (২২), আতাউর রহমান (৬৩), মো. কামরুল হাবিব (২০), মেহেদী হাসান (২৯), ফৌজিয়া আফরিন (২২), নুসরাত জাহান (১৯), সৈয়দা ফাতেমা জহুরা (১৬), সৈয়দ আবদুল্লাহ (৮), স্বপ্না আক্তার (৪০), জারিন তাসনিন (২০), শান্ত হোসেন (২৩), দিদারুল হক (২৩), সৈয়দ মোবারক (৪৮), রুবী রায় (৪৮), প্রিয়াঙ্কা রায় (১৮), তুষার হাওলাদার (২৬), জুয়েল গাজী (৩০), আসিফ (২১), কেএম মিনহাজ (২৫), নয়ন (১৭), সাগর হোসেন (২০), তানজিলা নওরিন (৩৫), লুৎফুন নাহার (৫০), শিমন মিয়া (২১), সংকল্প সান ( ৮), আলিশা (১৩), নাহিয়ান আমিন (১৯), আমেনা আক্তার (১৩), নাফিসা ইসলাম (২০), মো. নাইম (১৮)।

মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শোক জানিয়েছে।

ভয়াবহ এ ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। পাঁচ সদস্যের ওই তদন্ত কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

গতকাল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিহতদের অধিকাংশই কার্বন-মনোক্সাইড পয়জনে মারা গেছেন। আগুন লাগলে বদ্ধ ঘরে যখন কেউ বের হতে না পারে তখন সেখানে সৃষ্ট ধোঁয়া তাদের শ্বাসনালিতে চলে যায়। এখানেও প্রত্যেকেরই তাই হয়েছে।’

তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ বর্তমানে ১২ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে দুজন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে এবং ১০ জন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদের চিকিৎসার ব্যয়ভারসহ যা যা দরকার সব বহন করবেন তিনি। এ ছাড়া আগুনে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান।

গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন। পরিদর্শন শেষে সচিব আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ভবনে ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল কি না আমরা তদন্তে দেখতে চাই। এ ছাড়া ভবন নির্মাণ করতে অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছিল কি না, তাও আমরা তদন্ত করে দেখব। আমরা তদন্তে দেখতে পাব কীভাবে আগুন লেগেছে এবং এখানে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না। এ ভবনটাকে ইতিপূর্বে ফায়ার নিরাপত্তাসংক্রান্ত নোটিস দেওয়া হয়েছিল। আমরা মনে করি যারা ব্যবসা করেন তাদের সবাইকে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।’

এ সময় ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক মাইন উদ্দিন বলেন, ‘এ ভবনে কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল না। রুটিন মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে এর আগে এ ভবন মালিককে তিনবার নোটিসও দেওয়া হয়েছে। ভবনে আমরা দুয়েকটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার দেখতে পেয়েছি। ভবনে একটি মাত্র সিঁড়ি রয়েছে। মানুষ যে কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানে একটি জানালাও ছিল না। এ ছাড়া চারতলায় গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে।’

র‌্যাব মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন বলেছেন, নিচের একটি ছোট দোকানে প্রথমে আগুন লেগেছিল। সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তারা প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। তবে পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ মানুষই ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধে মারা গেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তারাও রিপোর্ট দেবে। একটি ভবন তৈরির ক্ষেত্রে রাজউকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এজন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সরকার দায়িত্ব দিলে আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করব। দায়িত্ব না পেলেও প্রকৃত ঘটনার খোঁজ নিয়ে আমরা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সহায়তায় একটি রিপোর্ট তৈরি করে প্রতিবেদন দেব।’

পুড়ে যাওয়া গ্রিন কোজি কটেজ থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লোকমুখে শোনা যাচ্ছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমাদের প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য পর্যালোচনায় এমন কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সেখানে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার অক্ষত দেখা গেছে। তবে আমাদের বিস্তারিত তদন্ত ও আলামত পরীক্ষা সাপেক্ষে এ অগ্নিকা-ের প্রকৃত কারণ জানাতে পারব।’

ঘটনাস্থল ঘুরে ও ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই ভবনের নিচতলায় স্যামসাং ও গেজেট অ্যান্ড গিয়ার নামে দুটি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিক্রির দোকান এবং শেখলিক নামের একটি ফলের রস বিক্রির দোকান ছিল। দ্বিতীয়তলায় কাচ্চি ভাই নামের একটি রেস্তোরাঁ, তৃতীয়তলায় ইলিয়ন নামের একটি পোশাকের ব্র্যান্ডের দোকান, চতুর্থতলায় খানাস ও ফুকো নামের দুটি রেস্তোরাঁ, পাঁচতলায় পিৎজা ইন নামের একটি রেস্তোরাঁ, ছয়তলায় জেসটি ও স্ট্রিট ওভেন নামের দুটি রেস্তোরাঁ এবং ছাদের একাংশে অ্যামব্রোশিয়া নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল।

গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪০ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে বলে ঢাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ৪৬টি লাশের মধ্যে ৪০ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তাদের সবাইকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ছয়টি লাশের মধ্যে তিনটি শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একেএম হেদায়েতুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনটি লাশ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অশনাক্ত লাশের মধ্যে এক নারী ও শিশুর মরদেহের দাবি নিয়ে কেউ আসেনি। আমরা অনুমান করছি তারা মা-মেয়ে। চেহারা একইরকম। তাদের কোনো দাবিদার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।’

এদিকে অঙ্গার হওয়া যে লাশগুলো চেনা যাচ্ছে না, তাদের মধ্যে দুজনের দাবি নিয়ে মর্গে এসেছেন স্বজনরা। তবে ওই দাবিদারদের লাশ না দিয়ে তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, নিহতের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে। ৩৪ জনের দাফন-কাফনসহ আনুষঙ্গিক খরচের জন্য টাকা নিতে বলা হলেও তারা স্বাবলম্বী জানিয়ে সেই অর্থ নেননি। এ ছাড়া আহত হয়ে যারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদের ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আহত এরকম ১৩ জনকে দেওয়া হয়েছে।

আগুনের ঘটনায় গতকাল চুমুক নামের একটি খাবার দোকানের দুই মালিকসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হলেন চুমুকের মালিক আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান রিমন এবং কাচ্চি ভাই নামে আরেকটি খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মো. জিসান। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার খ. মহিদ উদ্দিন গতকাল সন্ধ্যায় ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ভবনের নিচতলার খাবার দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত। আগুনের ঘটনায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করবে। ভুক্তভোগী পরিবারের কেউ মামলা করতে চাইলে মামলা করতে পারবেন।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘শুধু ব্যবসায় লাভের কথা নয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথাও চিন্তা করতে হবে।’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আটক তিনজন ছাড়াও ভবন মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়দায়িত্ব নিরূপণ করা হবে। সবাই যেন ‘সেফটি ফার্স্ট’ নীতি মেনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন সে অনুরোধ জানান তিনি।