‘আমার স্বামীর ইজিবাইককে একটা বাস চাপা দেয়। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে তাকে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। এক প্রতিবেশী আমাকে খবর দেন। আমি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে যাই। চিকিৎসকরা বললেন, ওর অবস্থা ভালো নয়, ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে না গেলে বাঁচানো যাবে না। এরপর মানুষটাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে এসে শুনি হাসপাতালে সিট খালি নেই। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, আমি হাসপাতালের সামনে ইট বাঁধানো গাছতলায় বসে কাঁদতে লাগলাম। তখন একজন অচেনা মানুষ এসে আমার কাছে বিস্তারিত শুনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিল। তার কথায় যেন কূল পেলাম। তাকে আমার ধর্মের ভাই বানালাম, অথচ ওই মানুষটাই আমাদের ফতুর করে দিল।’ ফোনে কাঁদতে কাঁদতে দেশ রূপান্তরকে এ কথা বলছিলেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কামালদি এলাকার মুক্তা বেগম। তিনি বলেন, ‘ওই লোকটা আমাকে বলে, পঙ্গু হাসপাতালের ডাক্তাররা মানুষ নয়, একেকটা জানোয়ার। ভালো মানুষের পা কেটে ফেলে। হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে; সিট খালি নেই। হাসপাতাল থেকেও আমাকে জানানো হয়েছিল, সিট খালি নেই। ফলে তাকে আমার আরও বিশ্বস্ত মনে হলো। এরপর তিনি বলেন, পাশেই আমার এক বড় ভাইয়ের হাসপাতাল আছে, আপনারা আমার সঙ্গে চলেন অল্প টাকায় চিকিৎসা করিয়ে দেব। গরিবের কষ্ট গরিব বুঝে, আপনাদের সব দায়িত্ব আমার।’
মুক্তা বেগমের ইজিবাইকচালক স্বামী সাহাবুদ্দিন গত বছর ১০ নভেম্বর কামালদিতে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। তার ইজিবাইককে সাকুরা পরিবহনের একটা বাস ধাক্কা দেয়। স্থানীয় মানুষজন তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে। চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠান। পঙ্গু হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকায় এক দালাল তাদের নিয়ে যায় রাজধানীর কলেজগেট এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের দ্বিতীয়তলার প্রাইম জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে তারা চিকিৎসা তো পানইনি, উল্টো তাদের সব টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে স্ট্যাম্পে দস্তখত নিয়ে হাসপাতাল থেকে তাদের বের করে দেন হাসপাতালের মালিক আবদুর রাজ্জাক।
এরপর আবার পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হলে চিকিৎসকরা জানান, চিকিৎসায় দেরি হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। পঙ্গু হাসপাতালে সাহাবুদ্দিনের চারটি অপারেশন হয়। ২৪ নভেম্বর ভর্তি হয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা চিকিৎসা নেন। এরপর দুই পায়ে রড পরিয়ে তাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে ১৪ দিন পর আবার হাসপাতালে যেতে বলেন। ১৪ দিন পেরিয়ে গেছে। টাকা জোগাড় না হওয়ায় তারা পঙ্গু হাসপাতালে যেতে পারছেন না।
মুক্তা বেগম বলেন, ‘প্রাইম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিন তারা আমাদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করে। পরদিন আমার স্বামীর জরুরি অপারেশনের কথা বলে আমাদের সঙ্গে থাকা ৮৫ হাজার টাকা জমা নেন হাসপাতালের মালিক আবদুর রাজ্জাক। কিন্তু অপারেশন করা হয়নি। পাঁচ দিন পর আমাকে আবার টাকা দিতে বলেন। আমি আমাদের আর্থিক সমস্যার কথা জানিয়ে অপারগতার কথা বললে মালিক আমার স্বামীর চিকিৎসা বন্ধ করে দেন; এমনকি আমাদের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেন। হাসপাতাল থেকে আমাকে বাইরে যেতে দেওয়া হতো না।’
সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আরও ১ লাখ টাকা জমা দেওয়া না হলে আমার চিকিৎসা হবে না এবং আমরা কোথাও যেতে পারব না বলে হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়। একদিন আবদুর রাজ্জাক এসে বলেন, তোমাকে কোন গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করেছিল? জেনে তারা সাকুরা বাসের ড্রাইভার ও মালিকের সঙ্গে কথা বলে। একদিন আমাকে ও আমার স্ত্রীকে মালিকের রুমে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। আগেই আমাদের হুমকি দেওয়া হয় তাদের কথায় সম্মতি না দিলে হাসপাতালে টাকা না দেওয়ার জন্য পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হবে। মালিকের রুমে গিয়ে দেখি সেখানে বাসের মালিকপক্ষের মানুষজন বসে আছে। তাদের কাছ থেকে আমার চিকিৎসার কথা বলে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা তারা হাতিয়ে নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল-মালিক আমাকে জিম্মি করে টাকা নিয়েছে তাতে সমস্যা নেই, যদি আমাকে চিকিৎসা দিত তাহলে হতাশ হতাম না। পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, দেরিতে চিকিৎসার কারণে আমার পায়ের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’
প্রাইম হাসপাতালের মালিক আবদুর রাজ্জাকের কক্ষে টাকা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন গাবতলী বাস টার্মিনালের পরিবহন শ্রমিক নেতা আবদুল কুদ্দুস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ এক নেতার নির্দেশে আমি প্রাইম জেনারেল হাসপাতালে যাই। সেখানে আহত রোগীর চিকিৎসা বাবদ অনেক টাকা বকেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। আমরা অনেক আলাপ-আলোচনার পর মালিকের সঙ্গে মীমাংসা করে টাকা দিয়ে আসি। সে সময় আহত সাহাবুদ্দিন ও তার স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।’
সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘প্রথম তিন-চার দিন আমাকে মোটামুটি চিকিৎসা দেওয়া হলেও এরপর আর কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। আমার স্ত্রীকে শুধু হাসপাতাল থেকে বের হতে দেওয়াই হয়নি, তাকে বিভিন্ন ধরনের হয়রানিও করা হয়েছে। বাসের মালিকপক্ষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার দুদিন পর আমাদের স্ট্যাম্পে দস্তখত দিতে বলেন আবদুর রাজ্জাক। কী লেখা আছে জানতে চাইলে বলা হয়, হাসপাতালের বিল হিসেবে আমি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছি এবং হাসপাতাল থেকে স্বেচ্ছায় রিলিজ নিয়েছি। দস্তখত দিতে না চাইলে পাশের রুম থেকে ১০-১৫ জন ছেলে এসে আমাদের গালাগাল শুরু করে এবং ভয় দেখিয়ে আমাদের দস্তখত দিতে বাধ্য করে।’
প্রাইম হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চেয়ে গত ২৮ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন মুক্তা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর বাম পা এবং ডান হাতে বড় ক্ষতি হয়েছে। চিকিৎসকরা তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা নিয়ে সংশয় জানিয়েছেন। প্রাইম হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময়ে দেখেছি সেখানে আমার মতো আরও অনেকে হয়রানির শিকার হন। রোগীরা আমার মতোই গ্রাম থেকে এসে দালালের মাধ্যমে ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিন আমার কাছে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগের বিপরীতে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। সাহাবুদ্দিনের অভিযোগটা আমার নজরে পড়েনি, আমি দপ্তরে খোঁজ নিয়ে দেখব। তারা অভিযোগ দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, প্রাইম জেনারেল হাসপাতালের মালিক আবদুর রাজ্জাক নিজেই হাসপাতালের দালাল ছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, চক্ষু ও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে তিনি কমিশনের বিনিময়ে দালালি করে রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভাগিয়ে নিয়ে যেতেন। ওই এলাকায় তিনি গড়ে তোলেন দালালদের সিন্ডিকেট। হাসপাতালগুলোর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন অপকর্ম করতে থাকেন ও টেন্ডার পেতে থাকেন। একপর্যায়ে প্রাইম হাসপাতাল গড়ে তোলেন। তার হাসপাতালের বিরুদ্ধে এর আগেও রোগীদের হয়রান করার অভিযোগ উঠেছে।
প্রাইম জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে আবদুর রাজ্জাককে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় জেনে ফোন বন্ধ করে দেন।