মির্জা আজম তখন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তিনি দেখলেন, গার্মেন্টস প্রোডাক্টের লাইসেন্স নিয়ে হয়রান হতে হয় ব্যবসায়ীদের। গার্মেন্টস চালু থেকে পণ্য বিদেশে রপ্তানি পর্যন্ত প্রায় ৪০টি দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়। আগেভাগেই নিতে হয় বস্ত্র অধিদপ্তরের লাইসেন্স।
গার্মেন্টস দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বিষয়টি উপলব্ধি করে মির্জা আজম সমস্যার গভীরতা বোঝার চেষ্টা করলেন। নিয়ম করে দিলেন আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গেই লাইসেন্স দেওয়া হবে না। সরকারের অন্যান্য দপ্তরের লাইসেন্স পেলেই শুধু বস্ত্র অধিদপ্তরের লাইসেন্স দেওয়া হবে। কিন্তু বস্ত্রের লাইসেন্স না মিললে প্রাথমিক কাজ শুরু করতে পারেন না ব্যবসায়ীরা। এমন পরিস্থিতিতে লাইসেন্স আবেদন গ্রহণের প্রাথমিক চিঠি দিয়েই অন্য দপ্তরের লাইসেন্স বা অনুমোদন পাওয়ার নিয়ম করে দেন মির্জা আজম। আর এতে দূর হয় বিশৃঙ্খলা।
রেস্তোরাঁ চালু রাখতে গিয়েও একই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের ১৩টি দপ্তরের অনুমতি লাগে একটি রেস্টুরেন্ট চালু রাখতে। আর এসব দপ্তর একটি আরেকটির ওপর নির্ভর করে না। তারা আলাদা আলাদা লাইসেন্স দেয়। এতে করে নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুকারী সিটি করপোরেশন জানে না রেস্টুরেন্ট কর্র্তৃপক্ষ ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নিয়েছে কি না বা পরিবেশের, বিস্ফোরকের, শ্রমস্বার্থের, স্থাপনার অথবা বিদ্যুতের মতো নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ছাড়পত্রের তথ্য। এতে করে বিধিবদ্ধ তদারকি সংস্থাগুলো যথাযথ তদারকি করতে পারে না। যার ফল হিসেবে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারায় নিষ্পাপ শিশু। রক্ষা পায় না সরকারি দপ্তরের কর্মীও।
এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য বস্ত্র অধিদপ্তরকে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সিটি করপোরেশনকেই এখানে শৃঙ্খলা আনতে হবে। বর্তমানে তারা যে পদ্ধতি অনুসরণ করছে তাতে পরিবর্তন আনলে কাক্সিক্ষত সেবা মিলতে পারে। সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকেই চূড়ান্ত লাইসেন্স দিতে হবে। মুড়িমুড়কি বিক্রির মতো লাইসেন্স ইস্যু করলে পরিবর্তন আসবে না। ইস্যুর আগে নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনকারী ফায়ার, বিস্ফোরক, পরিবেশ, শ্রমস্বার্থ বা বিদ্যুতের মতো নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট লাইসেন্সগুলো নিয়েছেন কি না। একই সঙ্গে ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) বা একই জায়গায় সব সেবার সুবিধা চালু করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের আইন ও বিধির নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন লাইসেন্স দেওয়ার সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত ভবনের অনুমোদিত নকশা স্বীকৃত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের সনদ পাওয়ার পরই ছাড়পত্র দিতে হবে।
দেশে কোনো লাইসেন্স দেওয়ার সময়ই অন্য দপ্তরের লাইসেন্স দেখা বাধ্যতামূলক নয়। তবে সংশ্লিষ্টরা ঘুষ নেওয়ার কৌশল হিসেবে এক লাইসেন্স দেওয়ার সময় অন্য লাইসেন্সের কথা জানতে চান। সরকারের একক কোনো দপ্তর নেই যারা পুরো বিষয়টি তদারকি করছে। অবশ্য এ অবস্থা থেকে বের হয়ে এসেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (বিডা)। ওএসএস চালু করার মাধ্যমে তারা লাইসেন্স ইস্যুকারী সব দপ্তরকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে বিডার বিদেশি বিনিয়োগ, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের সব লাইসেন্স বা অনুমোদনসংক্রান্ত কাজ এক জায়গা থেকে হয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান এক প্রশ্নের জবাবে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের কোনো একটা দপ্তরকে তো সমন্বয়ের দায়িত্ব নিতেই হবে। লাইসেন্স বা অনুমোদন বা অবহিতকরণ যাই বলি না কেন, প্রয়োজনীয় সবকিছু সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আছে কি না তার দায়িত্ব ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুকারী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে। এটা তাদের দায়িত্ব। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার নাগরিকদের সুবিধা-অসুবিধা এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকেই দেখতে হবে। এখন কেন সেটা হচ্ছে না তা সহজেই বোঝা যায়।’
ওয়ান স্টপ সার্ভিস করে ট্রেড, ফায়ার, পরিবেশ, বিস্ফোরক লাইসেন্স এক জায়গা থেকে দেওয়া হলে সমস্যার সমাধান হতে পারে কি না, জানতে চাইলে সাবেক এ সচিব বলেন, ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে। কিন্তু ওয়ান স্টপ সার্ভিস করলে সিটি কর্তাদের আয় কমে যাবে। এজন্যই ওয়ান স্টপ সার্ভিস করার দীর্ঘদিনের পুরনো সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’
সরাকারের একজন সচিবও নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার না করতে পারলে সমস্যার সমাধান হবে না। বিডার মতো এক ছাতার নিচে আনতে না পারলে মনিটরিং করা সহজ হবে। অনিয়মও কমে আসবে। কিন্তু বিডার স্টেকহোল্ডার কম। সেখানে ওএসএস করা সহজ হলেও সারা দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ জটিল। জটিল হলেও ওএসএস ছাড়া বিকল্প নেই।’
বেইলি রোডে রেস্টুরেন্টে আগুন লেগে ৪৬ জনের মৃত্যুর পর সরকারি সংস্থার তদারকি নিয়ে কথা উঠেছে। তদারকি সংস্থা কি তদারকি করছে? তদারককারীদের তদারকিও প্রশ্নবিদ্ধ। বেইলি রোডের মতো ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য সতর্ক হতে হবে। নিয়মকানুন অমান্যকারীদের খুঁজে বের করে তাদের সময় দিয়ে শোধরানোর সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে জরিমানা করতে হবে। তা না করে হুটহাট রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এ অবস্থায় পুনরায় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কথা উঠেছে, তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সাবেক ও প্রথম মহাপরিদর্শক (আইজি) সৈয়দ আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের বিষয়ে সরকারকে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজউক কোনোদিনই পর্যাপ্ত জনবল পাবে না। এ অবস্থায় রাজউক ভবন নির্মাণের একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেবে। সেই মানদণ্ড অনুযায়ী নগরবাসী তাদের স্থাপনা নির্মাণ করবে। স্বনির্ধারণী কর যেভাবে নির্ধারণ করা হয় সেভাবে। এ ছাড়া এখানে আউটসোর্সিং করেও সমস্যার সমাধান করা যায়। বিশ্বের বহুদেশ এভাবে সমাধান করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে কেউ কারও ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। এ কারণে সংস্কার সম্ভব হয় না।’
এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য শুরুতেই ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। অনেক কিছু যাচাই-বাছাইয়ের পর এ লাইসেন্স ইস্যুর কথা। কিন্তু যাচাই-বাছাই তো দূরের কথা সরেজমিন পরিদর্শন না করেই লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। বিষয়টি এতটাই সহজলভ্য যে, টাকা দিলে লাইসেন্স বাড়িতেও পৌঁছে যায়। অত্যন্ত সহজলভ্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স কখন দেওয়া হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয় ব্যবসার শুরুতেই। এরপর ব্যবসা চালানোর পাশাপাশি একে একে অন্যান্য লাইসেন্স নেন ব্যবসায়ীরা।
ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াও রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য যেসব লাইসেন্স নিতেই হবে তার মধ্যে অন্যতম ফায়ার লাইসেন্স। ফায়ার সার্ভিস থেকে এ লাইসেন্স না নিলে রেস্টুরেন্ট চালানো যায় না। পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্সও গুরুত্বপূর্ণ। তারা অবস্থানগত ছাড়পত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্র এ দুই ধরনের লাইসেন্স দেয়। রেস্টুরেন্টগুলোতে শ্রমিকরা কাজ করে। তাদের স্বার্থ তদারকির জন্য নিতে হয় সরকারি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডায়িফ) ছাড়পত্রও। শ্রমিকদের জন্য শোভন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হয় এর মাধ্যমে। শ্রমিকদের জীবনমান ও চাকরিসংক্রান্ত স্বার্থ তদারকির জন্য এ লাইসেন্স নিতে হয়। ডায়িফ স্থাপনার আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, ভবনের লোডবিয়ারিং ক্যাপাসিটি, লে-আউট, শ্রমিকদের নিয়োগপত্রসহ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দেখে। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের কারণে নিতে হয় বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। ফুড আইটেম থাকায় প্রয়োজন হয় সিভিল সার্জনের অনুমতিপত্র। নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন নতুন সংযোজন করা হয়েছে। নিতে হয় জেলা প্রশাসকের অনুমতিও। লাগে রাজউকের অক্যুপেন্সি সার্টিফিকেট এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিতরণ কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদনও।
বিভিন্ন সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা ভবন ধসের ঘটনা ঘটছে। বড় বড় এসব দুর্ঘটনার পর সরকার নানাভাবে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। রানা প্লাজা ধসের পর অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্স এসেছে। এরপর পোশাক খাতের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হয়েছে। চুড়িহাট্টা ও নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কয়েক বছরের ব্যবধানে হাসেম ফুডের কারখানায় আগুন লাগে। এ অগ্নিকাণ্ডের পর সরকার বিডার নেতৃত্বে পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদার করে। ডায়িফ ছাড়াও এ পরিদর্শনে বয়লার পরিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং গণপূর্তকে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রয়োজনই সবকিছু করতে বাধ্য করে। বস্ত্র অধিদপ্তরের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল সময়ের প্রয়োজনে। সেই সময় যা করা হয়েছিল এখনো সেই পদ্ধতিই বহাল আছে। ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা যায়। তবে তা কার্যকর হবে কি না, তা আগেই চিন্তা করতে হবে।’