বঙ্গবন্ধু বললেন ওরা আড়াল থেকে সব করবে

একাত্তরের ৭ মার্চের ঘটনায় যাওয়ার আগে কিছু লেখা দরকার। আমার বাবা মোহাম্মদ আবুল খায়ের ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ফরিদপুর জেলার পাঁচ আসনের (বর্তমান গোপালগঞ্জ-১ আসন) আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য।

একাত্তরে অডিও কোম্পানি ‘ঢাকা রেকর্ড’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। সেখান থেকে নরমাল, কমার্শিয়াল এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্রের গানের রেকর্ড বের হতো। এই রেকর্ড কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন বাবা। আর চিত্রপরিচালক সালাউদ্দিন সাহেব ছিলেন এ রেকর্ড কোম্পানির প্রধান ব্যক্তি। যিনি ‘রূপবান’ ছবির প্রযোজক। মূলত তিনিই ছিলেন প্রধান ব্যক্তি। আর বাবা ছিলেন, ‘সুতরাং’ এবং ‘জয়বাংলা’ ছবির প্রযোজক। যাই হোক, তারা একপর্যায়ে জানতে পারলেন বঙ্গবন্ধু দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনতার সামনে ভাষণ দেবেন। তখন ঢাকা রেকর্ডসের কমিটি সিদ্ধান্ত নিল, এ ভাষণটি রেকর্ড করা দরকার। কারণ তারা জানতেন, এটা দারুণ কিছু হবে। নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক হবে। কিন্তু এতটা ভাবেননি যে, একদিন এ ভাষণই হবে বাঙালির অমূল্য সম্পদ, অমর কবিতা। সেই অনুযায়ী এটা ধারণ করার সিদ্ধান্ত হলো। তবে এটা ভয়ংকর কঠিন একটা কাজ। কারণ ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার যে মঞ্চ ছিল সেটা ছিল অসম্ভব নিরাপত্তাবেষ্টিত। সেই নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। তারপরও মঞ্চের আড়ালে সব যন্ত্রপাতি রেখে, রেকর্ড করতে হবে। যাতে সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দাদের নজরে এটা না পড়ে। অবশ্য এটা করতে হলে আওয়ামী লীগের অনুমতি লাগবে। এর চেয়েও বেশি দরকার ছিল, বঙ্গবন্ধুর অনুমতি নেওয়া। যেহেতু বাবা ফরিদপুরের পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য (এমএনএ) ছিলেন (বর্তমান গোপালগঞ্জ), সেই হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। সেই পঞ্চাশ দশকের মধ্যবর্তী সময় থেকেই। সেটা শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধুু হওয়ার আগের কথা। তখন আমাদের জন্মও হয়নি। সেই অধিকার থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে বললেন আমরা আপনার বক্তব্য রেকর্ড করতে চাইছি। কিন্তু আপনার অনুমতি লাগবে। তখন এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু সবাইকে নির্দেশ দিলেন। বললেন, ‘ওরা যেভাবে যা করার করবে। তোরা বাধা দিস না। ওরা আড়াল থেকে সব করবে।’

৭ মার্চের দিন, মঞ্চের নিচে মাচার মতো জায়গা করে, এমনভাবে সব করা হলো, যাতে আর্মি বা গোয়েন্দারা টের না পায়। টেকনিক্যাল কাজ যারা করবেন, তাদের নিয়ে আসা হলো। যন্ত্রপাতি সব বসানো হলো। এভাবে পুরো বক্তৃতা রেকর্ড করা হলো। এরপর ওই বছরই ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ভাষণের রেকর্ড কপি তুলে দেওয়া হলো বঙ্গবন্ধুর হাতে।

এরপর ২৫ মার্চ এলো, বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলেন। বাবাও চলে গেলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। একপর্যায়ে যুক্ত হলেন মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে। বাবা কলকাতা যাওয়ার সময় ৭ মার্চের ভাষণটি সঙ্গে নিয়ে গেলেন। তাজউদ্দীন আহমদের হাতে রেকর্ডটি দিলেন। হাতে পেয়ে অসম্ভব খুশি হয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, এটা ভীষণ কাজে লাগবে। তিনি বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু সত্যিকার অর্থে কী বলেছেন, তার কোনো প্রমাণই আমাদের হাতে নেই।’ এরপর ভারতের এইচএমভি কোম্পানি বিনামূল্যে এ ভাষণের তিন হাজার কপি করে দেয়। পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন দূতাবাসে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হলো, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে এই অডিও ভাষণ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যাতে মুক্তিযোদ্ধারা মনোবল ফিরে পায়। আরও উদ্ধুদ্ধ হয়। বিষয়টা এমন হলো, এ ভাষণের দুই লাইন বলামাত্রই মুক্তিযোদ্ধাদের মনের অবস্থা এমন হলো যে, ওরা তখনই যেন যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যাবে! একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও এটি প্রচারিত হতে থাকল নিয়মিত। যখন এ ভাষণ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত হতো, তখন মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে কী অসাধারণ উত্তেজনা দেখা দিত! মনে হতো, বঙ্গবন্ধু আমাদের সামনেই রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ রেকর্ডটাই ছিল একমাত্র দলিল।

পরবর্তীকালে আমরা জানলাম, এ ভাষণের একটা ভিডিও রয়েছে। ধারণ করেছিলেন অভিনেতা আবুল খায়ের। তবে সেটা পাওয়া গেল দেশ স্বাধীনের পর। কিন্তু অডিও করেছিল ঢাকা রেকর্ড। যার নেপথ্যে মূল মানুষ ছিলেন আমার বাবা। বাবার প্রযোজিত ‘জয় বাংলা’ ছবির একটি গান ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সিগনেচার টিউন। গানটা হলো জয় বাংলা বাংলার জয়।