আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিকামী বাঙালিকে ১৮ মিনিটের এক অমর কবিতা শোনান। অলিখিত এ অমর কবিতাটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য অনুপ্রেরণা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনেসকোর কাছ থেকে।
৭ মার্চের ভাষণে শুধু পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে সাত কোটি বাঙালিকে মুক্ত করার ঘোষণাই ছিল না, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার অমোঘ অনুপ্রেরণা হিসেবেও কাজ করেছে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত ২১ বছর আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ।
ইতিহাসবিদ, গবেষক ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ। রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। কিন্তু সেই ষড়ষন্ত্র মোকাবিলা করে সংগঠিত হতে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে ৭ মার্চের ভাষণ।
২১ বছর ধারাবাহিক অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুমের মধ্যেও ৭ মার্চ এলে দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বা বঙ্গবন্ধু-ভক্তরা ভাষণটি পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও শোনার বা শোনানোর চেষ্টা করতেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ আনোয়ার হোসেন বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী মহাবিপর্যের মুখে পড়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে পাকিস্তান ভাবধারার রাষ্ট্রযন্ত্র আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার পাঁয়তারা করে। নেতাকর্মীদের অত্যাচার-নির্যাতন ও দলে ভাঙন ধরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তখন এক অস্বাভাবিক সময় পার করে আওয়ামী লীগ। এ অবস্থার মধ্য দিয়েও ৭ মার্চ এলেই ঐতিহাসিক ভাষণ শোনা যেত।
টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ফজলুর রহমান ফারুক বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত চলে ২১ বছর। কিন্তু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ সে সময়ে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখে। উজ্জীবিত করে। তিনি বলেন, ‘সুযোগ খুঁজে অল্প সময়ের জন্য হলেও আমরা ভাষণ শুনতাম। মানুষকে শোনানোর চেষ্টা করতাম। যদিও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাধার মুখে পড়তে হতো। এই ভাষণ বাজানোর অপরাধে জেল-জুলুমও খাটতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামতেন। ওই সময়ে আওয়ামী লীগ নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত হতো।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রবীণ রাজনীতি মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, ৭ মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে একটা ঐতিহাসিক দিন। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা দেন মুক্তিকামী বাঙালিকে।
তিনি বলেন, সে সময়গুলোতে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী পালন করা যেত না। মিলাদ পর্যন্ত করতে দিত না রাষ্ট্রযন্ত্র। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগকে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২১ বছর ধারাবাহিকভাবে অত্যাচার-নির্যাতন, জেলজুলুম সহ্য করতে হয়েছে। এর মধ্যেও ৭ মার্চের ভাষণ অবশ্যই অনুপ্রাণিত করেছে। এদিন আসলে দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে মাইকে ভেসে আসত ‘ভায়েরা আমার...। শোনা হতো এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম...। এদিনটিতে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী বা বঙ্গবন্ধুভক্তরা ভাষণটি পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও শুনতেন বা মানুষকে শোনানোর চেষ্টা করতেন। এই ভাষণ মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। উজ্জীবিত করেছে।
পঁচাত্তর-পরবর্তী দুঃসময়ের স্মৃতি তুলে ধরে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য পল্টু আরও বলেন, ‘এত অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হলেও ৭ মার্চ এলে আমরা মিছিলে গিয়েছি। মিছিল থেকে অনেক কর্মীকে জেলে নিয়ে গিয়েছিল। পরে তাদের আর পাওয়াও যায়নি। তারপরও আমরা এগিয়ে গিয়েছি। অনেক বাধাবিপত্তি, জেলজুলুম আমরা খেটেছি।’
তিনি বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে জেল থেকে বেরিয়ে মনে হয়েছিল এটা তো পাকিস্তান হয়ে গেছে। ৭ মার্চের ভাষণের জন্য অনেক কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু কর্মীরা কোনো মতেই বাধা মানতে চায়নি। আক্ষেপ করে বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, ‘তারা তো ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। তবুও এ ভাষণ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। অনুপ্রাণিত করবে।’
কিশোর বয়সে প্রথম এ ভাষণ শোনেন আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘যখন এ ভাষণ শুনি, তখন ভেতরে শিহরণ জাগিয়েছে। ওই সময় থাকলে মুক্তিযুদ্ধে আমিও যেতাম এমন অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে এখনো উজ্জীবিত হন জানিয়ে তিনি বলেন, যে সমাজে শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার-নির্যাতন চলমান রয়েছে, সেই সমাজে এ ভাষণের উপযোগিতা রয়েছে। যত দিন পৃথিবী থাকবে, তত দিন এই ভাষণ থাকবে। বঙ্গবন্ধুর অলিখিত ৭ মার্চের ভাষণ বিপ্লবের শিহরণ জাগায়। এখনো আগের মতো যতবারই শুনি, ততবারই রক্তে শিহরণ জাগে।
সাবেক এই ছাত্রনেতা আরও বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হুমকির মুখে পড়ে। পাকিস্তানি ভাবধারায় চলতে শুরু করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ।
ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ এক অসাধারণ মহাকাব্য। ছোটবেলায় এই ভাষণ যখন প্রথম শুনি, তখন এই ভাষণ শিরায় শিরায় দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এই ভাষণে শরীরে শিহরণ জাগে।’
এই ভাষণ হাজার বছর পরেও পুরনো হবে না। যুগ যুগ ধরে এই ভাষণ বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষকে শক্তি ও সাহস জুগিয়ে যাবে। প্রতিটি মানুষের শিরায় শিরায়, রক্তে রক্তে এটা গেঁথে ছিল। আর এটা প্রতিনিয়ত সব বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
ভাষণ নিয়ে অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে ২১ বছর এই ভাষণ আওয়ামী লীগকে নিঃসন্দেহে টিকিয়ে রেখেছে বলা যায়। পঁচাত্তরের পরে ইতিহাস বিকৃত শুরু হয়। মূলত বাংলাদেশ পেছনের দিকে যাত্রা করতে শুরু করে। ফলে ৭ মার্চ, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর স্মরণীয় এসব দিন ভুলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক এই শিক্ষক বলেন, ‘আমার যতটুকু মনে পড়ে, ৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা সভা পালন করতে শুরু করে আওয়ামী লীগ ১৯৯৪ বা ১৯৯৫ সালে। ওই সময়ে এ ধরনের একটি আয়োজনে আমিও বক্তব্য রেখেছি।’ ওই অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাকে বারণও করেন বলে জানান তিনি। ড. ইমিতয়াজ বলেন, তখন এই ছিল অবস্থা।