দেশ রূপান্তরের শেরপুর নকলা সংবাদদাতা শফিউজ্জামান রানাকে ৫ মার্চ ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা দেয়। ৬ দিন পার হলেও মেলেনি সাজার নথি। ফলে এখন পর্যন্ত আপিল করতে পারেনি রানা কিংবা তার পরিবার। এদিকে ওই ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করতে গতকাল রবিবার শেরপুর জেলা কারাগার, রানার পরিবার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান তথ্য কমিশনার মো. শহিদুল আলম ঝিনুক। তথ্য কমিশনার ইউএনও কার্যালয়ে গেলে অফিসার্স ক্লাব ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির ব্যানারে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস ফেলে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন।
এর আগে সকাল থেকেই উপজেলা চত্বরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা জড়ো হতে থাকেন।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে কারাফটকে সাংবাদিক রানার সঙ্গে দেখা করে ২ ঘণ্টাব্যাপী দেওয়া রানার বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেন তথ্য কমিশনার। এরপর তিনি নকলা পৌর শহরের কূর্শা বাদা গৌড় এলাকায় রানার বাসায় গিয়ে তার স্ত্রী বন্যা আক্তার ও ছেলে মাহিমের সঙ্গে দেখা করেন এবং ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে তাদের বক্তব্য নেন। তথ্য কমিশনার বন্যা আক্তারের কাছ থেকে তথ্য অধিকার আইনে ইতিপূর্বে সাংবাদিক রানার করা আবেদনের দুটি কপি সংগ্রহ করেন। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তিনি ইউএনওর কার্যালয়ে যান। সেখানে ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন, তার গোপনীয় সহকারী (সিএ) শিলা আক্তারের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা কথা বলেন। সন্ধ্যায় তিনি ইউএনওর কক্ষ থেকে বের হলে ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেওয়া ইউএনও কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্য ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তাকে ঘিরে ধরেন। এ সময় তারা সাংবাদিক রানা সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন এবং তার সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু তথ্য কমিশনার তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
ইউএনও কার্যালয়ের ওই প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেন নকলা উপজেলা সরকারি কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল, সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম।
এর আগে রানার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা তথ্য কমিশনারের কাছে তদন্ত সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তথ্য কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি সাংবাদিক রানার পরিবারের অভিযোগের বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য শেরপুরে এসেছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং তথ্য সংগ্রহ করছেন। অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন করে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যপত্র কমিশনে দাখিল করবেন। তথ্য চাইতে গিয়ে ওই দিন রানার সঙ্গে এ ঘটনা ঘটেছে কি না, তিনি শুধু এটা তদন্ত করতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘ওই দিন কী হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে এসেছি। লিগ্যাল প্রসিডিং কী হচ্ছে, সেটি আমাদের বিষয় নয়। আমি শুধু জানতে এসেছি তথ্য চাইতে গিয়ে আসলে কী হয়েছে।’
রানার পরিবার সাজার নথি পাচ্ছে না, আপিলও করতে পারছে না এ বিষয়ে কমিশনের কোনো ভূমিকা আছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি বিচারিক বিষয়। তাই এ নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
রানার সাজার আদেশের অনুলিপি ও আপিল করতে গতকাল সকাল ৯টায় শেরপুর জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে আসেন রানার স্ত্রী বন্যা আক্তার। এ সময় রানার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য ছিলেন। তবে দিনভর কার্যালয়ে ধরনা দিলেও আদেশের অনুলিপি তিনি পাননি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা প্রশাসককে বিষয়টি অবহিত করা হলে তিনি (জেলা প্রশাসক) সাংবাদিকদের বলেন, নকলা ইউএনওকে সাজার আদেশের অনুলিপি দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ইউএনও বলেন, সাজার নথি পাঠানো হয়েছে। এ খবর শুনে আইনজীবী ও রানার পরিবারের সদস্যরা আপিলের প্রস্তুতি শুরু করেন। তবে সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও নথি আসেনি। এ বিষয়ে জানতে পৌনে ২টার দিকে কয়েকজন সাংবাদিক জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আইনের বিধান অনুযায়ী তিনি (রানা) সব রকমের আইনি সুবিধা পাবেন। আপিলের জন্য সাজার নথি কেন দেওয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন তথ্য কমিশনার বিষয়টি অনুসন্ধানে এসেছেন। তাই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।’
তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ঝিনুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার সাজার নথির সঙ্গে আমাদের অনুসন্ধানের কোনো সম্পর্ক নেই।’
জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে নকলার ইউএনও স্থানীয় এক সাংবাদিককে মোবাইল ফোনে বলেন, জেলা প্রশাসক অনুমতি দিলে তিনি নথি দেবেন। তবে, জেলা প্রশাসক এ সময় সাংবাদিকদের বলেন, এই নথির জন্য তার অনুমতির প্রয়োজন নেই। এমন অবস্থা চলার পর হতাশ হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ত্যাগ করেন রানার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা। বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয়, সাজার নথি তলবে ইউএনওর কার্যালয়ে আদেশনামা (ফরোয়ার্ডিং) রানার পক্ষের কাউকে দিয়ে আসতে হবে। কিছুক্ষণ পর জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে জানানো হয়, তারা আদেশনামা নকলা ইউএনও কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন। তবে নথি কবে নাগদ পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে তারা কিছু বলেননি।
এদিকে সাজার নথি পেতে রানার পরিবারের পক্ষে করা আবেদনে কপি ঘষামাজা করে নথি পাওয়ার তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৭ মার্চ রানার পরিবারের পক্ষে রানাকে সাজা দেওয়া নকলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিহাবুল আরিফ বরাবর আবেদন করা হয়। আবেদনটি গ্রহণ করে নথি প্রাপ্তির তারিখ লেখা হয় ১০ মার্চ। তবে ১০ মার্চকে কাটাছেঁড়া করে ২০ মার্চ করা হয়।
প্রসঙ্গত, ৫ মার্চ দেশ রূপান্তরের নকলা উপজেলা সংবাদদাতা শফিউজ্জামান রানা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র চাওয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া উম্মুল বানিনের নির্দেশে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিহাবুল আরিফ ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাংবাদিক শফিউজ্জামান রানাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠান।