রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে গত বছরের ১১ মার্চ এলাকাবাসীর সঙ্গে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয় শিক্ষার্থীদের। ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কয়েক মাস পর জমা পড়লেও আজও তা প্রকাশ পায়নি। প্রতিবেদনটি রেজিস্ট্রার দপ্তর হয়ে উপাচার্য দপ্তর পর্যন্ত গেছে। কিন্তু উপাচার্যের দপ্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সিন্ডিকেট পর্যন্ত আর পৌঁছায়নি। এমনকি এখন ওই প্রতিবেদনের ফাইল কোথায় আছে, সেটাও অবগত নন বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। ফলে একদিকে যেমন আলোর মুখ দেখেনি প্রতিবেদন, অন্যদিকে এত বড় ঘটনা ঘটিয়েও পার পেয়ে গেছে জড়িতরা।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য কমিটি গঠন করা হয় না। মূলত কোনো বড় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন স্তিমিত করতেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি সত্য উদঘাটন নয়, সত্য ধামাচাপা দেওয়ার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনটি চলতে থাকলে অপরাধীরা অপরাধ কর্মকাণ্ড আরও বেশি বেশি করবে।
গত বছরের ১১ মার্চ সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে একটি বাসের সুপারভাইজারের কথা-কাটাকাটির জেরে বিনোদপুর বাজারে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। হামলা-সংঘর্ষ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেলে আহত হন দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। এ সময় একটি পুলিশ বক্স ও রাস্তার পাশের অন্তত ৩০টি দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ১২ মার্চ সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা চারুকলাসংলগ্ন রেললাইন ও ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অগ্নিসংযোগ করে সড়ক অবরোধ করেন। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ ও রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করে তিনটি মামলা করে।
সংঘর্ষের দুদিন পর ১৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হুমায়ুন কবীরকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। কমিটিকে ওই দিন থেকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তবে দুই মাসের বেশি সময় পর রেজিস্ট্রার দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। পরে সেটি উপাচার্যের দপ্তরে হস্তান্তর করেন সাবেক রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম। কিন্তু প্রতিবেদন জমা হওয়ার ১০ মাস পরও সেটি সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপিত হয়নি। জানা যায়নি প্রতিবেদনে কী আছে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর বলেন, তারা ঘটনা তদন্ত করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। পরে সেটি রেজিস্ট্রার দপ্তরে জমা দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, তদন্ত কমিটি তার কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। তিনি সেটি উপাচার্য দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপিত হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপিত না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সবকিছু সিন্ডিকেটে যায় না। ফাইল কোথায় আছে, আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। দেখতে হবে আমার দপ্তরে আছে কি না।’
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানিয়েছেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় উপাচার্য হয়তো তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে চাননি।
গত বছর ঘটনার সপ্তাহখানেক পর একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসে ওই সংঘর্ষের নেপথ্যের কাহিনি। জানা যায়, রাবি শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন কমিটির অন্তঃকোন্দল, নেতাদের মধ্যে বিভাজন এবং নিয়োগ-বাণিজ্যের জন্য নেওয়া অর্থ চাকরিবঞ্চিতদের ফেরত না দেওয়ার ক্ষোভ থেকেই তুচ্ছ ঘটনা প্রকাণ্ড আকার ধারণ করে।
ওই অনুসন্ধানে জানা যায়, বাসের সুপারভাইজারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ঝামেলার মধ্য দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত হলেও সংঘর্ষ বৃহৎ আকার ধারণ করে রাবি শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি গোলাম কিবরিয়াকে ধাওয়া করার মাধ্যমে। সংঘর্ষের সময় তার পাশে ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, অন্যদিকে বিনোদপুর এলাকার ব্যবসায়ীদের পক্ষে ছিল স্থানীয় যুবলীগ ও মহানগর ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। রাবি ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, স্থানীয় অনেকের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার নামে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে চাকরি দেননি। পরে সেই টাকাও ফেরত দেননি। সেই ক্ষোভ থেকেই গোলাম কিবরিয়াকে ধাওয়া করেন চাকরিবঞ্চিতরা। যদিও সেই অভিযোগ বানোয়াট বলে দাবি করেন গোলাম কিবরিয়া।
তদন্তে ছাত্রলীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। এ বিষয়ে নাগরিক ছাত্র ঐক্যের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মেহেদী হাসান মুন্না বলেন, ‘এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলির পাঁঠা হয়েছেন। ঘটনা মূলত ছাত্রলীগের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। আর তদন্তে হয়তো ঘটনার মূলে ছাত্রলীগ নেতাদের নাম এসেছে। কিন্তু প্রশাসন যেহেতু ছাত্রলীগকে পৃষ্ঠপোশকতা করে, তাই তারা হয়তো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে প্রতিবেদনও আর আলোর মুখ দেখেনি।’
সত্য ধামাচাপা ও আন্দোলন স্তিমিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বলে অভিযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নামমাত্র তদন্ত কমিটি গঠন করে। আর তদন্ত কমিটি একটা দায়সারা রিপোর্ট জমা দেয়। কমিটি গঠন করা হয় যাতে সত্য উন্মোচিত হয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। কিন্তু বর্তমানে সেটি হয়ে দাঁড়িয়েছে সত্য ধামাচাপা দেওয়া ও আন্দোলন স্তিমিত করার মাধ্যম।’
একই ধরনের মন্তব্য করেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকিব। তিনি বলেন, ‘এটিই একমাত্র ঘটনা নয়। এ রকম আরও অনেক ঘটনা আছে, যেগুলোর প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি। এসব তদন্ত কমিটি বর্তমানে রীতিতে পরিণত হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয় না।’
এ প্রসঙ্গে নাট্যজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, ‘যখন কোনো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সবার মধ্যে রাগ, ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ফলে বিষয়টি আপাতত থেমে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে। এভাবে অসংখ্য তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। আমি ৩০ বছর ধরে একই অবস্থা দেখে আসছি। কেউ কখনো প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য কথা বলে না, রাস্তায় দাঁড়ায় না। অন্যায় হলে যদি শাস্তি না হয় তাহলে অন্যায় প্রশ্রয় পেয়ে যায়।’