মুসলিমদের আপত্তি উপেক্ষা ভারতে নাগরিকত্ব আইন চালু 

ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ভোটের আগে দেশব্যাপী চালু হলো ‘বিতর্কিত’ সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)। চার বছর আগে বিলটি পাস হওয়ার পর গতকাল সোমবার আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার সিএএ কার্যকরের কথা ঘোষণা করল। কয়েক মাস ধরে বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতারা আইনটি কার্যকরের কথা জানিয়ে আসছিলেন। ২০১৯ সালে এ-সংক্রান্ত বিল পাসের পরই ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশের মানুষ বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের শঙ্কা, এই আইনের মাধ্যমে বিজেপি সরকার মুসলিমদের নাগরিকত্বহারা করবে।  

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরই সিএএ পাস করে নরেন্দ্র মোদির সরকার। এ-সংক্রান্ত বিল লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস হওয়ার পর দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতা হয়। আইনসভায় দুই কক্ষে বিল পাস হওয়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এতে সই করেন। তবে রাষ্ট্রপতির সইয়ের পরও বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি। এবার তা-ও জারি হলো।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছিলেন, ‘লোকসভা নির্বাচনের আগেই দেশে সিএএ কার্যকর হবে।’

সিএএ আইনে বলা রয়েছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে শরণার্থী হয়ে এলে তারা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন। ওই দেশগুলোর হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি সিএএর বিধানে উল্লেখ রয়েছে।

ভারতের বামপন্থি রাজনৈতিক দল এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল রাজনীতিক মহল আপত্তি করছে; কারণ তারা মনে করছে, এর মাধ্যমে বিজেপি মুসলিমদের কোণঠাসা করতে চাইছে। মুসলমানরা মনে করছে, আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ  (এনআরসি) কার্যকরের মধ্য দিয়ে যেভাবে সেখানকার বহু মুসলিমকে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে, সেভাবে পুরো ভারতে মুসলিমদের কোণঠাসা করবে সিএএ। ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করতে জমিজমার কাগজপত্র দেখানোর শর্তসহ নানা নিয়মকানুন বেঁধে দিয়ে মুসলিমদের হয়রানি করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মোটকথা, মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষ মনে করছে, এই আইন তাদের দেশহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে পারে। 

এ আইন নিয়ে বিজেপির সমালোচকরা বলছেন, ছয়টি ধর্মের সংখ্যালঘুদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও মুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা নেই। আবার মুসলিমদের পাশাপাশি সিএএ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল উত্তর-পূর্ব ভারতে। সেখানকার বাসিন্দারা মনে করছে, সিএএ কার্যকর হলে শরণার্থীদের ব্যাপক ভিড় বৃদ্ধি পাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে।

সিএএ নিয়ে ভারতে যেসব জনগোষ্ঠীর মানুষের আগ্রহ সর্বোচ্চ তাদের অন্যতম হলো মতুয়া সম্প্রদায়। যেসব মতুয়া বাংলাদেশের ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, যশোরসহ আরও নানা জায়গা থেকে নানা সময়ে দেশান্তরি হয়ে ভারতে গিয়েছেন; তারা এ আইনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন বলে বিশ্বাস করেন। এ নিয়ে সোচ্চার দেখা গেছে সারা ভারত মতুয়া মহাসংঘের নেতা শান্তনু ঠাকুর যিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ লোকসভার এমপি এবং কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী। মতুয়াদের বড় অংশ বাস করেন পশ্চিমবঙ্গে। মতুয়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে দুই শতক ধরে ভারত-বাংলাদেশে আন্দোলন করেছেন শান্তনুর পূর্বপুরুষরা।

কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গে একটি জনসভায় শান্তনুও ইঙ্গিত দেন, ‘ভোটের আগে সিএএ কার্যকর হচ্ছেই। ভোট ঘোষণার এক-দুদিন বা তিন দিন আগে হলেও সিএএ কার্যকর হবে।’

সিএএবিরোধী প্রতিবাদ-বিক্ষোভে দেশজুড়ে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, আসামের মতো বেশ কিছু রাজ্যে সহিংসতা হয়।

বিজেপিবিরোধী দলগুলোর শাসনে থাকা রাজ্যগুলোতে সিএএ কার্যকর না করার জন্য জানানো হয়েছে। কেরালা, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খ-সহ আরও কয়েকটি রাজ্য জানিয়েছে, তারা সিএএ কার্যকর করবে না। এ নিয়ে গতকাল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন এলে কিছু একটা খাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ওরা। আমার কথা হলো, ২০২০ সালে সিএএ পাস হয়েছিল। তারপর চার বছর লেগে গেল! আজ নির্বাচনের দু-তিন দিন আগে সিএএ চালু করার প্রয়োজন হলো? আসলে এটা রাজনৈতিক পরিকল্পনা।’