সাদী’দা এটা কীসের প্রতিবাদ?

না ফেরার দেশে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সাদী মহম্মদ।এই গুণী শিল্পীর এভাবে চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে

নিতে পারছেন না তার শুভাকাক্সক্ষী থেকে বন্ধুরা। শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়ে সাদী মহম্মদের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী লিলি ইসলামের। গত বছরের শেষ দিকেও একসঙ্গে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সাদী মহম্মদকে নিয়ে বলছেন লিলি ইসলাম

আমি শান্তিনিকেতনে যাই ১৯৮১ সালে। তখন সাদী’দা ফাইনাল দিচ্ছেন। সে সময়ই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। আমার মনে আছে, প্রথম পরিচয়েই সাদী’দাকে জেনেছি, অনেক আন্তরিক। তখন তো শান্তিনিকেতনে খুব বেশি মানুষ যেত না, ফলে যে কজন আমরা এখান থেকে যেতাম, আমরা সবাই সবাইকে চিনতাম। সাদী’দাকে সেখানে আমি পেয়েছিলাম এক বছর। এরপর যোগাযোগটা আরও বেড়ে গিয়েছিল ঢাকায় এসে। তো ওই এক বছরে সাদীদার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। পরে তাদের পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। সাদী’দা বলতেন, ‘শোন তোর যখনই মন খারাপ হবে চলে আসবি আমাদের বাসায়। এই বাসাটা তোর নিজের বাসা মনে করবি।’

ধীরে ধীরে সাদী’দার পুরো পরিবারের সঙ্গে মিশে গেলাম। উনাদের পরিবারের মানুষজন এত আপন। আর ওই পরিবারে বা ওই বাসায় গেলে মনে হয় একটা প্রাণ আছে। সাদী’দাও পুরো মা-কেন্দ্রিক, মায়ের ওপর ভীষণ নির্ভরশীল। আবার অন্যদিকে তার বোনের ছেলেমেয়েরাও মামা অন্তপ্রাণ। ওই বাসায় গেলেই দেখতে পেতাম সবাই মামা মামা করছে। করছে সাদী’দাকে ভীষণ ভালোবাসে সবাই। শুধু তার বাসার লোক না। সারা দেশের অজস্র মানুষ সাদী’দাকে ভালোবাসে। ভীষণ ভালোবাসে। সাদী’দার মধ্যে অদ্ভুত এক সম্মোহনী ক্ষমতা রয়েছে। যেটা যে কাউকে সহজেই আকর্ষণ করে নেয়। তিনি মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। অথচ এই মানুষটা চলে গেলেন। এইভাবে কেন গেলেন কাল থেকে ভাবছি। তিনি কি কোনো অভিমানে চলে গেলেন? নাকি কোনো প্রতিবাদে? কীসের প্রতিবাদ করলেন? তিনি একবারও ভাবলেন না নিজেকে নিয়ে। তাকে যারা ভালোবাসত, তাদের কথাও ভাবলেন না?

গত অক্টোবরে আমন্ত্রণ পেলাম, শান্তিনিকেতনে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশত বার্ষিকী হবে। আমন্ত্রণ পেয়েছি আমরা তিনজন। বন্যা আপা, সাদী’দা আর আমি। আমি আর বন্যা আপা তো যাবই। কিন্তু সাদী’দা যাবেন না। তার পায়ে হাঁটু পরিবর্তন করা হয়েছে। বললাম, ‘সাদী’দা তোমাকে যেতেই হবে।’ বললেন, ‘আমি কীভাবে যাব, আমি তো হাঁটতেই পারছি না।’ আমি বললাম, ‘আমি তোমাকে নিয়ে যাব। তোমাকে হাঁটতে হবে না। বিমানবন্দরে আমি হুইল চেয়ারে নিয়ে যাব।’ সাদী’দা অবশেষে আমাদের সঙ্গে গেলেন। আমরা অনেক আনন্দ করলাম। শান্তিনিকেতনের পাশে সোনাইঝুড়ি হাটে গেলাম। সাদী’দা অনেক কিছু কিনলেন। বললেন, ‘আচ্ছা লিলি বলতো এই ফতুয়াটা কেমন লাগবে শিবলীকে? আচ্ছা লিলি বলতো এটা কেমন লাগবে ওর জন্য, এটা কেমন লাগবে?’ কত কিছু যে সাদী’দা কিনল। ওই যে বললাম তিনি ভীষণ ভালোবাসেন পরিবারের লোকজনদের।

সাদী’দার এই চলে যাওয়া কোনোভাবেই মানতে পারছে না। মানতে পারছে না শান্তিনিকেতন। আমরা যখন শান্তিনিকেতনে গেলাম, তখন খবর পেয়ে তার এক বন্ধু দুর্গাপুর থেকে চলে এলেন। সেখানে তিনি মেয়র। কত ব্যস্ত। কিন্তু সাদী’দাকে ভীষণ ভালোবাসেন। তিনি সব ব্যস্ততা ফেলে চলে এলেন। আমরা সারা দিনরাত আনন্দ করলাম।

সাদী’দাকে অনেকেই ভালোবাসে- এটা যেমন ধ্রুব সত্য তেমনি তাকে অনেকেই আঘাত করেছে এটাও সত্য। তবে সাদী’দার মন ভীষণ নরম, শিশুদের মতো। তিনি সহজেই সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন। ভুলে যেতেন। সাদী’দা অনেক কথাই শেয়ার করতেন। হৃদয়ে আঘাত পেলেও বলতেন। আমি জানতাম। আবার সেই ভীষণ ক্ষমতাও দেখতাম।

সকালে (বৃহস্পতিবার) চ্যানেল আইতে সাদী’দার স্মৃতিচারণে গান গাইলাম আমি ও ফাহিম হোসেন চৌধুরী। ফাহিম দুইটি গান গেয়ে বললেন এ দুটো সাদী ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছেন তিনি। সাদী ভাইয়ের কাছ থেকে এ দেশের অনেকেই গান শিখেছেন। ফাহিম কী সুন্দর করে বললেন। বললেন, আমি সাদী ভাইয়ের কাছে গিয়েছি, তাকে বলেছিলাম গান শিখব, এ দুটো গান আমাকে শিখিয়ে দিলেন। সাদী’দা সবার জন্য

ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। এমন বড় হৃদয়ের মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। সেই সাদী’দা কী এমন অভিমানে চলে গেলেন, আমি জানি না।