দেশে নারী ফুটবলের উল্লম্ফনের শুরুর দিকে যোদ্ধা ছিলেন রাজিয়া খাতুন। মারিয়া মান্দা, মাসুরা, রতœা, স্বপ্নাদের মতোই বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছিল সাতক্ষীরার মেয়েটির চোখে। নিজেকে প্রমাণ করে সিনিয়র জাতীয় দলেও সুযোগ পেয়েছিলেন। যদিও ২০১৮ সালের নেপালের সাফ দলে থাকলেও খেলার সুযোগ পাননি। তবে খেলেছিলেন সে বছর ভুটানে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপে। বাংলাদেশের শিরোপা জয়েও রেখেছিলেন অবদান। তবে একটা সময় পড়তি ফর্মের কারণে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়তে হয়েছিল। ফুটবলের সূত্রেই পরিচয় হয়েছিল ফুটবলার ইয়াম রহমানের সঙ্গে। সেখান থেকে দুহাত এক হয়েছিল তাদের। বিয়ের পাঁচ বছর পর বৃহস্পতিবার রাতে সাতক্ষীরার সন্তান জন্ম দিয়ে নিজেই চলে গেলেন ফুটবলার রাজিয়া গ্রামের বাড়িতে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন রাজিয়া। সন্তান ভূমিষ্ঠের পর থেকেই শরীর ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ভোরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রাজিয়া। উচ্ছল রাজিয়ার মৃত্যুতে ফুটবলাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
সংসারের দায়িত্ব নিতে বিয়ের পরপরই খেলা ছাড়তে হয়েছিল ইয়ামকে। গাজীপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তিনি। প্রিয়তম স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন না ইয়াম। তিনি খেলা ছাড়লেও ফুটবলটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন রাজিয়া। গত বছরও নারী লিগে কাচারিপাড়ার হয়ে খেলেছেন। ঘরোয়া ফুটবলটা সন্তান প্রসবের পরও চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। তবে অমোঘ পরিণতি মেনে নিতে হয়েছে তাকে। স্ত্রীর মৃত্যুতে দিশেহারা ইয়াম বলেন, ‘এভাবে রাজিয়া চলে যাবে তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। রাতেই ছেলে হওয়ার সুসংবাদ পেলাম। ভোরে রাজিয়ার অবস্থা খারাপ হবে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, তা কে ভেবেছিল।’ মা হারা একদিন বয়সী পুত্রসন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা বললেন ইয়াম, ‘আমার বাবা-মা এসেছে এখানে। তারাই আমার বাচ্চাকে দেখবেন। তবে মা ছাড়া কীভাবে সবকিছু হবে বুঝতে পারছি না।’ গ্রামের বাড়িতে সন্তান প্রসব ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও রাজিয়ার পরিবার তাকে হাসপাতালে নেয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ ঝরেছে ইয়ামের কণ্ঠে, ‘ওর পেইন (প্রসব যন্ত্রণা) ওঠার পর ওকে বাসায় রেখে সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাকে রাত ১১টার সময় জানায় ছেলে ও মা সুস্থ আছে। কিন্তু পরে ওর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। অচেতন হয়ে ছিল অনেক সময়। পরে ভোরবেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছে। আমি আগেই হাসপাতালে নিতে বলেছিলাম, কিন্তু নেয়নি।’
সাতক্ষীরার তৃণমূলের কোচ প্রয়াত আকবর আলীর হাতেই ফুটবলের হাতেখড়ি পেয়েছিলেন রাজিয়া। জাতীয় দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনেরও কিশোরবেলার কোচ ছিলেন আকবর আলী। নিজ জেলার ফুটবলার হওয়ার সুবাদে সাবিনাও রাজিয়াকে অনেক স্নেহ করতেন। জুনিয়র সতীর্থের এমন মৃত্যুতে ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন সাবিনা, ‘ও আমার কোচ আকবর স্যারের ছাত্রী ছিল। ক্যাম্পে ও খুব প্রাণবন্ত থাকত। যতদিন ছিল কারও সঙ্গে কখনো ঝগড়া করতে দেখিনি। অনেক স্নেহ করতাম ওকে। পারফরম্যান্স পড়তির কারণে ক্যাম্পে বাদ পড়লেও খেলাটা চালিয়ে যাচ্ছিল। ওর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।’ রাজিয়ার জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলতে বড় ভূমিকা ছিল নারী দলের সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের। শিষ্যের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ তিনিও, ‘মেয়েটা অনেক ভালো ছিল। ডিসিপ্লিনড ছিল। ওদের হাত ধরেই তো নারী ফুটবলের উন্নতির শুরু হয়। আমি অবাক হই ২০২৪ সালে এসেও একটা মেয়ের কেন নিজ গ্রামের বাড়িতে সন্তান প্রসব করাতে হবে। আগেই ওকে হাসপাতালে নিলে হয়তো ওকে আমরা হারাতাম না।’