সোমালিয়ান জলদস্যুদের ‘ডেরায়’ নিয়ে যাওয়া হয়েছে জিম্মি করা ‘এমভি আবদুল্লাহ’ নামের বাংলাদেশি জাহাজটি। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল পূর্বে ভারত মহাসাগর থেকে গত মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে ২৩ জন নাবিকসহ জিম্মি করা হয় জাহাজটি। গতকাল দুপুর ১২টায় সোমালিয়ার গ্যারাকাদ উপকূল থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নোঙর করে এবং সেখানেই আছে জাহাজটি।
তবে জলদস্যুদের পক্ষ থেকে এখনো যোগাযোগ না করায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম খুঁজে পায়নি জাহাজ মালিক কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এমভি আবদুল্লাহ নামের জাহাজটির মালিক প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিং লিমিটেড। এটি কবির গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি জাহাজ ‘এমভি জাহান মনি’ ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আরব সাগরে সোমালীয় জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল।
‘এমভি জাহান মনি’ জাহাজটিকেও জলদস্যুরা জিম্মি করার পর একই স্থানে নিয়ে যাওয়া গিয়েছিল বলে জানান বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমালিয়ান জলদস্যুদের একটি স্ট্র্যাটেজি (কৌশল) হলো তারা জাহাজ আটকের পর নিজেদের আস্তানায় নিয়ে যায়। আর এতে এক থেকে দুদিন সময় লাগে। গতকাল দুপুরে তারা জাহাজটিকে নিয়ে গ্যারাকাদ উপকূলে নিয়ে গেছে। এখন তারা কয়েক দিন বিশ্রাম নেবে। আর এরপর জাহাজ মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করবে।’
জাহাজ মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আটককৃত জাহাজের নাবিকদের মাধ্যমে তাদের পরিবার-পরিজন ও মালিক কর্তৃপক্ষের কাছে মুক্তিপণের বিষয়ে বার্তা পাঠাবে জলদস্যুরা। আর তখনই শুরু হবে দরকষাকষি বা নেগোসিয়েশন।’
কিন্তু নাবিকদের কাছ থেকে ইতিমধ্যে সব মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হলেও যোগাযোগের সময় তাদের মোবাইল দেওয়া হবে।’ এ বিষয়ে কথা হয় ২০১০ সালে এমভি জাহান মনিতে ১০০ দিন আটক থাকা তখনকার সময়ের ডেক ক্যাডেট ও বর্তমানে অন্য একটি বাণিজ্যিক জাহাজের চিফ অফিসের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ শরীফুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সোমালিয়ান জলদস্যুদের কয়েকটি গ্রুপ থাকে। একটি গ্রুপ জাহাজ আটক করে নিরাপদে উপকূলে তাদের আস্তানায় নিয়ে আসে। আস্তানায় নিয়ে আসার পর অন্য একটি গ্রুপ মুক্তিপণ আদায়ের বিষয়ে কৌশল নির্ধারণ করে এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। আর এ যোগাযোগ সেখানে জিম্মি থাকা নাবিকদের মাধ্যমে হয়ে থাকে।’
কোন প্রক্রিয়ায় তারা অর্থ নিয়ে থাকে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দরকষাকষির বিভিন্ন পর্যায়ে তারা জিম্মিকৃত নাবিকদের ভয়ভীতি দেখায়। আর এসব ভয়ভীতি দরকষাকষির একটি প্রক্রিয়া। আর তারা সব টাকা নগদে নিয়ে থাকে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘উপকূলে তাদের আস্তানার কাছে নির্ধারিত জায়গায় কম উচ্চতা দিয়ে যাওয়া হেলিকপ্টারে করে টাকা পৌঁছে দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী কেউ যুক্তও থাকে অনেক সময়। তবে তারা টাকা না পেলে কখনো জাহাজ ও নাবিকদের ছাড়বে না।’
জাহাজটির মালিকপক্ষ কেএসআরএমের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম জানান, গতকাল সকাল ৮টায় আটককৃত নাবিকদের একজনের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। নাবিকরা একটি মোবাইল লুকিয়ে রেখেছিল। সেই মোবাইল দিয়ে কথা বলেছেন।
কী কথা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সোমালিয়ান দস্যুরা নাবিকদের সবাইকে নামাজ, রোজা ও ইফতারে সহায়তা করছে। নাবিকদের সবাই ভালো আছে। তাদের ওপর কোনো নির্যাতন করছে না। আর জাহাজটি তখন উপকূলের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।’ তিনি জানান, তারা একাধিক সোর্স দিয়ে জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। তবে তাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। তারা যোগাযোগ করলে বিষয়টি সহজ হবে।
সাড়া পেলেই উদ্ধার কার্যক্রম : জিম্মি নাবিক ও জাহাজ উদ্ধার প্রক্রিয়া একটি সময়সাপেক্ষ বিষয় বলে জানান নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কমোডর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম। তিনি বলেন, ‘সোমালিয়ান জলদস্যুদের কাছ থেকে আমাদের নাবিক ও জাহাজ উদ্ধারের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি মাধ্যমে আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করছি। তবে দস্যুদের কাছ থেকে সাড়া না পেলে তা কঠিন হবে। আর দস্যুরা প্রথম দিকে একটু সময় নিয়ে থাকে। এখানেও তা হবে বলে আমরা মনে করছি।’
এই সাড়া তারা কীভাবে দেবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দস্যুরা নাবিকদের চাপ দেবে। আর তখন নাবিকরা তাদের পরিবার-পরিজন ও মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।’
‘এমভি আবদুল্লাহ’ মোজাম্বিক থেকে ৫০ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। আর যাওয়া পথে গত মঙ্গলবার জলদস্যুদের কবলে পড়ে জাহাজটি। এ রুটে আরও জাহাজ চলাচল করলেও দস্যুরা এ জাহাজটিকে টার্গেট করে। এত জাহাজের ভিড়ে এ জাহাজের টার্গেটের পেছনে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘চিতা যখন অনেক প্রাণীর ভিড়ে আক্রমণ করে তখন সেখান থেকে একটি কম গতির ল্যাংড়া প্রাণীকে টার্গেট করে। এখন এই জাহাজটির যেমন সশস্ত্র প্রটেকশন ছিল না, গতিও কম ছিল, জাহাজটি লোডেড ছিল তাই তারা এ জাহাজকে টার্গেট করে এবং সফলও হয়।’
সব জাহাজে অস্ত্রধারী গার্ড রাখার নির্দেশনা : নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে অবশ্যই অস্ত্রধারী পাহারাদার নিতে হবে। ইতিমধ্যে মেঘনা গ্রুপের জাহাজে তা নিশ্চিত করা হয়েছে।’
এদিকে অস্ত্রধারী পাহারাদার নিয়োগ প্রসঙ্গে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম বলেন, ‘জাহাজে অস্ত্রধারী পাহারাদার রাখার বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। আর অনুমোদন নেওয়ার পর যেকোনো আন্তর্জাতিক সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান থেকে পাহারাদার নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনেক জাহাজ মালিক তা নিচ্ছেনও। এটি মূলত জাহাজ মালিকের বিষয়।’