দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকাসহ সারা দেশে দায়ের হওয়া নাশকতার মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত করার নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। প্রায় দুই মাসে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘিরে যানবাহনে আগুন, ভাঙচুর, হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা মামলার সংখ্যা ১ হাজার ২৪১। এসব মামলা তদন্ত করে দ্রুত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিতে বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা কাজ করছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাইয়ের কাজও প্রায় গুছিয়ে আনা হয়েছে। আসামি শনাক্ত ও তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে। শিগগির অভিযোগপত্র দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, যারা নাশকতা মামলাগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত শুধু তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, দ্রুত মামলার তদন্ত শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা আশা করছেন, দুই-এক মাসের মধ্যই অভিযোগপত্র তৈরি করে আদালতে পাঠানো সম্ভব হবে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নাশকতা করে কেউ শাস্তি পাবে না তা হতে পারে না। সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। যেসব নাশকতার মামলা এখনো তদন্ত শেষ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে এক দফা দাবিতে গত বছর ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে বিএনপি মহাসমাবেশ ডাকে। ওই কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হন একজন পুলিশ সদস্য। সহিংসতায় যুবদলের এক নেতাও নিহত হন। ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। হামলা হয় প্রধান বিচারপতির বাসভবনে। এ ঘটনার পর বিএনপি ও সমমনা দলগুলো ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অবরোধ, হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচি ঘিরে আরও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। প্রাণহানি হয় কয়েকজনের।
সারা দেশে হওয়া নাশকতার মামলায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া, হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোসহ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে বেশির ভাগই বিএনপির নেতাকর্মী।
মহাসমাবেশের দিন সহিংসতার ঘটনায় রাজধানীতে ১১টি মামলা হয়। এসব মামলা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা আব্বাসসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া নাশকতার মামলায় সারা দেশে কয়েক হাজার বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়। বেশির ভাগ মামলার বাদীও পুলিশ। শীর্ষস্থানীয় নেতারাসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই ইতিমধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। যারা আত্মগোপনে ছিলেন তারাও জামিনের চেষ্টা করছেন।
বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, দলটিকে কোণঠাসা করতে এসব মামলা করা হয়েছে। এখন অভিযোগপত্র দিয়ে নেতা-কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও পুলিশের শীর্ষ কর্তারা বারবার বলে আসছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিএনপির নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। নাশতকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংসতার পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অবরোধ, হরতাল কর্মসূচি পালনকালে রাজশাহী বিভাগে নাশকতার মামলা রয়েছে ২৫৩টি। ওই সব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪ হাজার ৮৫৫ জনকে। তারা সবাই বিএনপির নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। চট্টগ্রামসহ আশপাশের জেলায় মামলা রয়েছে ২০৪টি, গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩ হাজার ২০৫ জনকে। কুমিল্লায় মামলা রয়েছে ১২১টি, গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৩১৯ জন। রংপুর বিভাগে মামলা রয়েছে ১৩৭টি, গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৮৯৩ জন। ফরিদপুরে মামলা রয়েছে ৩৭টি, গ্রেপ্তার হয়েছে ৭০৫ জন। ময়মনসিংহে মামলা রয়েছে ১১১টি, গ্রেপ্তার হয়েছে ২ হাজার ৩৮৪ জন। বরিশালে মামলা ৭৪টি আর গ্রেপ্তার ১ হাজার ৭৪৮ জন। খুলনায় মামলা ১৪১টি, গ্রেপ্তার ৩ হাজার ৫৭৫ জন। সিলেটে মামলা ১৫৫টি আর গ্রেপ্তার ১ হাজার ৩৭৯ জন। হবিগঞ্জে ২৫টি, সুনামগঞ্জে ২৩টি ও মৌলভীবাজারে ২০টি মামলা হয়েছে। ঢাকা মহানগর এলাকায় ২৩৪টি মামলা হয়েছে। ওই সব মামলায় বিএনপির শীর্ষ নেতা, থানা ও ওয়ার্ড নেতাদের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে ৫ হাজার ৮৬৮ জনকে। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ৩ হাজার ব্যক্তিকে। সর্বাধিক ২৬টি মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায়। তা ছাড়া পল্টন থানায় ২২টি, রমনায় ১২টি, পল্লবীতে ১১টি, মিরপুরে ১১টি, মতিঝিলে ১০টি ও ডেমরা থানায় ৮টি, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, শাহ আলী ও কাফরুল থানায় ৭টি করে মামলা হয়েছে। ৬টি করে শ্যামপুর, দারুসসালাম, হাতিরঝিল, ভাটারা ও ওয়ারী থানায়। ৫টি করে মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর, কদমতলী ও মুগদা থানায়। ৪টি করে ধানমন্ডি ও সবুজবাগে। ৩টি করে চকবাজার, বনানী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, বাড্ডা, হাজারীবাগ, উত্তরা পূর্ব, ভাষানটেক, রামপুরা ও গেন্ডারিয়া থানায়। দুটি করে মামলা লালবাগ, বংশাল, উত্তরা পশ্চিম, খিলক্ষেত, শাহবাগ, রূপনগর ও নিউমার্কেট থানায়। একটি করে মামলা হয়েছে কামরাঙ্গীরচর, গুলশান, উত্তরখান, আদাবর ও তুরাগ থানায়।
কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের আগে নাশকতার যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশনা পেয়েছেন তারা। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও গোয়েন্দা টিমের সদস্যরা কাজ করছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকাসহ সারা দেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। তাদের দাবি, ওই সময় জাতীয় নির্বাচন বানচাল করতে ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছে বিএনপি; বিশেষ করে ঢাকায় বেশি তান্ডব চালানো হয়েছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের হামলায় পুলিশের এক সদস্য মারা গেছেন। তা ছাড়া পুলিশ কর্মকর্তা, সদস্য ও একাধিক গণমাধ্যমকর্মী আহত হন। এখনো বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ওই কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও সরকারবিরোধীরা আন্দোলন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ নিয়ে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা আগাম সতর্কবার্তাও দিয়েছে। বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে কিছুদিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব ইউনিট প্রধান ও জেলার এসপিদের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে। বার্তায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পুলিশের মধ্যে কোনো সদস্যের সরকারবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার তথ্য পেলে জানাতে বলা হয়েছে।
বার্তায় পেশাদার সন্ত্রাসীসহ অন্যান্য অপরাধী গ্রেপ্তার, মাদক ও অনলাইন জুয়ার কারবারে সম্পৃক্ত পুলিশ সদস্য এবং পুলিশের সদস্যদের নৈতিক স্খলনের বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানোর নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি হেফাজত ও মাদ্রাসাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং গুজবের বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে আসা তথ্যে বিএনপিসহ সরকারবিরোধীরা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে জানানো হয়েছে। তারা সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কর্মকা- চালাতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।