ভারত মহাসাগর থেকে ছিনতাই হওয়া বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি নাবিকরা খাবারের সংকটে পড়তে যাচ্ছেন। কারণ জাহাজ ছিনতাইকারী সোমালিয়ান জলদস্যুরাও তাদের খাবারে ভাগ বসিয়েছে। ফলে দ্রুত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি ফুরিয়ে আসছে। নাবিকদের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর তাদের স্বজনদের কেউ কেউ এ নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া জাহাজে থাকা কয়লা নিয়েও ঝুঁকির কথা নাবিকরা তাদের স্বজনদের জানিয়েছেন।
এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে ২৩ জন নাবিক রয়েছেন। জলদস্যুদের কবলে পড়ার সময় জাহাজে ২৫ টন খাবার মজুদ ছিল। জাহাজটি গত মঙ্গলবার মোজাম্বিক থেকে দুবাই যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে। এরপর বৃহস্পতিবার সোমালিয়ার গারক্যাদ উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়। শুক্রবার উত্তর দিকে আরও ৭ কিলোমিটার সরিয়ে নেওয়া হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর জিম্মি জাহাজটিকে নজরে রেখেছে বলে জানা গেছে।
জাহাজের মালিকপক্ষ জানিয়েছে, জিম্মি নাবিকদের পাশাপাশি জলদস্যুরা জাহাজে থাকায় খাবার ও পানির চাহিদা বেড়েছে। এ নিয়ে তারা জলদস্যুদের সঙ্গে কথা বলার জন্য যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে খাবার ও পানি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
জাহাজে মাছ, মাংস, সবজি ও ফল, চাল, ডাল, বিস্কুট রাখা হয়। এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে যেতে যত দিন লাগে তার চেয়ে এক থেকে দুই সপ্তাহের বেশি খাবার মজুদ রাখা হয় বলে বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত নাবিকদের সূত্রে জানা গেছে। তবে দেরি হওয়া বা দুর্যোগের কারণে বিপর্যয় এসব বিবেচনা করে শুকনো খাবার বেশি দিনের জন্য রাখা হয়। জাহাজে রান্না, গোসল ও খাওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানি রাখা হয়। জাহাজভেদে দিনে ৩ থেকে ৫ টন পর্যন্ত পানি লাগে। জাহাজে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয় সাহায্যকারী জলযান ‘টাগবোটে’ করে।
এদিকে কয়লায় ঝুঁকি বাড়ছে এমভি আবদুল্লাহর। জাহাজটিতে ৫০ হাজার টন কয়লা রয়েছে। এসব কয়লা প্রতিদিন নিয়ম করে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেনের পরিমাণ যাচাই করা হয়। জানা গেছে, জাহাজের নিয়মিত কাজ করার অনুমতি দিয়েছে জলদস্যুরা। এই কাজের মধ্যে কয়লা রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও আছে।
জিম্মি এমভি আবদুল্লাহর চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খানের মা শাহানুর বেগম ছেলের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি গত শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে দেখা করেছেন। গতকাল দুপুরে নন্দনকানন তুলসীধাম এলাকায় তার বাসায় গিয়ে কথা হয় শাহানুর বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের ডানে ও বামে অস্ত্র নিয়ে পাহারায় রয়েছে। আর তাদের খাবারগুলো দস্যুরা খেয়ে শেষ করে ফেলছে তারা খাবে কী? তারা যে কয়লার জাহাজে থাকছে, সেই কয়লাও দাহ্য বস্তু। কোনো অঘটন ঘটে কি না, তা নিয়ে ভয়ের মধ্যে আছি।’
আতিক উল্লাহ খান মায়ের শঙ্কার সঙ্গে একমত পোষণ করেন কেএসআরএমের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের নাবিকদের চাহিদা অনুযায়ী খাবার ছিল। এখন এই খাবার দস্যুরা খেয়ে ফেলছে বলে হয়তো দ্রুত তা শেষ হয়ে যাবে। আমরা বিকল্প মাধ্যম খুঁজছি খাবার পাঠানোর জন্য কিন্তু এখনো কোনো মাধ্যম পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই খাবার শেষ হয়ে গেলে দস্যুরা নিজেদের প্রয়োজনেই খাবার সংগ্রহ করবে। দস্যুদের স্বার্থেই নাবিকদের বাঁচিয়ে রাখবে।’
কিন্তু কয়লাবাহী জাহাজটিকে মেইনটেন্যান্স করতে দেওয়া হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে নাবিকদের সর্বশেষ কথা হয়েছে গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে। জাহাজের ওয়ারলেস দিয়ে তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। তখন বলেছিল নাবিকদের সবাই সুস্থ আছে।’
কিন্তু জাহাজের মেইনটেন্যান্স কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে কি না এমন বিষয়ে সরাসরি নাবিকরা কিছু জানায়নি বলে তিনি জানান। তবে মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দস্যুদের নিজেদের লোকসান হবে। সেই সঙ্গে নাবিকদের জীবনও শঙ্কায় পড়তে পারে। তাই দস্যুদের নিজেদের স্বার্থেই জাহাজের মেইনটেন্যান্স কাজ করতে দেওয়ার কথা।
আবদুল্লাহ ঝুঁকিতে থাকার কথা জানিয়ে ১৪ বছর আগে এমভি জাহান মণিতে জিম্মি থাকা নাবিক মুহাম্মদ ইদ্রিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমালিয়ান জলদস্যুরা আমাদের সবাইকে জাহাজের ব্রিজে (জাহাজের ওপরে থাকা চালকের কক্ষ) এনে রাখত। তারা নাবিকদের ইঞ্জিনরুম বা ডেকে যাওয়ার সুযোগ দিত না। জাহান মণিতে লৌহ আকরিক ছিল বলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আবদুল্লাহতে কয়লা থাকায় একটু ঝুঁকি আছে।’ তিনি আরও বলেন, কয়লা একটি দাহ্য বস্তু। এই কয়লা প্রতিনিয়ত মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইড নির্গমন করে। এগুলো হ্যাজে নির্ধারিত মাত্রায় রয়েছে কি না, সে জন্য প্রতিদিন রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয় এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হয়।
প্রথম জীবনে নিজে কয়লাবাহী জাহাজে কাজ করেছেন জানিয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী নগরীর স্ট্যান্ডরোডে তার কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘জাহাজের ভেতরের হ্যাজে যে কয়লা থাকে, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে। আর এর প্রভাবে অক্সিজেনের মাত্রা কমে আসে। তখন তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন যদি নাবিকদের সঠিকভাবে কাজ করতে দেওয়া না হয়, তাহলে তো যেকোনো সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দস্যুরা যদি জাহাজের হ্যাজের ওপরে বসে সিগারেট টানে কিংবা স্টেনগান দিয়ে ফাঁকা গুলিও ছোড়ে, তাহলেও ঝুঁকি রয়েছে আবদুল্লাহর।’