অবন্তিকার আত্মহত্যা

সহকারী প্রক্টর ও সহপাঠী আটক উত্তপ্ত জবি

ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ও শিক্ষার্থীর সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকীকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার রাতে তাদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান। তিনি জানান, অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে ওই দুজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তারা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

এর আগে অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল রাতে কুমিল্লার কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। থানাটির ওসি ফিরোজ হোসেন জানান, অবন্তিকাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার মা তাহমিনা বেগম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। যাতে সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ও অবন্তিকার সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকীকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এ ঘটনার তদন্ত করে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে কমিশন।

অন্যদিকে অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জবি ক্যাম্পাস। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, অবন্তিকার মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, এটা হত্যাকাণ্ড। যৌন হয়রানিসহ বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন তিনি। মৃত্যুর আগে নিপীড়নের শিকার হওয়ার বিষয়ে প্রক্টর অফিসে সাত দফায় অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি অবন্তিকা।

ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকাকে তার বাবা অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিনের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে কুমিল্লা শহরতলির শাসনগাছা মহাজনবাড়ি এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে কুমিল্লা শহরের বাড়িতে আত্মহত্যা করেন জবির আইন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী অবন্তিকা। তিনি ওই ফেসবুক পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের নিপীড়নের অভিযোগ করেন। ওই পোস্টে সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে আম্মান সিদ্দিকীর পক্ষ নিয়ে তার সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগও করেন অবন্তিকা। আর তার মৃত্যুর জন্য ওই সহপাঠী ও সহকারী প্রক্টরকে দায়ী করেন।

অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল এক বিবৃতিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সম্প্রতি শিক্ষাঙ্গনে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানিসহ নৈতিক স্খলনের যেসব ঘটনা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, তা কমিশনকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। নারী শিক্ষার্থীরা প্রায়ই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হতে হবে এবং শিক্ষার্থীবান্ধব সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ তৈরির জন্য মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলতে পারে না।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে শিক্ষাঙ্গনে আমাদের নৈতিকতা ও শুদ্ধাচারের দিকে বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন। উন্নত মানসিকতা ও মূল্যবোধ বিকাশ ছাড়া শিক্ষাঙ্গন অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।’

অবন্তিকার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার রাতভর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করে। শিক্ষার্থীরা আগুন জ্বালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অবরোধ করে রাখেন। এ ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। শুক্রবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশে ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর প্রধান করা হয়েছে আইন অনুষদের ডিন ড. মাসুম বিল্লাহকে। এ ছাড়া অভিযুক্ত শিক্ষক দ্বীন ইসলামকে প্রক্টরিয়াল বডি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর শিক্ষার্থী আম্মান সিদ্দিকীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।’

অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। তিনি বলেন, ‘আমার হাতে যতটুকু আইন আছে, আমি সবটুকু প্রয়োগ করব, আর দ্বীন ইসলামকে এমনকি স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করে দেওয়া হবে। এমন মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়।’

অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় জবি ক্যাম্পাসের বাইরেও আন্দোলন ছড়িয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ও গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি।

অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় গতকালও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন তার সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। সমাবেশ শেষে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। দাবি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন তারা।

ছয়টি দাবি হলো ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত, অভিযুক্ত আম্মান সিদ্দিকী ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার, জরুরি সিন্ডিকেট আহ্বান করে অভিযুক্তদের স্থায়ী বহিষ্কার, ভিকটিমের (অবন্তিকার) পরিবারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন সেল কার্যকর করা।

দাবিগুলো পূরণ না হলে আগামীকাল সোমবার বেলা ১১টায় উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা অবন্তিকার মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেন।

ও সাহসী ছিল, বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিল : ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনমের আহাজারি থামছে না। কুমিল্লার বাড়িতে বসে তিনি বিলাপ করতে করতে সাংবাদিকদের বলেন, গত রোজায় স্বামীকে হারালাম। এবার মেয়েকে হারালাম। এক বছরের মধ্যে স্বামী ও মেয়ে আমার কাছ থেকে চলে গেল। মেয়ে আমার বিচারক হতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা তাকে বাঁচতে দিল না। ও সাহসী মেয়ে ছিল। বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে ভালো ছাত্রী ছিল, এটাই কি তার অপরাধ। আমার মেয়ে ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট ছিল, এটাই কি তার অপরাধ। আমি মেয়ের বিষয়ে সব জানতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রক্টরকেও জানিয়েছিলাম। দ্বীন ইসলাম নামে এক শিক্ষকের কাছে বিচার দিলাম, উল্টো সে আমার মেয়েকে টর্চার করেছে। আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই।’

ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার বাবা মো. জামাল উদ্দিন মৃত্যুর আগে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ ও কুমিল্লা সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল রোজার সময় তিনি মারা যান। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা শহরতলির শাসনগাছা মহাজনবাড়ি এলাকায়। অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনম কুমিল্লা পুলিশ লাইনস উচ্চবিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি উপস্থাপনা করতেন। অবন্তিকার ছোট ভাই অপূর্ব এসএসসি পরীক্ষার্থী।

অবন্তিকার মৃত্যুর খবরে ফুঁসে উঠেছে কুমিল্লার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও। গতকাল বেলা ১১টায় নগরীর কান্দিরপাড়ে অবন্তিকা আত্মঘাতী হওয়ার পেছনে জড়িতদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় : ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বেলা ১টায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে নগরীর বাগিচাগাঁওয়ের বাসার সামনে আনা হয় অবন্তিকার মরদেহ। এ সময় সেখানে স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বারবার মূর্ছা যান অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনম। বিকেল ৩টায় কুমিল্লা সরকারি কলেজ মাঠে জানাজা হয় অবন্তিকার। এরপর ৪টার দিকে কুমিল্লা শহরতলির শাসনগাছা জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা শেষে শাসনগাছা পারিবারিক কবরস্থানে বাবা জামাল উদ্দিনের কবরের পাশে দাফন করা হয় তাকে।

জানাজার আগে কাঁদতে কাঁদতে অবন্তিকার ভাই অপূর্ব বলে, ‘যারা আমার আপুকে টর্চার করে হত্যা করেছে, তাদের বিচার করুন। এভাবে আমার আপুকে তারা টর্চার করল, কিন্তু শিক্ষকের কাছে বিচার চেয়েও ও (অবন্তিকা) বাঁচল না। এদের সবাইকে ফাঁসি দিতে হবে।’