ইউরোপে নতুন সংঘাত আসন্ন!

ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপ মহাদেশের পশ্চিমা মিত্রজোটের দেশগুলোর জন্য বড় এক সংকট। তবে সম্প্রতি পূর্ব ইউরোপের স্থলবেষ্টিত দেশ মলদোভাকে কেন্দ্র করেও নতুন এক সংকট তৈরি হয়েছে, যা অনেকটা ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার সমস্যার মতোই। ত্রান্সনিস্ত্রিয়া অঞ্চলটি বিচ্ছিন্ন একটি প্রজাতন্ত্র এবং এটি মলদোভার ভূখ- হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সম্প্রতি অঞ্চলটির শাসকরা মলদোভার সম্ভাব্য আগ্রাসন থেকে বাঁচতে রাশিয়ার সাহায্য চেয়েছেন। আবার রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার লড়াইয়ে অঞ্চলটির রুশপন্থি প্রশাসন নতুন করে অভিযোগ করেছে, ত্রান্সনিস্ত্রিয়ার একটি সামরিক ক্ষেত্রে ড্রোন হামলা হয়েছে, যার জন্য দায়ী হচ্ছে কিয়েভ। 

ত্রান্সনিস্ত্রিয়ার রুশপন্থি প্রশাসনের কর্মকর্তারা গত রবিবার দাবি করেছে, ইউক্রেন থেকে তাদের সামরিক ক্ষেত্রের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে মলদোভার ব্যুরো ফর রিইন্ডিগ্রেশন পলিসি নামের একটি দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, তারা ত্রান্সনিস্ত্রিয়ায় এ ধরনের আক্রমণের ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। এ ধরনের অভিযোগ আতঙ্ক ও ভীতি ছড়ানোর একটি চেষ্টা হতে পারে।

ত্রান্সনিস্ত্রিয়ায় কোবাসনা এলাকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়কার অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদের একটি ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে দেড় হাজারের মতো রুশ সেনা শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করছে। ‘প্রিদনেস্ত্রোভিয়ান মলদোভান প্রজাতন্ত্র (পিএমআর)’ বলে স্বীকৃত ত্রান্সনিস্ত্রিয়ার রাজধানী তিরাসপোলেই ওই ঘাঁটির অবস্থান। এখানেই ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পিএমআর কর্মকর্তাদের। তবে ওই সময় রুশ সেনারা অবস্থান করছিল কি না, তা জানা যায়নি।

সাবেক সোভিয়েতশাসিত রাষ্ট্র মলদোভার সরকার এখন পশ্চিমাপন্থি। মলদোভা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে রাশিয়ার দিক থেকে এ নিয়ে চাপ রয়েছে।

গত রবিবার সামরিক ঘাঁটিতে হামলার আগে ত্রান্সনিস্ত্রিয়ার রুশপন্থি নেতারা মস্কোর কাছে সুরক্ষার আবেদন করে। তাদের শঙ্কা, মলদোভার সরকার তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে। ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ত্রান্সনিস্ত্রিয়া থেকে পণ্য আমদানি এবং সেখানে রপ্তানির ক্ষেত্রে গত ১ জানুয়ারি মলদোভা প্রশাসন শুল্ক আরোপ করেছে। 

গত মাসে তিরাসপোলে অঞ্চলটির আইনসভার বিশেষ অধিবেশনে রাশিয়ার আইনসভা ‘স্টেট দুমা’-এর কাছে আহ্বান জানানো হয়, রাশিয়া যেন ত্রান্সনিস্ত্রিয়ায় বসবাসরত ২ লাখ ২০ হাজারের মতো রুশ বাসিন্দার কথা বিবেচনা করে মলদোভার ক্রমবর্ধমান হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে অঞ্চলটির প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

ত্রান্সনিস্ত্রিয়ার রাজনীতিকরা ২০০৬ সালে একবার গণভোট আয়োজন করে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ডাক দিয়েছিল। স্বাধীন দেশ হিসেবে একে স্বীকৃতি না দিলেও ক্রেমলিন এর সঙ্গে সব সময় উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ অঞ্চলটিকে বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে। কারণ ইউক্রেন সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে ত্রান্সনিস্ত্রিয়া সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে মলদোভা প্রশাসনের শুল্ক আরোপ তাদের আরও সমস্যায় ফেলে দিয়েছে।

এ অবস্থায় মলদোভার প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার দেশ ত্রান্সনিস্ত্রিয়াকে সঙ্গে না নিয়েই ইইউ জোটে প্রবেশ করতে চায়।

রুশ প্রশাসনকে নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করতে কেন আহ্বান জানানো হলো, এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বাল্টিক ডিফেন্স কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়নের লেকচারার দুমিত্রু মিনজারারি বলেন, শুল্ক আরোপের ঘটনাটি এতে বেশ প্রভাব ফেলেছে। বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়া অঞ্চলে কর অব্যাহতির অর্থ হচ্ছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ দেওয়া। এই ব্যাপারটি সামনে রেখে মলদোভার সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আর এই বিবাদের সুযোগটি এখন রাশিয়া কাজে লাগাচ্ছে।

ত্রান্সনিস্ত্রিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় বন্দরনগরীর ওদেসায় সংযোগ ঘটানোর লক্ষ্য রয়েছে রাশিয়ার। কৃষ্ণ সাগরকে কেন্দ্র করে দখলকৃত অঞ্চলে প্রভাববলয় তৈরির লক্ষ্য এই পরিকল্পনার অন্তর্গত। ত্রান্সনিস্ত্রিয়াকে কেন্দ্র রুশ তৎপরতা নিয়ে পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা মনে করেন, মলদোভার ইইউভুক্তি ঠেকাতে মস্কোর এই অঞ্চলটি দাবার ঘুঁটি।