চোখের আড়াল তারপর চির আড়াল

নব্বই ও শূন্য দশকের শুরুতেও প্রমিথিউস ব্যান্ডের ছিল দুর্দান্ত দাপট। বিশেষ করে গায়ক বিপ্লব ব্যান্ড হোক কিংবা একক অথবা মঞ্চ সবখানেই তুমুল জনপ্রিয়। যে অ্যালবাম প্রকাশ হচ্ছে সেটাই হিট। পাড়া-মহল্লা, বাজার, চায়ের দোকান সবখানেই বাজছে বিপ্লবের গান। বিপ্লব তুমুল জনপ্রিয়। সেই বিপ্লব হঠাৎ করেই খবরে নেই। খবর পাওয়া গেল, তিনি গেম রিটার্নস নামের একটি সিনেমায় অভিনয় করছেন। সেই ছবি আলোচনা তৈরি করতে পারল না। তারপর বিপ্লব নামটাই যেন ভুলে গেল মানুষ। এরপর হঠাৎ করেই জানা গেল বিপ্লব নিউ ইয়র্কে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন। ভক্তরা অবাক ও বিস্মিত। কেন বিপ্লবের এ অন্তরালে চলে যাওয়া। এর কারণ কী, সময়?

আইয়ুব বাচ্চু শেষ জীবনে আর গাইতে পারছিলেন না। অথচ বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের উত্থান ও রাজত্বে তার নাম সবার ওপরে থাকে। সেই আইয়ুব বাচ্চু শেষ জীবনে কণ্ঠের কাছে পরাজিত হয়ে শুধু গিটার বাজিয়ে নিজের কারিশমা দেখাচ্ছিলেন। ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে শুধু গিটার বাজিয়ে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন। তারপর অকালে চলে গেলেন। আর্ক ব্যান্ডে যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনই এককভাবে অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গায়ক হাসান। আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান, তপন চৌধুরী, বিপ্লব, খালিদ, মাকসুদ, টিপু, আশিকুজ্জামান টুলু, তরুণ মুন্সী এসব নামই একই সঙ্গে উচ্চারিত হতো একসময়। কিন্তু এ সময়ে এসে জেমস ছাড়া কারও নাম খবরে আসে না। তপন চৌধুরী ও আশিকুজ্জামান টুলু থাকেন দেশের বাইরে। সংগীত পরিচালক ও সুরকার আরমান খান হাসানের তিন সত্যি নামের একটি অ্যালবাম করেছিলেন। সেই অ্যালবাম দারুণ জনপ্রিয় হয়। ক্যাসেটের যুগে কত হাজার ক্যাসেট বিক্রি হয়েছে তার হিসাব নেই, তবে আরমান খান সংগীতকে পুরোপুরি ধ্যানজ্ঞান না করে শ্রীমঙ্গলে একটি পাঁচতারকা হোটেলের জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন। জেমসের নতুন গান একেবারেই কম আসে। তারপরও মঞ্চে জেমস ছাড়া আলোর ঝলকানি চোখে পড়ে না। এর কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন, বলিউড জেমসকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। আর অনেকেই শুধু স্বাভাবিক কারণেই হারিয়ে যাচ্ছেন এমনটা নয়, কেউ কেউ হারাচ্ছেন অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্যও।

শুধু ব্যান্ড নয়, নব্বই দশকের সাড়া জাগানো, তুমুল জনপ্রিয় শিল্পীরা এখন অনেকেই অন্তরালে। কেউ কেউ আবার নীরবেই প্রস্থান করছেন। সাদি মহম্মদের আকস্মিক মৃত্যু সবাইকে নাড়িয়ে দেয়। এ মৃত্যুতে অনেকেই অনুভব করেন, শিল্পীর প্রতি ঋণ। কদিনের ব্যবধানে চলে গেলেন চাইম ব্যান্ডের খালিদ সাইফুল্লাহ। সামাজিকমাধ্যমে এ দুই শিল্পীর প্রয়াণে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সোনালি দিনের শিল্পীরা এভাবেই অনেকেই অন্তরালে চলে গেছেন আর অন্তরাল থেকেই কেউ কেউ ঝরে যাচ্ছেন। ঝরে যাওয়ার পর শ্রোতারা-ভক্তরা অনুভব করছেন তাদের কাছে কতটা ঋণী ছিলেন। শৈশব-কৈশোরকে কতটা রাঙিয়ে দিয়েছিলেন তারা।

নব্বই দশকের জনপ্রিয় অনেক শিল্পীই এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু সেটা সেভাবে চোখে পড়ার মতো নয়। রবি চৌধুরী, এসডি রুবেল, ডলি সায়ন্তনী, বেবি নাজনীনরা রয়েছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রয়েছেন। কিন্তু নব্বই দশকের জৌলুস তাদের কাজে নেই। কেন নেই? এ বিষয়ে কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী বলছেন, ‘সময়টা দখল করে আছে করপোরেট বাণিজ্য। ফলে এখন গানের চেয়ে মার্কেটিং গুরুত্ব পাচ্ছে। আর তাই যারা প্রকৃত শিল্পী তারা অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন এবং অন্তরালে চলে যাচ্ছেন। কোনো একজন দার্শনিক বলেছিলেন, স্বর্ণমানবরা একসময় মুখ লুকাবে আর দুনিয়া চালাবে রৌপ্য মানুষের সঙ্গে তাম্র মানুষরা। প্রকৃত শিল্পীরা এখন মুখ লুকাচ্ছেন, অন্তরালে চলে যাচ্ছেন আর যারা সে অর্থে শিল্পী নয়, তারাই এখন রাজত্ব করছে। স্বাভাবিকভাবেই এটা একজন শিল্পীকে হতাশাগ্রস্ত করে ফেলে। অবমূল্যায়ন মেনে নিতে না পেরে তারা আড়ালে চলে যান। এখন সময়টা চলছে তেমনই। সাদী ভাই মারা গেলেন অনেক অভিমান নিয়ে। আর খালিদ অস্থির ধরনের ছিল, সে ছিল আমার সহপাঠী, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে একসঙ্গে পড়তাম। তাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। সে এ সময়ে এসে এক ধরনের স্থিরতা খুঁজে বেড়াত। কিন্তু স্থিরতা তাকে দিল মৃত্যু।’

নব্বই দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড দল নর্দার্ন স্টারের মূল ভোকালিস্ট মাহমুদ জুয়েল এখন এককভাবে কিছু কিছু গান তৈরি করছেন। সেই গান বেশিরভাগ অন্যদের জন্য। অন্যরা গাইছেন। মাহমুদ জুয়েল মনে করেন, বিশ্বব্যাপী সব শিল্পীর জনপ্রিয়তা একই রেখায় থাকে না। কিন্তু প্রকৃত শিল্পী যারা, তারা শিল্পের চর্চা করে যায়। তিনি বলেন, ‘এখন সময়টা বদলে গেছে। আগে যেভাবে গান প্রকাশ পেত তার ধরন বদলে গেছে। এ বদলে যাওয়া ধরনটাই অনেকটা ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। অনেক শিল্পীই পরিবর্তিত প্ল্যাটফর্মকে নিজেদের উপযুক্ত মনে করছেন না, ফলে অনেকটা অন্তরালে চলে যাচ্ছেন। তবে তারা যে অন্তরালে থেকে গান করছেন না তা কিন্তু নয়, করছেন। সেসব নিজেদের মতো প্রকাশ করছেন।’

তবে একসময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের যেন পরবর্তী সময়ে অন্তত আর্থিক সংকটে পড়তে না হয় সেই নিশ্চয়তা থাকা দরকার বলে মনে করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড ওয়ারফেজের মূল ভোকালিস্ট পলাশ নূর। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংগীত বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বব্যাপী বাংলা গানের একটা ভূমিকা আছে, একটা শক্তি আছে। তাই যারা এই সংগীতের সঙ্গে যারা যুক্ত তারা কিন্তু সবসময়ই সংগীত সাধনাই করেন। ক্যারিয়ারের পড়তি সময়ে বা অবসরকালীন শিল্পীদের সংগীত নিয়েই থাকতে হয়। তাই অন্তত আর্থিকভাবে এ সময়টায় যেন দুশ্চিন্তা না থাকে, এজন্য রাষ্ট্রীয় একটা উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংগীতের যে সংগঠনগুলো রয়েছে, তাদেরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে।’