ইলেকট্রনিক বর্জ্য তথা ই-বর্জ্য পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব তৈরি করছে এবং দূষণের তালিকায় তা ধীরে ধীরে বড় জায়গা করে নিচ্ছে। সাধারণত পরিবেশে বায়ু, পানি ও মাটিসহ নানা উপাদানের দূষণ সবসময়ই আলোচনায় থাকলেও, ই-বর্জ্য নিয়ে ততটা কথাবার্তা শোনা যায় না। অথচ তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের বর্জ্য বাড়ছে ব্যাপক পরিমাণে। এবার জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এ নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা যন্ত্রাংশের বর্জ্য পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় তৈরি করেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইউনিটার যৌথভাবে ই-বর্জ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও অন্যান্য যন্ত্রের থেকে উৎপাদিত ই-বর্জ্যরে পরিমাণের তুলনায় পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) প্রক্রিয়া অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ যন্ত্রাংশগুলোকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সংকট রয়েছে ব্যাপকভাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে ছয় কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ পরিমাণটি আট কোটি ২০ লাখ টনে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। ই-বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনার কারণে ৪৫ হাজার টন ক্ষতিকর প্লাস্টিক তৈরি হয়। সেইসঙ্গে ৫৮ টন ক্ষতিকর পারদ পরিবেশে প্রতি বছরই ঢুকছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক সংকট রয়েছে। এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি নিয়ে যথেষ্ট কারিগরি জ্ঞানের সংকট রয়েছে। এমনকি বর্জ্য সংগ্রহের হারও বেশ কম। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনাগত দৈন্যের চিত্র উদঘাটিত হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী মাত্র ২২ শতাংশ ই-বর্জ্য সংগৃহীত হয়েছে এবং পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। সংগৃহীত এই স্বল্প বর্জ্যরে মধ্যে বেশিরভাগই পোড়ানো হয়েছে, ফেলে দেওয়া হয়েছে যত্রযত্র অথবা ত্রুটিপূর্ণভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, সাধারণত প্রতিটি মানুষ প্রতি বছর ৭.৮ কিলোগ্রাম ই-বর্জ্য উৎপাদন করে থাকে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলো এগিয়ে এবং এক্ষেত্রে আফ্রিকা মহাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এক কোটি ৮০ লাখ ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে ই-বর্জ্যরে কারণে অনিরাপদভাবে বর্জ্য ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব দেশে কাজ করতে যথেষ্ট উপযুক্ত সরঞ্জাম পায় না শ্রমিকরা। শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে আসে। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে জলবায়ু সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে স্বচ্ছ জ¦ালানিতে রূপান্তরের প্রেক্ষাপটগুলোও আমলে নেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ব্যাটারি, গরম পাম্প ও সোলার প্যানেলের মতো জিনিসগুলো ধ্বংস করার প্রয়োজনের নিরিখে স্বচ্ছ জ¦ালানিতে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জগুলোও আমলে নিতে হবে। ‘গ্লোবাল ই-ওয়াস্ট মনিটর’ শীর্ষক গবেষণাকর্মের প্রধান লেখক কেস বালডি বলেন, এটি পরিবেশের জন্য বড় এক বিপর্যয়। সরকার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যদি পুনর্ব্যবহারের যন্ত্রগুলোর সহজলভ্যতা নিশ্চিত না করে, তাহলে গ্রাহক বা ক্রেতাদের পক্ষে ই-বর্জ্য দূষণের স্রোত সামাল দেওয়া সম্ভব না। কেস বালডি আরও বলেন, ‘কোনো কিছু কেনা খুব সহজ। কিছু ক্লিকের মাধ্যমেই এখন কেনা সম্ভব। কিন্তু এগুলোকে ধ্বংস করা কঠিন। ই-বর্জ্য প্রায়ই উন্নত দেশে তৈরি হয় এবং পরে তা উন্নয়নশীল দেশে স্থানান্তরিত হয়।’ প্রতিবেদনটিতে সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বর্জ্য উৎপাদনের হার যেমন বাড়বে, একইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি আসবে। তবে এতে সন্তুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই, তা পরিষ্কার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ পুনর্ব্যবহারের হার ৬০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছবে। মানুষের ওপর এ সংক্রান্ত ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। আর্থিকমূল্যে পুনর্ব্যবহারের ফলে আর্থিক সাশ্রয় হবে তিন হাজার ৮০০ কোটি ডলার।