অর্ধশতকেরও বেশি সময় আগের কথা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যিনি জেগে উঠেছিলেন অস্ত্র, কলম ও ক্যামেরা হাতে। গেরিলা যোদ্ধা ও রণাঙ্গন সংবাদদাতা, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হারুন হাবীব এসেছিলেন দেশ রূপান্তরে। বিকেল ৪টায় আসার কথা থাকলেও, এলেন সাড়ে ৩টায়। ডিজিটাল রুমে যাওয়ার আগে আড্ডা হলো একপশলা। ছিলেন সিনিয়র কপি এডিটর সাইফুর রহমান তারিক, সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, হেড অব ইভেন্ট অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং শিমুল সালাহ্উদ্দিন, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ ও সিনিয়র সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শুভ্র। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান।
রণাঙ্গন থেকে ফিরে যে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি লেখালেখির অঙ্গনে প্রবেশ করেন, হারুন হাবীব তাদের প্রধানতম। সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য ও
সংস্কৃতিচর্চায় তিনি সুপরিচিত নাম। তার ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, গবেষণা ও সার্বিক লেখালেখির প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনি নিরবচ্ছিন্ন ধারায় তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধ, জাতির মহত্তম ইতিহাস ও অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তাকে। তিনি রণাঙ্গনে একই সঙ্গে স্টেনগান, কলম ও ক্যামেরা চালাবার কৃতিত্ব অর্জন করেন। একজন সশস্ত্র গেরিলা যোদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের মুখপত্র ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা ও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর যুদ্ধ সংবাদদাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আলোকচিত্রী না হয়েও তার ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের দুর্লভ সব আলোকচিত্র, যা জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। হারুন হাবীব মুক্তিযুদ্ধকেই তার লেখার প্রধান উপজীব্য করেছেন। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, নাটক, কবিতা ও সম্পাদনাসহ প্রায় ৪০টি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তার লেখালেখির রয়েছে নিজস্ব পরিভাষা, ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় অকৃত্রিম আন্তরিকতার গুণ, যা তাকে আর সবার চাইতে আলাদা করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয়ী লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট হারুন হাবীব একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিকাশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নাম। কয়েক যুগ ধরে তিনি ভারতসহ পশ্চিমি বিশে^র বহু সুপ্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের বাংলাদেশ সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের ক্ষমতা আরোহণের পর সাফল্যের সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। যদিও ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পরপরই তাকে অবৈধভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। সময়ের সাহসী সন্তান হারুন হাবীব মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিকাশ আন্দোলনের অন্যতম বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর দীর্ঘকালীন মহাসচিব। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির জাতীয় আন্দোলনসহ সব প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বরেণ্য লেখকের জন্ম ১৯৪৮ সালে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খড়মা নয়াপাড়া গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ থেকে এমএ এবং ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব মাস কমিউনিকেশন’ (আইআইএমসি) নতুন দিল্লি থেকে তিনি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথমেই তাকে প্রশ্ন করা হলো
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : যখন মুক্তিযুদ্ধে যান, তখন পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছিলেন সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। আমরা জানতে চাইছি, ঠিক কীভাবে তখন যুক্ত হলেন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে?
হারুন হাবীব : এটা আসলে আমার জন্য একটা স্মৃতিময় ব্যাপার। আমরা যে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তখন তো একটা উত্তাল সময়। সেই ষাটের দশকের মধ্যভাগ। আমরা ’৬৯-এর গণআন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত ছিলাম। সময়টাই এ রকম যে, তখন যে কোনো সচেতন মানুষের পক্ষে ঘরে বসে থাকা বা আন্দোলন থেকে দূরে থাকা সম্ভব ছিল না। ব্যতিক্রমীদের কথা আলাদা। সেই পরিস্থিতিতে যারা নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে, তারা পরে অনুতপ্ত হয়েছে, নিজের কাছে নিজেই জবাবদিহি করেছে। যখন জাতীয় ইতিহাসের বিনির্মাণ হচ্ছে, তখন যারা শান্তি খুঁজে পায়নি, আমি মনে করি তারা খুব দুর্ভাগা। কিন্তু আমি সেই দুর্ভাগাদের মধ্যে পড়ি না। কারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার আবেগ, চিন্তাচেতনা ও বোধসহ সবকিছু মিলিয়েই আন্দোলনে ছিলাম। আসলে এটা তো ব্যাপক প্রেক্ষাপট। সংক্ষিপ্ত করে বলি। ১ মার্চ, ১৯৭১ থেকে শুরু করি। তখন স্বাধীনতার আন্দোলনটা চূড়ান্ত রূপ লাভ করল। গণমানুষের মধ্যে স্বাধীনতার যে স্বপ্ন, সে ব্যাপারে একটা বড় ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছে। অতীত এবং চলমান ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তখন পাকিস্তানিরা একটা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ’৭০-এর নির্বাচনের ফল আমরা সবাই জানি। এটা কিন্তু ’৪৭ সালের পর, পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন ছিল। তখন আওয়ামী লীগের ছিল ভূমিধস বিজয়। স্বভাবতই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু তা হলো না। অনেকেই এটা মানলেন না। যেহেতু আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক অবস্থান ছিল, একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে দেখেছি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যতটা বলেছেন, দেখেছেন, করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি ছাত্র-জনতা এগিয়ে গেছে। ফলে অনেক সময়ই ছাত্রদের দাবি জাতীয় নেতৃবৃন্দকে সামনে ঠেলে দিয়েছে। অবশ্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেন্দ্রীয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১ মার্চ, এখন যেটা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, সেখানে একটা ক্রিকেট খেলা হচ্ছিল। আমিও সেখানে ছিলাম। সেখানে ২ দলের একটি ছিল পাকিস্তান। গ্যালারির দর্শকরা ১ ব্যান্ডের রেডিওতে ইয়াহিয়া খানের একটা ছোট্ট ঘোষণা শুনলেন। সেখানে বলা হলো আগামী ৩ তারিখে ঢাকায় যে সংসদীয় অধিবেশন ডাকা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত ঘোষণা করেছেন। মুহূর্তে পুরো স্টেডিয়াম যেন জ¦লে উঠল। যে মানুষগুলো পাকিস্তানের জয়ের পক্ষে ছিল, সেই মানুষগুলোই স্টেডিয়াম থেকে প্রবল স্রোতের মতো বের হয়ে এলো পাকিস্তানবিরোধী হয়ে। সেই একটা মাত্র ছোট্ট ঘোষণা শুনে। তখন গুলিস্তান, পল্টনসহ আশপাশের সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকের হাতে ছোট-বড় লাঠি। আমি ছিলাম জিপিওর সামনে। এই যে ব্যাপারটা, তা কিন্তু রাতারাতি হয়নি। পাকিস্তানের ২৩ বছরের দুঃশাসন, বাঙালির ওপর নির্যাতন, শোষণ, সামরিক-বেসামরিক চাকরিতে বাঙালিকে অধিকারহীন করে রাখা এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় মানুষকে তাড়িত করেছিল। এটা ছিল, গণমানুষের আকাঙ্খার প্রতিফলন।
সাইফুর রহমান তারিক : তখন আপনার বাসা কোথায় ছিল?
হারুন হাবীব : তখন আমি থাকতাম আরামবাগ। একদম কাছেই। যদিও মহসীন হলে আমার সিট ছিল। তখন তো আগুন সময়। যে কোনো সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়তে পারি। যে কারণে একেকদিন একেক জায়গায় থাকতাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি তো রণাঙ্গন সংবাদদাতাও ছিলেন? আমরা জানতে চাইছি যুদ্ধে কীভবে গেলেন?
হারুন হাবীব : হ্যাঁ। এরপর তো ৭ মার্চ এলো। তখন আমরা কয়েক বন্ধু বেশ ক্ষুব্ধ হলাম। মনে হলো, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন। আবার মনে হলো দিলেনও না। ওপরে যুদ্ধবিমান টহল দিচ্ছে। আমরা চাইছিলাম, বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিক। কিন্তু তিনি তো সাধারণ মানুষের মতো কথা বলবেন না। তখন তেজগাঁও বিমানবন্দরের সামনে কামান বসানো হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের মধ্য দিয়ে পুরো জনস্রোত যেন মুক্তিবাহিনীতে পরিণত হয়ে গেল। সেটা আমরা নিজেদের দিয়ে বুঝতে পেরেছি। আমরা আসছিলাম শাহবাগ দিয়ে। দেখলাম, মেশিনগান তাক করা রয়েছে রেডিওর ছাদে। সেখানে অনেক বালির বস্তা। ওদের পুরোপুরি প্রস্তুতি ছিল। তখন আমাদের কয়েক বন্ধু সেখানে মারল ককটেল। আমরা ছিলাম একটা বক্স ওয়াগনে। এরপরই ওরা গুলি শুরু করল। আমাদের গাড়িতে কয়েকটা লাগল। কিন্তু কারও ক্ষতি হয়নি। আমরা চলে গেলাম জিগাতলা রাজ্জাক ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। তখনও শ্বশুরবাড়ি হয়নি। ওখানে ছিল ইস্ট পাকিস্তান প্রাইমারি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ ছিলেন তার প্রেসিডেন্ট। সেখানে তাদের একটা অফিস ছিল। আমি সেখানে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু ওখানে থাকতে পারলাম না। সবাই ভয় দেখাল।
পরে সেখান থেকে চলে গেলাম কমলাপুর। তখন মাত্র স্টেশন চালু হয়েছে। তখন ‘দ্রুতযান’ নামের একটা ট্রেন ছিল। দেখি ট্রেনটা পুরো ‘জয়বাংলা’ ট্রেন হয়ে গেছে। মানুষের মধ্যে সে কী উত্তেজনা! সাধারণ যাত্রীরা সমস্বরে বলছে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। কয়েকজন যাত্রী বলল সেøাগান না দেওয়ার জন্য। কারণ ট্রেনটা যাবে ক্যান্টনমেন্টের পাশ দিয়ে। যদি সৈন্যরা গুলি করে! কে, কার কথা শোনে? সেøাগান থামল না। ওরা গুলিও করল না। ট্রেন ক্যান্টনমেন্ট পার হলো। ওরা কিছুই বলল না। দেওয়ানগঞ্জ গেলাম। আগে ওটার নাম ছিল প্রদ্যুৎনগর। মহারাজা প্রদ্যুৎ কুমার ঠাকুরের নামে। যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয়। সেখানে স্টেশনেই অনেকে বলল জানেন, হারুন ভাই, ছানা ভাইরা (যিনি ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র) জিন্নাহর সব ছবি ছিঁড়ে ফেলেছে। পা দিয়ে মাড়িয়েছে। ছানার সঙ্গে মাহফুজও ছিল। ও পড়ত মেডিকেলে। ওরা ছিল আমার বন্ধু। ছানার ভালো নাম আনোয়ারুল আজিম। বুয়েটের শহীদের তালিকায় ওর নাম প্রথমেই রয়েছে। মাহফুজ এখনো বেঁচে আছে।
ওরা তো আমাকে দেখে ভীষণ খুশি। ১৪ তারিখে আমরা পতাকা উত্তোলন করি ওখানে। গ্রামগঞ্জে অনেকেই তাতে ভয় পেল। আবার সাহসেরও সঞ্চার করল। কয়েকদিন পরে এলো মিলিটারি। এটা কিন্তু ২৫ মার্চের পরের ঘটনা। সেখানের বিহারিরা সব ঘটনার ছবি তুলে রেখেছিল। ওরাই মিলিটারিকে সব তথ্য দিয়েছে। এরপর আজিমকে গ্রেপ্তার করা হলো ভাইসহ। তারপর বাহাদুরাবাদঘাটে ওদের হত্যা করা হয়। আমি যখন দেখলাম মিলিটারিরা ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে, লুটপাট করছে তখন চলে গেলাম সেখান থেকে। আশ্রয় নিলাম যমুনার চরে। সঙ্গে ছিল আরও ২৫-৩০ জন। সেখান থেকে একবার বাড়িটা দেখতে গেলাম। দেখলাম, গ্রামের চারদিকে আগুন। বেশিক্ষণ থাকলাম না। এরপর ওখান থেকে সবাই মিলে চলে গেলাম মেঘালয়ের পশ্চিম গারো হিলসে। সেখানে দেখলাম, অনেক মানুষ। যারা সবাই বাংলাদেশের। তখন মনে হলো, ইস্ যদি আমার কাছে একটা ক্যামেরা থাকত। ছবিগুলো তুলে রাখতাম। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ওরা, সাধারণ মানুষরা যে পরিশ্রম করেছে, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে, কোনো ধর্ম তারা দেখেনি। কথা ছিল একটাই জয় বাংলার মানুষ এসেছে, ওদের ব্যবস্থা করতে হবে। তখন আমি স্বাধীন বাংলা বেতার শুনি। সিদ্ধান্ত নিলাম, সেখান থেকে পালিয়ে যাব স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে আমপাতি রিফিউজি ক্যাম্প বলে একটা জায়গা ছিল। ওখানে একটা গারো মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। এমনকি সম্পর্কও হলো। আমার বয়স তখন কত, ২২? এটিকে আবার প্রেমও বলা যায়। ওরা একেবারেই নিম্নবিত্ত। সেখানে ওদের একটা চায়ের দোকান ছিল। আমি সেখানে যেতাম। কেবল ওকেই দেখার জন্য। একদিন ওকে বললাম আমি কলকাতা যাব। এখানে থাকব না। ও বলল এখান থেকে আসামসহ অনেক জায়গায় ট্রাক যায় কলা নিয়ে। সেই কলার ট্রাকে চড়ে একদিন চলে গেলাম ধুবরির ফুলবাড়ী বলে একটা জায়গায়। সেখানে জয়বাংলার অফিস খুঁজতে লাগলাম। পেয়ে গেলাম। এরপর সেখান থেকে ট্রেনে গেলাম কলকাতা। ট্রেনে অনেক ঘটনা। এরপর সেখান থেকে বালিগঞ্জের একটা প্রেসে। সেখানে দেখা হলো আমিনুল হক বাদশা, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কামাল লোহানীর সঙ্গে। সেখানে সরকারের প্রচারপত্র ছাপা হতো গোপনে। তাদের সহযোগিতায় গেলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তারা আমাকে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা এবং ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’ নিয়োগ দিলেন। এরপর থেকে রণাঙ্গনে সাংবাদিকতা করি আর ছবি তুলি। তাদের কথা হচ্ছে, তুমি এখানে থেকে যাও। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার দরকার নেই। কিন্তু আমি বললাম, এটা পারব না। এরপর ফিরে এলাম আমার এলাকায়। সেখানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধও করি আবার ছবিও তুলি। এটা হচ্ছে, ১১ নম্বর সেক্টর। কমান্ডার ছিলেন কর্নেল তাহের।
তাপস রায়হান : এর মধ্যে অস্ত্র ট্রেনিং নিলেন কখন?
হারুন হাবীব : আমাদের ২ জায়গায় ট্রেনিং হয়েছে। কিন্তু তখনো যুদ্ধ করিনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মুক্তিযুদ্ধে ‘কামালপুর অপারেশন’ খুবই বিখ্যাত। সেই যুদ্ধ তো অনেকদিন হয়েছে। আপনার সেই ছবিটাও বিখ্যাত। কর্নেল তাহের গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরের সেই ছবি। আমরা সেই দিনের ঘটনা শুনতে চাই।
হারুন হাবীব : আসলে যুদ্ধ কর্মকা-ে মূলত আমার ৩টি হাতিয়ার ব্যবহারের সুযোগ হয়। একটা তো স্টেনগান ছিলই। দ্বিতীয়ত লেখালেখি করতে হতো। আর তৃতীয়ত হচ্ছে, সেই ক্যামেরা। সেটা আমাকে দিয়েছিলেন তাহের ভাই। সঙ্গে একটা টেপ রেকর্ডারও ছিল। যুদ্ধ শুরু হলো পাকিস্তানি সৈন্যের সঙ্গে। সে কী লড়াই! আমি জানি না, কখন টেপ রেকর্ডারটা অন হয়ে গেছে। রেকর্ড হয়ে যায় গুলির শব্দ। যেদিন তাহের ভাই আহত হলেন- অনেকের মনোবল ভেঙে গেল। আমি যখন এলাম, দেখলাম- তাহের ভাই একটা স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন। বাঁ পা-টা ঝুলছে। সেই পরিস্থিতিতেও আমাকে দেখে হাসছে। আমাকে বলল- কী হাবীব, দেখো- পাকিস্তানিরা আমার মাথায় গুলি লাগাতে পারেনি। কী যে সাহসী ছিলেন!
সালাহ উদ্দিন শুভ্র : এ বিষয়ে আপনার লেখালেখি আছে?
হারুন হাবীব : আমার মনে হয়, বেশিরভাগ ঘটনাই লেখা রয়েছে। আমার একটা আত্মজৈবনিক উপন্যাস আছে- ‘সোনালী গৌরব উদ্বাস্তু সময়’- এর মধ্যে সবই রয়েছে। এটা প্রথম বের হয়েছে ২০০৫ সালে।
সালাহ উদ্দিন শুভ্র : উপন্যাস লিখতে শুরু করেছেন কি তখনই?
হারুন হাবীব : না, আরও আগে। আসলে আমি মুক্তিযুদ্ধের চর্চা করি তো, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ এবং আমার ইনভলবমেন্ট- সব পরিষ্কার মনে আছে। আজ যেমন আমি বলছি, এরকম প্রায়ই বলতে হয়। যে কারণে একটা চর্চার মধ্যে থাকি। আর মার্চ বা ডিসেম্বর এলে, লেখালেখিও করতে হয়।
তাপস রায়হান : আপনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রধান সম্পাদক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা। সময়কে বিবেচনায় নিলে, বর্তমানের সঙ্গে এই পেশার কোনো পার্থক্য দেখেন?
হারুন হাবীব : আমার মনে হয়, আমি যে সময় সাংবাদিকতা শুরু করি, সেই ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংবাদ দিয়ে। আমি মূলত নিউজ এজেন্সিতে কাজ করেছি। আসলে আমাদের সাংবাদিকতা ছিল প্রিন্ট নির্ভর। যখন ১৯৯৮-৯৯ সালে আমি যখন বিএসএসএর প্রধান সম্পাদক এবং এমডি তখন দেখেছি অনেক জটিলতা। আমি বাংলা সার্ভিস চালু করলাম। কম্পিউটার শুরু হলো। আগে তো কোনো মেয়ে ছিল না। তারপর তো অনেক মেয়ে। আমাদের সময়ের সাংবাদিকতার কমিটমেন্টের সঙ্গে বর্তমানের অনেক পার্থক্য। তবে জেনারালাইজ করব না। এখন সাংবাদিকতায় বহুমাত্রিকতা এসেছে। তবু মনে হয়, সাংবাদিকতার কমিটমেন্টটা আমরা রাখতে পারিনি। তবে সাংবাদিকতার ব্যাপ্তি বেড়েছে, কনটেন্ট বেড়েছে। তবে মনে হয়, সাংবাদিকতায় ‘বিশ্বাস’ এবং ‘আস্থার’ বিষয়টি দুর্বল হয়েছে।
তাপস রায়হান : মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিষয়টি?
হারুন হাবীব : আমাদের সাংবাদিকতায় বড় ধরনের টার্নিং হয় দৈনিক আজকের কাগজের মাধ্যমে। এরপর আসে ভোরের কাগজ। এই দুটো কাগজই মুক্তভাবে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের কথা বলতে শুরু করে। আগে কিন্তু দীর্ঘ সময় একটা ভয়ের পরিবেশ ছিল। নব্বই দশকেই শুরু সাংবাদিকতার বিপ্লব। এখনো তা চলছে। এটা নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। তবে আমাদের এডিটোরিয়াল ইনিস্টিটিউশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তাহলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। তবে আমাদের প্রফেশনালিজমে ঘাটতি রয়েছে। রেফারেন্স সেকশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কোনো সংবাদ ক্রসচেক ছাড়া প্রকাশ-প্রচার করা ঠিক না।
সাইফুর রহমান তারিক : মনে হচ্ছে, প্রশ্নটি এই আলোচনার বাইরের একটা বিষয় হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ থেকে দূরে না। মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় একটা ঘাটতি ছিল। যে কারণে আমরা দেখি, সেই ঘাটতির কারণেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের মতো একটা ঘটনা হলো। এখানে আওয়ামী লীগেরও একটা ঘাটতি ছিল। এ ব্যাপারে যদি কিছু বলেন?
হারুন হাবীব : আামি যতটুকু বুঝি বা অনুভব করি- আমি যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, সেটা ছিল আসলে পিপলস ওয়্যার বা জনযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের চরিত্র নির্ধারণ করা বেশ কঠিন ব্যাপার। অন্যদিকে অতি বামরা এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। আবার মস্কোপন্থি যারা ছিল, তারা ছিল যুদ্ধের পক্ষে। কিন্তু তাদের আবার নিজস্ব বাহিনী ছিল। কিন্তু বৃহত্তরভাবে, যেটা ‘মুক্তিবাহিনী’ হয়েছে সেটা কিন্তু মিক্স ক্লাস থেকে গেছে। মিলিটারিতে যারা ছিলের, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এই প্রশ্ন করতেই হবে- যারা সশস্ত্র বাহিনী থেকে যুদ্ধে গেছেন, সবাই কি দেশপ্রেমের আবেগে গেছেন নাকি বিপদে পড়ে গেছেন? যুদ্ধের পরিচালনাকারী আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কিন্তু সব ফ্রন্টের যোগাযোগ ছিল না। কোনো সশস্ত্র যুদ্ধ কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নিয়ন্ত্রণ করেন না। কিন্তু আমাদেরটা হয়েছিল। এটা বিস্ময়কর।
সাহাদাত পারভেজ : আপনি তো সেক্টর কমান্ডার ফোরামে ছিলেন?
হারুন হাবীব : এখনো আছি। মহাসচিব হিসেবে।
সাহাদাত পারভেজ : আপনার লেখা বই কেমন হবে?
হারুন হাবীব : প্রায় ৪০টি। এর মধ্যে উপন্যাস ৬টি।
তাপস রায়হান : ব্যক্তিগত জীবনের কথা?
হারুন হাবীব : আমার ১ মেয়ে ১ ছেলে। মেয়ে ইংল্যান্ডে থাকে আর ছেলে আমেরিকায়।
উল্লেখযোগ্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ
উপন্যাস : প্রিয়যোদ্ধা প্রিয়তম, পাঁচপুরুষ, কলকাতা। ছোটগল্প : লাল শার্ট ও পিতৃপুরুষ, বিদ্রোহী ও আপন পদাবলী, স্বর্ণপক্ষ ঈগল, বিউটি বুক হাউস। মুক্তিযুদ্ধ : নির্বাচিত গল্প, গল্পসপ্তক, অন্ধ লাঠিয়াল। গবেষণা : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত-পশ্চিমবঙ্গ (তথ্য ও দলিল), বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত-ত্রিপুরা (তথ্য ও দলিল)। প্রবন্ধ ও যুদ্ধস্মৃতি : মুক্তিযুদ্ধ : বিজয় ও ব্যর্থতা, মুক্তিযুদ্ধ : পালাবদলের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত প্রবন্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ। নাটক : পোস্টার-৭১, অগ্রাহ্য দ-োৎসব। কাব্যগ্রন্থ : গীতসম্ভার, অনাবিষ্কৃত স্বভূমি। শিশুতোষগ্রন্থ : হেয়ারফিল্ডের রাজা, স্বপ্নের পাখিকুঞ্জ। ভ্রমণ : সূর্যোদয় দেখে এলাম। মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র অ্যালবাম : একাত্তরের যাত্রী, মুক্তিযোদ্ধার ক্যামেরায় ১৯৭১। সম্পাদনা : মুজিব জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ, সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম, ‘জীবনানন্দ’ সাহিত্য পত্রিকা ও ‘তারুণ্য’ সাহিত্যপত্র।
গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ