আগুনের সময় মেলে না পানি

রাজধানী ঢাকায় এখন প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। তার কোনোটিতে হচ্ছে প্রাণহানি, কোনোটিতে সম্পদহানি। আবার কোনো কোনো আগুনের ঘটনায় জানমাল সবই যাচ্ছে। পানির উন্মুক্ত উৎসের অভাবে অনেক সময় অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের অসহায়ের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন দেখা ছাড়া করার তেমন কিছুই থাকে না। অথচ চারপাশ থেকে নদীঘেরা এই শহর জুড়ে জালের মতো ছড়ানো ছিল খাল। মহল্লায় মহল্লায় ছিল পুকুর-জলাধার; যার পানি নগরবাসীর নিত্য ব্যবহারের পাশপাশি অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনায় ছিল প্রধান ভরসা।

কিন্তু দিন বদলের পালায় বদলে গেছে সে চিত্র। দখল আর দূষণে নদী-খালসহ অস্তিত্বের সংকটে পুকুর জলাশয়গুলো। ফলে ওই ধরনের দুর্ঘটনায় দিন দিন বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। প্রভাব ফেলছে শহরের জীববৈচিত্র্যের ওপরও। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণের নামে প্রাণ-প্রকৃতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। সামনে আরও বড় বিপদ, আরও বড় দুর্ঘটনা আসবে। এখনই খাল, নদী, পুকুর, দিঘিসহ জলাধারগুলো উদ্ধার করা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় অসহায় হয়ে পড়তে হবে।

গত মাসের ২৯ তারিখ রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের একটি ভবনে আগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হতে পারত। তবে নওরত কলোনির পুকুরের কারণে এ যাত্রায় বেঁচে যায় অনেক প্রাণ।

ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে থাকা পানি দিয়ে আগুন নেভানো হচ্ছিল। পরে আরও বেশি পানির প্রয়োজন পরলে নওরত কলোনির পুকুরে পাইপ লাগান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ওই পুকুরের পানি দিয়ে মাত্র দুই ঘণ্টায় নিয়ন্ত্রণে আনা হয় আগুন।

একইভাবে ঢাকা কলেজের পুকুরের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে গত বছর রক্ষা পায় রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেট। আগুন নিয়ন্ত্রণে পানি সংগ্রহ করা হয় পার্শ্ববর্তী ঢাকা কলেজের পুকুর থেকে। পুকুরের সঙ্গে ওয়াসার লাইনের সংযোগ তৈরি করে এ পানি নিয়ে আসা হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তখন বলেছিলেন, যদি কাছাকাছি এমন পানির জলাধার না পাওয়া যেত তাহলে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেত। 

একই সময়ে আরেকটি বড় অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে রাজধানী বঙ্গবাজারে। ওই অগ্নিকা-ের সময় ফায়ার সার্ভিসের রিজার্ভ থেকে পাঁচ হাজার লিটার পানি নিয়ে প্রথমে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু ওই পানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর সংকটে পড়েন ফায়ার কর্মীরা। রাস্তার পাশে নেই কোনো ফায়ার হাইড্রেন্ট, আশপাশে কোনো উন্মুক্ত জলাধারও নেই। পাশের ওসমানী উদ্যানের পুকুরটিতেও পানি নেই। সব মিলিয়ে চরম এক সংকটে পড়েন তারা। শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের পুকুর থেকে দীর্ঘ পাইপ টেনে পানি আনে ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু ততক্ষণে সব পুরে ছাই।

তবে ভিন্ন চিত্র ছিল রাজধানীর চুড়িহাট্টায়। ওই ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারান। কাছাকাছি পানির পর্যাপ্ত উৎস না থাকায় দীর্ঘ সময় আগুণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে শহর এলাকার পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্যোগের সময় আগুন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঢাকা শহরে যে এলাকায় এখন পুকুর, জলাশয়, খাল রয়েছে সেখানে অগ্নিনির্বাপণ কাজ অনেকটা সহজ হয়, ক্ষয়ক্ষতিও কম হয়। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক, শিল্প ও বাজার এলাকায় পর্যাপ্ত পানির উৎসের অভাবে অগ্নিকাণ্ডের ফলে দেশের নগর এলাকায় মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। পর্যাপ্ত পানির অভাবে ফায়ার সার্ভিস বাহিনীর শত প্রচেষ্টাও তখন আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৮৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত হারিয়ে গেছে ঢাকার ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি, খাল ও নিম্নাঞ্চল। জলাশয় ভরাটের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ ঢাকায় জলাশয় ও নিম্নভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫২ হেক্টর ও নিচুভূমি ১৩ হাজার ৫২৮ হেক্টর। একই সময়ে খাল ও নদী ছিল ২ হাজার ৯০০ হেক্টর।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, আমরা তো আর ধনী দেশ না। এই গরিব দেশের মানুষের বাঁচার উপায় ছিল প্রাকৃতিক সিস্টেমটাকে বাঁচিয়ে রাখা। প্রকৃতি আমাদের যা দিয়েছিল তা রক্ষা করে শহরায়ণ করা। যেহেতু প্রাকৃতিক সিস্টেমটাকে ধ্বংস করে দিয়ে আমরা এখন নগরায়ণ করলাম, যে নগরায়ণে আগুন লাগলে যে বাঁচব তারও উপায় নেই।

তিনি বলেন, যে যেভাবে পেরেছে জলধার দখল করে ভরাট করেছে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী থেকে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত কেউ বাদ যায়নি। রাষ্ট্র সব জায়গাতেই উদাসীন ছিল। জলাধারগুলো যদি রক্ষা করতে পারতাম তাহলে মিনিমাম একটা নিরাপত্তা থাকত। তিনি বলেন, যেগুলো দখল হয়েছে সেগুলো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হওয়া তো দূরে থাক, যেগুলো টিকে আছে সেগুলো রক্ষা করতে পারব কি না সন্দেহ আছে। তার ভাষ্য, জলাধার শুধু আইন করে রক্ষা করা যাবে না। সমাজ এবং রাষ্ট্র দুটোরই ভূমিকা থাকতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক একটা প্রতিশ্রুতি লাগবে। পুকুর-জলাশয় যারা ভরাট করে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। ইকো সিস্টেমটা যাতে ঠিক থাকে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।