নারী শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের প্রভাষক আবু শাহেদ ইমনকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া নিপীড়নের অভিযোগ করার পর ওই শিক্ষার্থীকে অসহযোগিতা করায় বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জুনায়েদ হালিমকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিন্ডিকেট সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।
উপাচার্য বলেন, ‘যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেলের দেওয়া প্রতিবেদনে ওই শিক্ষকের (আবু শাহেদ ইমন) বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর করা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি উপাচার্য হয়ে আসার পর আরেকটি তদন্ত বোর্ড গঠন করে দিয়েছি। আশা করি শিগগিরই সেই প্রতিবেদনও আমরা হাতে পাব।’ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ফারজানা মীমের পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মীমের বিগত পরীক্ষাগুলো নেওয়া হবে।’
অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘চেয়ারম্যান জুনায়েদ হালিম তাকে (মীম) বিভিন্নভাবে অসহযোগিতা করেছে, তারও সত্যতা পাওয়া গেছে। তাকেও চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বিগত পরীক্ষাগুলো নেওয়া হবে।’
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অবন্তিকার বিষয়ে সিন্ডিকেটে আলোচনা হয়েছে। অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে সে বিষয়েও সিন্ডিকেট সদস্যদের অবহিত করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে সুষ্ঠু তদন্ত হবে।’
যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কয়েক দিন আগে আত্মহত্যা করেন জবিশিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা। এ ঘটনা নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যে তার ওপর হওয়া যৌন হয়রানি ও নানা নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন আরেক শিক্ষার্থী ফারজানা মীম। গত সোমবার তিনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে গিয়ে নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন। বিষয়টি নিয়ে ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছেও একটি আবেদন করেন।
এ ঘটনায় গত বুধবার দুপুরে জগন্নাথের দুই শিক্ষক আবু শাহেদ ইমন ও অধ্যাপক ড. জুনায়েদ হালিম এবং ওই ছাত্রীকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ডিবি কর্মকর্তারা ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার পাশাপাশি দুই শিক্ষককে তার মুখোমুখি করেও কথা বলেন। এর পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
অবন্তিকা ‘হত্যার’ বিচার দাবিতে স্মারকলিপি : ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যাকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে এর বিচার দাবিতে উপাচার্যের কাছে পাঁচ দফা দাবি নিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তবে উপাচার্যের আশ্বাসের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল স্মারকলিপি দেওয়ার পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান শিক্ষার্থীরা।
গণমাধ্যমকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী শাহ সোবহান সাকিব বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) আমরা স্মারকলিপির দাবিগুলো গণমাধ্যমে বলেছিলাম, আজ (বৃহস্পতিবার) উপাচার্য ক্যাম্পাসে এসেছেন। তার কাছে সেটা জমা দিয়েছি। উপাচার্য আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তদন্ত অনেকদূর এগিয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব। আজ গ্রাফিতি কর্মসূচি রয়েছে, আগামী রবিবার গণস্বাক্ষর কর্মসূচি হবে।’
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, এখন থেকে যেকোনো শিক্ষার্থী নিপীড়নের শিকার হলে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়’ ব্যানারে তার পাশে দাঁড়ানো হবে।
গ্রাফিতি এঁকে প্রতিবাদ : আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী অংকন বিশ্বাসের স্মৃতিতে ক্যাম্পাসের বিবিএ ভবনের নিচতলায় গ্রাফিতি এঁকে গতকাল প্রতিবাদ জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী তীর্থ ম-ল বলেন, ‘আমরা আমাদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে গ্রাফিতি অঙ্কন করছি। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন। দুজনকে আমরা হারিয়েছি, তারা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের মনে রাখার জন্য আমাদের এ উদ্যোগ।’