চলমান রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভর্তুকি দরকার ১৭ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার ধাপে ওই অর্থের প্রয়োজন। এর মধ্যে চলতি মাসে জরুরি ভিত্তিতে দরকার অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিভাগকে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের জন্য সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ বিভাগ থেকে সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় না করলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এর আগে সময়মতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় গত বছরের মাঝামাঝি কয়লা সংকটে বন্ধ হয়ে যায় দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে লোডশেডিং বেড়ে যায়। ভর্তুকি চাহিদা বাড়লেও অর্থসংকটে অর্থ বিভাগ সময়মতো অর্থ ছাড় না করার ফলে পিডিবির বকেয়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বন্ড ইস্যু করলেও খুব বেশি লাভ হয়নি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ভর্তুকির চাহিদার উদ্ধৃতি দিয়ে গত ৬ মার্চ বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলোর স্থানীয় ঋণের বিপরীতে ১০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা বন্ডের মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে। এরপরও গত জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আদানিসহ ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ কেনা বাবদ মোট বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৭০৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি ও দেশীয় আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে। ভর্তুকি সমন্বয়ের জন্য সরকার দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করলেও ভর্তুকি কমছে না, বরং বেড়েই চলছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি ছিল ৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ৯১ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৩৩ টাকা।
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। এতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমবে। এরপরও চলতি অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, পবিত্র রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে অপরিশোধিত বিল পরিশোধের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ভর্তুকির অবশিষ্ট অর্থ ১৭ হাজার ৭০১ কোটি টাকা ছাড় করা প্রয়োজন। এর মধ্যে ভর্তুকি বাবদ চলতি মাসে ৪ হাজার কোটি, এপ্রিলে সাড়ে ৪ হাজার কোটি, মে মাসে সাড়ে ৪ হাজার কোটি এবং জুনে ৪ হাজার ৭০১ কোটি টাকা ছাড় করা দরকার।
চিঠিতে আরও বলা হয়, মার্চ মাসের ভর্তুকির ৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ভারতের আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেডের পাওনা দেড় হাজার কোটি আর দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানির অপরিশোধিত বিল পরিশোধে দেড় হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। রমজান ও গ্রীষ্মে লোডশেডিং পরিস্থিতি সামলাতে এই ৩ হাজার কোটি টাকা জরুরি ভিত্তিতে ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্ট (কেন্দ্র ভাড়া) সমানতালে বাড়ছে উল্লেখ করে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট না কমিয়ে ভর্তুকি সমন্বয়ের কথা বলে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সরকার এর দায় ভোক্তার ওপর চাপাচ্ছে, যা অযৌক্তিক।’
তিনি বলেন, অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে পিডিবির আর্থিক ক্ষতি বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকিও বাড়ছে। ভর্তুকি বাড়ার আরেকটি কারণ হলো উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা। এ ছাড়া এলএনজি ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝোঁক এবং উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে ভর্তুকি বাড়ছে। অযৌক্তিক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সমন্বয় করা গেলে বিদ্যুতের মূল্য এভাবে বৃদ্ধির দরকার হতো না।
সূত্রমতে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় ছাড় করেছে ১৭ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। ঈদের পর আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে। কারণ আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুসারে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের ভর্তুকি থেকে সরে আসতে হচ্ছে সরকারকে। সরকার আগামী তিন বছর পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছর কয়েক দফা বাড়বে বিদ্যুতের দাম।
কিছুদিন আগেও দেশে বিদ্যুতের গড় চাহিদা ছিল ১০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। কিন্তু রমজান মাস উপলক্ষে মার্চ ও এপ্রিল মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট হতে পারে বলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রক্ষেপণ করেছে। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়তে থাকে।
চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার ৪৮১ মেগাওয়াট। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট (১৯ এপ্রিল, ২০২৩) বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।
এ বছর চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৪০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ১ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু প্রতিদিন ১৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করাই পেট্রোবাংলার পক্ষে দুরূহ ব্যাপার হবে। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫০ টন এবং ডিজেলের চাহিদা ১৫ হাজার ৬০০ টন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো হলে বাসাবাড়ি শিল্প ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের সংকট আরও বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের রেশনিং করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতিমধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে বিদ্যুতের লুকোচুরি। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের সীমাবদ্ধতা এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কিছু এলাকায় সামান্য সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এদিকে বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি ঢাকার অনেক এলাকায় সকালে ও সন্ধ্যায় চুলা জ¦লছে না। চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে গাড়ির লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে।