'গাজীপুরের কালিয়াকৈর, ঢাকার বেইলি রোডসহ দেশের বিভিন্ন নগর এলাকার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং এ সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতির পেছনে নগর সংস্থাসমুহের তদারকি, নজরদারি ও সার্বিক সুশাসনের ব্যর্থতা রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে সার্বিক সমন্বয়হীন নগর ব্যবস্থাপনা। নগর ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা যেমন- উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ সেবা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার গাফেলতিজনিত দায় যেমন রয়েছে। ঠিক তেমনি সঠিক নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাব এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নীতি কৌশল প্রণয়ণের দায় রয়েছে।'
আজ শুক্রবার দুপুরে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত গাজীপুরের কালিয়াকৈর, ঢাকার বেইলি রোডসহ নগরে অগ্নিকাণ্ডে ঘটনা: নগর পরিকল্পনা ও নীতি কৌশলের দায় শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা একথা বলেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনা, ভবনের টেকসই ডিজাইন, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা, ভবনের সঠিক ও অনুমোদিত ব্যবহার, ভবনের অগ্নি প্রতিরক্ষা, ফায়ার ড্রিল, ভবন মালিকের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ এবং নগর সংস্থাসমূহের নিয়মিত তদারকি থাকলে নগরে অগ্নিদুর্ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, সিলিন্ডার গ্যাস, জনগণের জীবনের নিরাপত্তা ও ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই আবাসিক পর্যায়ে পাইপলাইনভিত্তিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে সিলিন্ডার ভিত্তিক গ্যাসকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যদিও আবাসিক গ্যাস ব্যবহার মোট ব্যবহারের শতকরা ১০ ভাগের মতো। ফলে প্রাধান্য পেয়েছে সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের গোষ্ঠীস্বার্থ। পাশাপাশি গ্যাস লাইনের লিকেজ ও অবৈধ গ্যাস লাইনের কারণেও বাড়ছে অগ্নিঝুঁকি। ভবনে নিম্নমানের ইলেকট্রিক সামগ্রীর যথেচ্ছ ব্যবহার ও আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গুদাম জীবনের ঝুঁকি অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় অগ্নিঝুঁকি কমাতে কার্যকর নগর ও ভবনের পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে মনে করে আইপিডি।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাষ্ট্রের মনোযোগ বেশি প্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণে। কিন্তু একটা রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে সুশাসনের ওপর। যত বেশি সুশাসন থাকবে রাষ্ট্রের মানুষের জীবন তত বেশি নিরাপদ হবে। ভবনের নিরাপত্তা সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, কিন্তু সুশাসনে আগ্রহ ও বিনিয়োগ বাড়েনি। গোষ্ঠী স্বার্থে পরিকল্পনা ও নীতি কৌশল পরিবর্তন আনার কারণে ক্রমাগত অগ্নিঝুঁকি বাড়ছে। এসব সিদ্ধান্ত যারা পরিবর্তন করে তারাই রাষ্ট্রের শক্তিশালী জায়গায় অবস্থান করছে। রাষ্ট্রকে মানুষের নিরাপত্তা ও স্বার্থ দেখতে হবে।
অধ্যাপক আদিল বলেন, দেশের সকল নগর এলাকার মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও যথাযথ অনুমোদনের মাধ্যমে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, নগরায়ন ও শিল্পায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে অগ্নিঝুঁকি কমানো এবং জীবনের নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব। বিপদজনক মিশ্র ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং নগর সংস্থাসমূহের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে মিশ্র ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি করা দরকার। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভার্টিক্যাল মিশ্র ব্যবহার না করে আনুভূমিক (হরাইজন্টাল) মিশ্র ব্যবহার নীতি গ্রহণ করা। অনুমোদনহীন এবং ভূমি ব্যবহার নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে শিল্প কারখানা স্থাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিল্প জোনে কারখানা স্থাপন নিশ্চিত করার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা সিংগাপুর-হংকংয়ের মতো বহুতল ভবন বানাতে আগ্রহী। অথচ ভবনের আশেপাশে পর্যাপ্ত জায়গা ছাড়তে রাজি নই। সেসব শহরে ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বহুতল ভবন বানায়, আর আমরা সরু গলির ভেতরে এ ধরনের ভবন বানিয়ে শহরকে অনিরাপদ বানিয়ে ফেলেছি। নগরকে নিরাপদ করতে রাজউকের যেমন দায় আছে, পেশাজীবীদের ও অনুরূপ দায় আছে।
আইপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা হলেও তা সিলগালা বা খালি করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে দুইটি সিঁড়ি ও বহির্গমন পথ থাকবার কথা কিন্তু ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ১০ তলার উঁচু ভবনকে হাইরাইজ হিসেবে বিবেচনা করায় অগ্নিঝুঁকি বৃদ্ধি বাড়ছে।
আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, আমাদের দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুকে মাথায় রেখেই নগর পরিকল্পনা ও ভবনের নকশা করতে হবে। নগরকে নিরাপদ করতে অসংগতিপূর্ণ মিশ্র ব্যবহার পরিহার করতে হবে। বিএনবিসি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ) গঠন করার তাগাদা দেন তিনি।
ড. চৌধুরী মো. জাবের সাদেক, পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বলেন, অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসকে ভবন সিলগালা করে দেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অনুষ্ঠানে ড. ফরহাদুর রেজা, পরিকল্পনাবিদ রেদওয়ানুর রহমান, পরিকল্পনাবিদ আব্দুল আহাদ নাফিস তাদের মতামত তুলে ধরেন।