ট্রেনের টিকিট কাটতে নানা বিধি-নিষেধ ও তদারকির পরও থেমে নেই কালোবাজারি। এই কারসাজির লাগাম টানতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে কালোবাজারি চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তারও হচ্ছে। মূলত টিকিট কাটার পুরো প্রক্রিয়া রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বরতরাই জড়িত এই কালোবাজারি সিন্ডিকেটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কোনো চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তারের পর ঘুরেফিরে তাদের নেপথ্যে টিকিট বিক্রি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা চুক্তিবদ্ধ কোম্পানি সহজডটকমের কর্মীদের নাম সামনে আসছে। তবে এভাবে একের পর এক নিজেদের কর্মী গ্রেপ্তারের পরও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর কমলাপুর ও সবুজবাগ এলাকায় টিকিট কালোবাজারি চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালায় র্যাব ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। এ সময় চক্রটির হোতা সহজডটকমের পিয়ন মিজান ঢালী, অফিস সহকারী সোহেল ও স্টেশন সাপোর্ট স্টাফ নিউটন বিশ্বাসসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটক অন্যরা হলো মো. সুমন (৩৯), মো. জাহাঙ্গীর আলম (৪৯), মো. শাহজালাল হোসেন (৪২), মো. রাসেল (২৪), মো. জয়নাল আবেদীন (৪৬) ও মো. সবুর হাওলাদার (৪০)। তাদের কাছ থেকে কালোবাজারির আলামত এবং অবৈধভাবে সংগ্রহ ও মজুদ করা ট্রেনের বিপুলসংখ্যক টিকিট জব্দ করা হয়। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
র্যাব বলছে, ঈদ, পূজা, সাপ্তাহিক ছুটিসহ বিশেষ ছুটির দিনগুলো সামনে রেখে এই চক্র কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ সময়ের তুলনায় অধিক সংখ্যক টিকিট সংগ্রহ করত। এসব টিকিট কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে বাধ্য করত বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের। চক্রটির সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর তাদের দেওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার হয় সহজডটকমের কর্মচারীরা। যাদের যোগসাজশেই টিকিট কালোবাজারি হয়ে আসছিল। এর দায় প্রতিষ্ঠানটি এড়াতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ ছিল। এই চক্রের সঙ্গে সহজের ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছে কি না সেসবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে কর্মীদের অপরাধের দায়ভার নিতে নারাজ সহজডটকম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সন্দ¦ীপ দেবনাথ সাংবাদিকদের বলেন, ‘কয়েকজন কর্মীর দায়ভার একটা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। টিকিট কালোবাজারি রুখতে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করেছি। আমরাও কালোবাজারির বিরুদ্ধে, আমরাও চাই এটা একদম গোড়া থেকে নির্মূল হোক।’
কালোবাজারি চক্রটির সদস্যদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ঢালী (সহজ ডটকমের পিয়ন মিজান ঢালী) সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যসহ গ্রেপ্তার সুমন, শাহজালাল, জাহাঙ্গীর, জয়নাল ও রাসেল মিজান ঢালীকে ট্রেনের টিকিটের চাহিদা দিত। পরে তাদের চাহিদা অনুযায়ী মিজান ঢালী অবৈধভাবে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করে কালোবাজারির মাধ্যমে বিক্রির জন্য সরবরাহ করত। সুমন রেলওয়ের সঙ্গে এক সময়ের চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সিএনএসবিডিতে চাকরি করত। পরে সহজডটকমের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর সেই চাকরি বাদ দিয়ে মিজান ও সোহেলের মাধ্যমে ঢালী সিন্ডিকেটে যুক্ত হয়ে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা ট্রেনের টিকিট বিভিন্ন মাধ্যমে বিক্রি শুরু করে।
আর আটক অন্যদের মধ্যে শাহজালাল ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চালক, জাহাঙ্গীর কমলাপুরের একটি আবাসিক হোটেলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রাসেল একই আবাসিক হোটেলের বয় এবং জয়নাল অন্য একটি আবাসিক হোটেলের বয়। তারা নিজেদের কাজের পাশাপাশি টিকিটপ্রত্যাশী যাত্রী জোগাড় করে কালোবাজারির মাধ্যমে সংগ্রহ করা টিকিট নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ বেশি দামে বিক্রি করত। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তেট্রেনের টিকিটপ্রত্যাশীদের কাছে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে টিকিট পাঠাত।
মিজান ও সোহেল প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে দেশব্যাপী বিভিন্ন স্টেশনের সহজডটকমের কর্মচারী ও টিকিট কাউন্টারম্যানদের মাধ্যমে দুই থেকে ৩ হাজার টিকিট কালোবাজিরর মাধ্যমে বিক্রি করত। এই চক্রের প্রত্যেকেই টিকিট কালোবাজারি করে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করে।
র্যাব জানায়, টিকিট বিক্রির মাধ্যমে আয় করা টাকা দুইভাগে ভাগ হয়। ৫০ ভাগ পায় সহজডটকম ও স্টেশনের টিকিট কাউন্টারম্যানরা। বাকি ৫০ ভাগ সিন্ডিকেটের হোতা মিজান ও সোহেলসহ টিকিট বিক্রিতে জড়িত থাকা বাদবাকি সহযোগীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়।