প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। এবার প্রার্থী মনোনয়নের পর্ব শুরু হবে। এ নির্বাচনে ভোটার টানা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার জন্য আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে কোথাও কোথাও স্থানীয় সংসদ সদস্যরা প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছেন। এ নিয়ে সরকারি দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, বরাবরের মতো স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনেও সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের নেতাকে প্রার্থী করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ের এবং তার আগের স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকেই প্রার্থী করছেন।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ঘিরে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় আওয়ামী লীগের এক নেতার বিরুদ্ধে দলেরই আরেক নেতাকে তুলে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় দলে বিভেদ সৃষ্টি হয়। সেই বিভেদ দূর করার জন্য সব স্তরের নেতাদের ডেকে বৈঠক করেছে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি গণমাধ্যমে খবরে আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে উদ্ধৃত করে বলেছে, প্রার্থী মনোনয়নে দলটির কেন্দ্র থেকে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কিন্তু কোনো সংঘাত যাতে না হয়, সেজন্য ঈদের পরই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের বৈঠক করা হবে। সেই বৈঠকে স্বতন্ত্র সব প্রার্থীর জন্য কিছু নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। কিন্তু কোনো উপজেলায় যখন আওয়ামী লীগের স্থানীয় একাধিক নেতা প্রার্থী হবেন, তখন সেখানে দলীয় নির্দেশনা কতটা মানা হবে, সেই প্রশ্নও রয়েছে দলটিতে। এ ছাড়া দল কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো হস্তক্ষেপ না করায় প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখবে বলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করছেন। কিন্তু মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অনেকেই তাদের নিজেদের এলাকায় পছন্দের প্রার্থী ঘোষণা করছেন বা পক্ষ নিচ্ছেন বলে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এমন অবস্থায় প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা নেবে, সেই প্রশ্নও উঠছে দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বাদ দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশেষ বর্ধিত সভা ডাকা হয়। এ সভা ডাকেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে ডাকা ওই সভায় পছন্দের ব্যক্তি ইয়াকুব আলীকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই জেলার ধনবাড়ী উপজেলায় বিশেষ বর্ধিত সভা করে খালাতো ভাই হারুনার রশীদ হিরাকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন রাজ্জাক। এ বিষয়ে জানতে গত রবি ও গতকাল শুক্রবার একাধিকবার আবদুর রাজ্জাকের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা বা প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
ধনবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের (এমপি) আধিপত্য তৃণমূল নেতাকর্মীকে চরম হতাশ করে তুলেছে। এমপিরা বলয়ের রাজনীতি করেন। ফলে বলয়ের বাইরে যেতে পারেন না। বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতি, ভাইয়ের রাজনীতিকে রসদ জোগাচ্ছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুর্বল করে তুলছে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে জনপ্রিয় নেতাই জনপ্রতিনিধি হবেন এটা মনে করেই। তিনি বলেন, আমার জানামতে, দলীয় সভা ডেকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ কেন্দ্রীয় কোনো নেতার নেই। এ ধরনের কোনো ঘটনা থাকলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় এমপিরা এমপিতন্ত্রই নয়, পরিবারতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করছেন। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় প্রার্থী হবেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) একরাম চৌধুরীর ছেলে শাবাব চৌধুরী। দলের স্থানীয় আর কোনো নেতা নির্বাচন করবেন, এ ঘোষণা দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।
হাতিয়ায় এমপি মোহাম্মদ আলীর ছেলে ওই উপজেলায় প্রার্থী হবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন এমপি। বেগমগঞ্জে স্থানীয় এমপি ওই উপজেলায় তার ছেলে জিহান আল রশীদকে প্রার্থী করবেন বলে এমপি-ঘনিষ্ঠ লোকজন প্রচার চালাচ্ছেন। ফলে এখানেও দলের কোনো নেতা নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার মেয়র পদে উপনির্বাচনে পরাজিত হন স্বতন্ত্র এমপি এবিএম আনিসুজ্জামানের স্ত্রী শামীমা বেগম। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনিসুজ্জামান মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করে সংসদ নির্বাচন করেন। উপনির্বাচনে তিনি স্ত্রী শামীমা বেগমকে সমর্থন করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়ার পরে দলের এমপিরা নিজস্ব বলয়ের লোক ও এমপি পরিবারের সদস্যদের প্রার্থী করা শুরু করেছেন। এতে তৃণমূলে যে নেতা রাজনীতি করছেন, সমাজের বিভিন্ন মানুষের উপকারে আসছেন তিনি নির্বাচনের মাঠে পিছিয়ে যাচ্ছেন, বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব ঘটনা বড় ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি করবে।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে এ নেতা আরও বলেন, ‘প্রতীকে নির্বাচনেও তারাই মাতব্বরি করেছেন, প্রতীক ছাড়া নির্বাচনেও মাতব্বরি ছাড়তে চান না এমপিরা।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমপিরাই ঠিক করছেন কারা উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভায় নির্বাচন করবেন। এখানে এমপি বলয়, তাদের স্বজনরাই ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থিতা। স্থানীয়ভাবে যেহেতু এমপিরা প্রভাবশালী ফলে এমপির বাইরে গিয়ে নির্বাচন করার সাহস দেখাতে পারছেন না তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় তৃণমূলে দ্বন্ধ-কোন্দল, ক্ষোভ-বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। এর আগেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপি-মন্ত্রীদের বলয়ের বাইরে প্রার্থী হতে না পারায় বিভিন্ন জায়গায় বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
২০২২ সালে কুমিল্লায় একজন মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার দুটি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের প্রায় সবাই ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের ষষ্ঠ ধাপের নির্বাচনের আগে তার নির্বাচনী এলাকার একটি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে বিভিন্ন পদে মনোনয়নপত্র কিনতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তারপরও মনোনয়নপত্র কিনতে পেরে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন তারা।
২০১৬ সালে ফেনী জেলায় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদে বিনাভোটে নির্বাচিত হওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তখনো অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের চাপ দিয়ে নির্বাচনের বাইরে রাখার অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের নির্বাচন ‘ফেনী স্টাইল’ নামে পরিচিতি পায়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী সংসদে দেশের সব জেলা পরিষদে ‘ফেনী স্টাইলে’ নির্বাচন দাবি করে বক্তব্য রাখেন।
এমপি-মন্ত্রীদের নিজেদের এলাকায় বলয় তৈরি, অন্য দল থেকে আসা লোকজনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেতা বানানো, বিরোধ তৈরি, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করার বিষয়ে তৃণমূলের ক্ষোভ আমলে নিয়ে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়। বিভিন্ন কারণে অভিযুক্ত ৭৩ জন এমপিকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদেরও কেউ কেউ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হন। এ পরাজয়ের কারণ হিসেবেও তখন ওইসব অভিযোগ আলোচনায় উঠে আসে।
৭ জানুয়ারি অনুুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলীয় বিভেদ দূর করার পাশাপাশি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয় ভেঙে দেওয়া, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে অন্য দল বিশেষ করে বিএনপিকে আনতে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রতীক তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃণমূলে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ বাড়াতে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দিতে প্রতীক বাদ দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
এ প্রসঙ্গে তৃণমূল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলেন, প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপি আধিপত্য ছিল। প্রতীক ছাড়া নির্বাচনেও আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপিরা।
তৃণমূল নেতারা আরও বলেন, এসব নির্বাচনে পরিবারতন্ত্রও কায়েম করতে চান ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা। এমপি-বলয় ও পরিবারের সদস্যরাই যদি সব সুবিধা পায়, তখন আমাদের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা কোথায় এমপিদের কাছে? এসব নানা আলোচনা-সমালোচনায় তৃণমূল আওয়ামী লীগে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলেও দাবি করেন তৃণমূলের এসব নেতা।