শোককে শক্তিতে রূপান্তরের পদযাত্রা

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে আয়োজিত হয়েছিল ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’। সেই পদযাত্রা স্মরণে স্বাধীনতা দিবসে পর্বতারোহীদের সংগঠন ‘অভিযাত্রী’ আয়োজন করে ‘শোক থেকে শক্তি: অদম্য পদযাত্রা’। এর লক্ষ্য তরুণ প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও চেতনা পৌঁছে দেওয়া। লিখেছেন বিপুল জামান

ইতিহাস পথ ধরে

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী বাঙালিরা বিশ্বনেতাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছিলেন নানাভাবে। ২৫ মার্চ রাত থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘ সাত মাস ধরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পরও যখন বিশ্বনেতৃত্বের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না, তখন ১৫ অক্টোবর, ১৯৭১ তারিখে বাংলাদেশের কয়েকজন তরুণ দিল্লি অভিমুখে শুরু করলেন এক পদযাত্রা। এর নাম দিয়েছিলেন ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’। এই পদযাত্রার সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৮। তারা যাত্রাপথে বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করতেন। গণহত্যা সম্পর্কে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আহ্বান জানাতেন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর। তাদের সবার হাতে হাতে শোভা পেত ‘আমাদের এক কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা’, ‘মুজিবের মুক্তি চাই’ সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পরে ২০১৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে পর্বতারোহীর দল ‘অভিযাত্রী’ ১৯৭১ সালের পদযাত্রীদের পদরেখা অনুসরণ করেই শুরু করে ‘শোক থেকে শক্তি : অদম্য পদযাত্রা’। প্রথমবার এই যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন সাতজন। পরের বছরই পদযাত্রীর সংখ্যা হয়ে যায় দ্বিগুণ। এরপর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন পেশাজীবী, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এই পদযাত্রার আকার যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি পরিণত হয়েছে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অনুষঙ্গে।

অদম্য পদযাত্রার লক্ষ্য

ভাষার জন্য জীবন দেওয়া, ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে প্রায় তিরিশ লাখের জীবনদান-স্বাধীনতার জন্য বাঙালিকে কম মূল্য দিতে হয়নি। নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাসের কাছে নিয়ে যাওয়ায় এই ‘শোক থেকে শক্তি : অদম্য পদযাত্রা’র উদ্দেশ্য। স্বজন হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে দেশ গড়ার আত্মপ্রত্যয়ে নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করাই এই পদযাত্রার লক্ষ্য। স্বাধীনতা দিবসে নিজেদের অর্থায়নে একই রকমের টি-শার্ট পরে এবং জাতীয় পতাকা নিয়ে চলা এই পদযাত্রাকে সাম্যের বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়।

‘শোক থেকে শক্তি : অদম্য পদযাত্রা’য় পদযাত্রীরা স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে ফিরে যায়, স্মরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। এ কারণে পদযাত্রার যাত্রাপথ এমনভাবে নির্ধারিত হয় যেন নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এসব স্মৃতিবিজড়িত স্থানের সংযোগ তৈরি হয়। সারা দেশ জুড়ে তো বটেই, রাজধানী ঢাকাতেও রয়েছে অনেক স্মৃতিচিহ্ন। তাই বছরভেদে যাত্রাপথ পরিবর্তিত হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম পদক্ষেপ। তাই সাধারণত ২৬ মার্চ ভোরবেলায় শহীদ মিনার থেকে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় এই পদযাত্রা। এরপর ২৫ মার্চ গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত জগন্নাথ হল, ফুলার রোড, টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শিখা চিরন্তনী, ধানমন্ডি ৩২, আসাদ গেট, মুক্তিযুদ্ধ টাওয়ার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ইত্যাদি স্মৃতিবিজড়িত স্থান ছুঁয়ে পৌঁছে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। এসব স্থানে পদযাত্রীরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। স্থানগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে অবহিত করেন মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন এমন মানুষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এর মাধ্যমে যেন ’৭১ প্রজন্ম তাদের দায়িত্বের পতাকা তুলে দেন তরুণ প্রজন্মের হাতে। 

ছড়িয়ে গেল সারা দেশে

২০১৩ সালে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা বারো বছরে ছড়িয়ে গেছে সারা দেশে। ২০১৬ সাল থেকে এই আয়োজনে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি ২০১৮ সালে মেহেরপুরে, ২০১৯ সালে জামালপুরে, ২০২১ সালে পাবনার ভাঙ্গুড়ায়, জামালপুর ও মৌলভীবাজারে এবং ২০২২ সালে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হয়েছে এই পদযাত্রা। এবারের পদযাত্রায় যুক্ত হতে যাচ্ছে অনন্যতার আরেকটি পালক। এবার শুধু দেশেই নয়, দেশের মাটি ছাড়িয়ে আমেরিকার বস্টন কমন্সেও অনুষ্ঠিত হবে ‘শোক থেকে শক্তি : অদম্য পদযাত্রা’। প্রতিবছরের মতো এবারও ঢাকার পাশাপাশি মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত হবে এই অদম্য পদযাত্রা। এর আয়োজনে রয়েছে ‘মৌলভীবাজার গার্লস গাইড’। এবারের পদযাত্রা উপলক্ষে ১৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, দেশের যে কোনো নাগরিক তার এলাকায় আয়োজন করতে পারেন এই পদযাত্রা। আমাদের সারা দেশ ছড়িয়ে আছে স্মৃতির মিনার, স্মৃতিস্তম্ভ। অভিযাত্রী ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তেমনি যে কোনো একটি স্মৃতিচিহ্ন থেকে শুরু হয়ে আরেকটি স্মৃতিচিহ্ন পর্যন্ত পদযাত্রার আয়োজন করতে পারেন দেশের যে কোনো নাগরিক।’

শোক থেকে শক্তি : অদম্য পদযাত্রা ২০২৪

২৬ মার্চের প্রত্যুষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের আয়োজন। হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে টিএসসি হয়ে পদযাত্রী দল স্বাধীনতা স্তম্ভের পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াবে শিখা চিরন্তনীর পাশে। সেখানে পদযাত্রী দল কিছুটা সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে। এরপর ছবির হাটের গেট দিয়ে বের হয়ে মধুর ক্যান্টিনের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে স্মরণ করবে সেই ২৫ মার্চের শহীদদের। সেখান থেকে পদযাত্রী দল অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে কিছুটা সময় নীরবে দাঁড়িয়ে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের পাশ দিয়ে নীলক্ষেত পৌঁছবে। এরপর সিটি কলেজ, পিলখানা গেট, সাত মসজিদ রোড হয়ে মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে যাবে পদযাত্রীরা। এখানে একাত্তরে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর গোষ্ঠী পাশবিক নির্যাতনের ভয়ংকর ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। অমানুষিক নির্যাতন শেষে বুদ্ধিজীবীদের এখান থেকে নেওয়া হতো রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। নীরবে খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করে পদযাত্রীরা হাঁটতে থাকবে বছিলার উদ্দেশে। বছিলা ব্রিজের নিচে থেকে ট্রলারে করে পদযাত্রীরা তুরাগ, বুড়িগঙ্গা হয়ে ৩২ কিমি ধলেশ্বরী পাড়ি দিয়ে যাবে নয়ারহাট। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে দেশের মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে স্থলপথের পাশাপাশি এভাবে নদীপথেও দেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছিল। ঘাটে নেমে ঢাকা-আরিচা সড়কের পথ ধরবে পদযাত্রী দল। কিছুটা পথ অতিক্রম করলেই বাঙালির শক্তির সেই উজ্জ্বল শিখর, জাতীয় স্মৃতিসৌধ। স্মৃতির মিনারের সামনে নবীন অভিযাত্রী দল নেবে দীপ্ত শপথ। এর মাধ্যমেই শেষ হবে উদ্যম পদযাত্রা। শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ির পথ ধরবে পদযাত্রীরা। আসার সময়ে নির্ধারিত থাকবে বাস। অন্যবারের মতো এবারও পরিধেয় টি-শার্ট, ইফতার ও বাসের খরচ পদযাত্রীরা নিজেরাই বহন করবে।

অংশগ্রহণ করতে চাইলে

এই পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারে সবাই। দিনব্যাপী এই অভিযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে চাইলে নৌকা ভাড়া ও সাভার থেকে ঢাকায় ফেরার বাস ভাড়া ও ইফতারসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ৬০০ টাকা পরিশোধ করে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন যে কেউ। পদযাত্রার যাত্রাপথ ও অন্যান্য তথ্য পাওয়া যাবে এই পদযাত্রার ফেসবুক ইভেন্ট ‘শোক থেকে শক্তি : অদম্য পদযাত্রা-২০২৪’ থেকে।