তার কাজের লক্ষ্য ছিল দেশ ও জাতির নিরাপত্তা

মৃত্যুর জন্য মানুষ কোনো বয়সেই প্রস্তুত থাকে না। তবু মৃত্যু আমাদের সারাক্ষণই অতন্দ্র প্রহরীর মতো গোপনে তাড়া করে। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল শেষে মৃত্যুর একটি সান্ত¡না আছে। কিন্তু কিছু অকাল মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়্যারমান অধ্যাপক জিয়াউর রহমানের (জিয়া রহমান) আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে, বেদনায় স্তব্ধ দেশের শিক্ষাঙ্গন। ২৩ মার্চ ভোরে মৃত্যুবরণ করেন এই শিক্ষাবিদ। অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান আমার শিক্ষক ছিলেন। তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষদ সামাজিক বিজ্ঞানের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অধ্যাপক জিয়া অপরাধবিজ্ঞান বিভাগেরও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পথচলা শুরু সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে। তারও আগে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে তার বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবন শুরু। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি থেকে জিয়া রহমান পিএইচডি করেছিলেন। মনে পড়ে সদ্য পিএইচডি শেষ করে এসে স্যার নিজ বিভাগ সমাজবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। আমাদের কোর্স শিক্ষক ছিলেন। একটা ঝলমলে প্রাণবন্ত চেহারা নিয়ে স্যার ক্লাসে হাজির হতেন। ক্লাসে বেশ প্রস্তুতি নিয়ে আসতেন। দায়সারা কোনো লেকচার দিয়ে ক্লাস শেষ করতেন না। স্যারের ক্লাস উপভোগ্য ছিল। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও কলাভবনে যখন বসতেন স্যারের রুমে প্রায়ই যেতাম। গল্প করতে। ডিপার্টমেন্টে কোনো পজিশন বা আহামরি কোনো সিজিপিএ না থাকার পরও আমার শিক্ষকরা কেন জানি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। জিয়া স্যারও। কত স্মৃতিই না মনে পড়ছে আজ। সমাজবিজ্ঞান ছেড়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সে সুবাদে কাজ করেছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে। সামরিক, বেসামরিক প্রশাসন, আইন, দুদক, গণমাধ্যমের অনেকে পেশাগত কারণে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স করেছেন। দেশে অপরাধ প্রবণতার ধরন, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি জটিল বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে গভীর জানাশোনা ছিল। নিজের একাডেমিক পড়াশোনা ছাড়াও বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে গতানুগতিক অপরাধ তৎপরতা ছাড়াও দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, উগ্রবাদী তৎপরতার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, আদর্শিক অবস্থান, দেশের বাইরে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ এমন, অনেক সংবেদনশীল তথ্যেরও খোঁজখবর রাখতেন। কোনো এক টিভি টকশোতে তরুণদের সাংস্কৃতিক বদল, মতাদর্শিক ও আচরণগত পরিবর্তন, ভাষার ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে আলোকপাত করেছিলেন। তার কাজ দেশ ও জাতিকে নিরাপদ করেছিল। সেটাকে উগ্রবাদী গোষ্ঠী সচেতনভাবে লুফে নিয়ে ধর্মানুভূতির কার্ড খেলেছে। এই গোষ্ঠীর যন্ত্রণায় স্যার আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সক্রিয় থাকেননি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে জিয়া স্যার কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব ক্রিমিনোলজির বোর্ড অব ডিরেক্টরস নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ বছরই তার চলতি দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ অপরাধবিজ্ঞান সোসাইটিরও তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্টেরও দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষক সমিতিরও নেতৃত্বে ছিলেন। দেশের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ছিল। অধ্যাপক জিয়া রহমানের মৃত্যুতে দেশ একজন গুণী শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষা প্রশাসককে অকালে হারাল। এ দেশের উচ্চশিক্ষা বিকাশে তার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরে জন্ম নেওয়া এই বরেণ্য শিক্ষাবিদ বড় অকালে চলে গেলেন।

লেখক : কবি ও গবেষক

ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষারত