দিন দিন অসুখী হচ্ছি কেন?

সমৃদ্ধি বাড়ছে, সুখ নয়। মাথাপিছু আয় বাড়ছে, দৃশ্যমান উন্নতি আছে কিন্তু সুখ কোথায়? সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩ দেশের মধ্যে ১২৯তম। গত বছর যা ছিল ১১৮তম এবং এর আগের বছর ৯৪তম। আমরা ক্রমশ অসুখী হচ্ছি। অথচ সরকারের হিসাবে এই সময়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় দু শ ডলার। আমরা মহাশূন্যে স্যাটেলাইট পাঠালাম, পদ্মা সেতু বানালাম, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলাম, মেট্রোরেল বসালাম, কর্ণফুলীর নিচে টানেল করলাম অথচ সুখের বদলে অসুখ বাড়ালাম। 

কাগজে কলমে উপমহাদেশের সবচেয়ে অসুখী দেশ বাংলাদেশ। কদিন আগে দেউলিয়া হতে যাওয়া শ্রীলঙ্কার লোকজনও বাংলাদেশিদের চেয়ে সুখী জীবনযাপন করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের অবস্থান এই তালিকায় ১০৩ তম।  

নাগরিক হিসাবে আমরা সত্যিই অনেক অসুখী। যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে  খেতে ফলানো তিনটি লাউ পঁয়তাল্লিশ টাকায় বেঁচে এই টাকায় পরিবারের জন্য কিছুই কিনতে না পেরে খালি ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরে, সে নিজেকে সুখী ভাববে কী  করে। পেনশনের টাকা বিনিয়োগ করে ফেরত না পাওয়া অসহায় লোকটি নিজেকে সুখী ভাববে কী করে। অন্যায়ভাবে মার খেয়ে কোথাও ন্যায়বিচার না পাওয়া লোকটি নিজেকে সুখী ভাবতে পারে না। সর্বত্র আজ জোর যার মুল্লুক তার অবস্থা বিরাজমান। কমজোরি মানুষগুলো কোন কারণে নিজেকে সুখী মনে করবে?  

রাস্তায় নৈরাজ্য শহুরে মানুষকে অসুখে রেখেছে। সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে পথে সময় নষ্ট করে  নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে না পারা লোকগুলো নিয়মিত বিরক্ত হচ্ছেন। বাসের পাল্লায় রাস্তায় চলা ছোট গাড়ির চালক ও যাত্রীদের বারে বারে পিলে চমকায়, মরতে মরতে  বেঁচে যাওয়া এই সব মানুষজন নিজেকে অসুখী মনে করেন। রাস্তায় অননুমোদিত গাড়ি চলাচল, অননুমোদিত হাট-বাজার স্থাপন, ময়লার স্তূপ, বাড়ি নির্মাণের মালামাল রাখা, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো এসব কারণে নাগরিকগণ মহাবিরক্ত।   

জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার না পাওয়া রোগীর অসহায় স্বজন  হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে জানতে পারে সেটির চাকা নষ্ট ;মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া এই সব লোক নিজেকে অসুখী ভাবেন। সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হওয়া মানুষগুলো রাষ্ট্রের ওপর বিরক্তি থেকে নিজেকে অসুখী ভাবেন। 

সর্বত্র নিরাপত্তাহীন মানুষগুলো নিজেকে অসুখী ভাবেন। ফুটপাতে হাঁটার জো নেই। রাস্তাঘাট অনিরাপদ। মানুষের গাদাগাদি, চাকায় পিষ্ট হওয়ার ভয়, শ্লীলতাহানির ভয়, অপহরণের ভয়, ছিনতাই হওয়ার ভয়, ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণহানির ভয়, নির্মাণাধীন ভবন থেকে মাথায় ইট পড়ার ভয়, ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে মাথায় পড়ার ভয়, সম্পত্তি বেহাত হওয়ার ভয়, প্রতারকের খপ্পরে পড়ে সর্ব শান্ত হওয়ার ভয়, ঝামেলায় পড়লে কোথাও ন্যায়বিচার না পাওয়ার ভয়। এতসব ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো নিজেদের শুধু অসুখী নয়, অসহায় ভাবেন। 

ক্রমাগত নাগরিক অসুখ বাড়তে থাকা দেশের জন্য লজ্জার কারণ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারে থাকা লোকজনের জন্যও এটি বিব্রতকর। তাই শুধু তথাকথিত উন্নয়ন নয়, বরং সর্বত্র ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করা, ঘুষ, কালোবাজারি ও মজুরদারি নির্মূল করা, নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন। 

লেখক: শিক্ষক ও লেখক।